বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রযুক্তির ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন ক্রমবিকাশ গণতন্ত্রের জন্য অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রথমত, প্রযুক্তি কীভাবে জনবিতর্কের কাঠামো বা আদল গড়ে তোলে, সেটি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। সামাজিক নেটওয়ার্কগুলো ব্যবহারকারীদের ছোট ছোট সমমনা সম্প্রদায়কে ভাগ করে পাবলিক ডিসকোর্স বা জনভাষ্যকে বিভক্ত করে ফেলছে। মত-ভিন্নমতের কারণে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিসরেও মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ছে। অ্যালগরিদম দ্বারা পরিচালিত তথ্যের ইকো চেম্বারগুলোর কারণে সামাজিক ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন করে তুলছে। সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো সামাজিক নেটওয়ার্কগুলো তাদের বিতরণ করা কনটেন্টের ভালো-মন্দের দায় নিচ্ছে না। তারা দায়মুক্তির সঙ্গে তাদের প্ল্যাটফর্মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের ভুল ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

নতুন নতুন প্রযুক্তির দ্বারা সৃষ্ট দ্বিতীয় প্রধান ঝুঁকি হলো গোপনীয়তা। উন্নত নজরদারি প্রযুক্তির কারণে সরকারি-বেসরকারি কর্তৃপক্ষ সমানতালে নাগরিক এবং ভোক্তাদের ব্যক্তিগত তথ্য ও আচরণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেয়ে যায়। বিগ ডেটা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একত্র হওয়ায় যৌথ এবং ব্যক্তিগত আচরণের অন্তর্দৃষ্টি ক্রমবর্ধমানভাবে ভবিষ্যদ্বাণীমূলক হয়ে উঠছে। অর্থাৎ ব্যক্তি বা কোনো সম্প্রদায় কী করতে চায় বা তাদের কী মনোভাব তা সহজেই বুঝে ফেলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। করপোরেশনগুলো ভোক্তাদের রুচি ও আচরণ বিশ্লেষণ করে সে অনুযায়ী তাদের পণ্য তাদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করছে। এ ছাড়া সরকারি কর্তৃপক্ষ ভিন্নমতকে দমিয়ে রাখতে নাগরিকদের সবচেয়ে ব্যক্তিগত ও একান্ত অন্তরঙ্গ আচরণ সম্পর্কে তাদের জ্ঞান ব্যবহার করে।

ফ্রিডম হাউসের জরিপে দেখা যাচ্ছে, ১০টি বৃহত্তম ভোক্তা বাজারের মধ্যে আটটিই ‘মুক্ত দেশ’ হিসেবে পরিচিত দেশগুলোতে রয়েছে এবং বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৫টিও রয়েছে সেই একই দেশগুলোতে৷ যদি প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং প্রতিযোগিতার একটি নতুন পরিসর হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক বিশ্ব তা সাফল্যের সঙ্গে সামাল দেওয়ার জন্য সজ্জিত আছে।

তৃতীয় ঝুঁকিটি সবচেয়ে ভয়ংকর আদল নিয়েছে রাজনীতির ক্ষেত্রে। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা মূলত একটি বৃহৎ তথ্যব্যবস্থা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংঘবদ্ধতা যখন সর্বজনীন ভোটাধিকারের সঙ্গে মিলেমিশে চলে, তখন স্বচ্ছন্দে নাগরিকেরা তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারে। নিজ নিজ বিবেচনামতো তারা কোনো রাজনৈতিক উদ্যোগে সম্মতি দিতে কিংবা তাতে বাধা দিতে পারে। আজকের নজরদারি এবং ডেটা-মাইনিং প্রযুক্তিগুলো একটি বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে নাগরিকদের স্বাধীনভাবে প্রকাশ করা পছন্দগুলো বোঝার আর দরকার নেই, কারণ নজরদারি করা আচরণ থেকে তাঁর পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে সহজেই অনুমান করা যেতে পারে।

এ ধরনের স্নায়বিক ও আচরণগত বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে কোন নাগরিক কী আচরণ করতে যাচ্ছে, তা রাষ্ট্রের কাছে দিন দিন বেশি করে স্পষ্ট হচ্ছে। এ প্রবণতা পীড়নপ্রবণ সরকারগুলোকে আরও দমনপীড়নের মানসিকতায় ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। চীন ইতিমধ্যে সেদিকে অনেকটাই ঝুঁকে পড়েছে।

গণতন্ত্র সম্মেলনে যোগ দেওয়া প্রত্যেকেই উন্নত গণতান্ত্রিক আদর্শ ও মূল্যবোধকে এগিয়ে নিতে সহায়ক প্রযুক্তির উন্নয়নে বড় পদক্ষেপ নিতে সম্মত হয়েছে। হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যূথবদ্ধ হয়ে আইই ইউনিভার্সিটিসহ (আমি যেখানে কাজ করি) আরও অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান ‘গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেওয়া প্রযুক্তি’ উদ্ভাবনে বৃহৎ একটি প্রকল্প বাস্তবায়নে উদ্যোগ নিয়েছে।

প্রধানত পাঁচটি ক্ষেত্রে এ প্রকল্প জোর দেবে। সেগুলো হলো মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং জনবিতর্ক জোরদার করার জন্য ডিজাইন করা প্রযুক্তি যাচাই; মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নিভৃতিকে সম্মান করে এমন ডেটা অ্যানালিটিকস টুলস (তথ্য-বিশ্লেষণ মাধ্যম) উদ্ভাবন; ব্যক্তিগত ও সরকারি উপাত্ত ব্যবস্থাপনার জন্য সুরক্ষিত ডিজিটাল আইডেন্টিটি সিস্টেম ও আস্থাযোগ্য কাঠামো তৈরি; সরকারি পরিষেবা উন্নত করতে প্রযুক্তির স্বচ্ছতা এবং পক্ষপাতহীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার। বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনের এ সহযোগিতামূলক উদ্যোগ গণতান্ত্রিক সমাজগুলোর এক ছাতার তলায় আসার এবং একসঙ্গে নতুন কিছু করার অনন্য ক্ষমতার একটি নিখুঁত উদাহরণ। এ সহযোগিতাভিত্তিক উদ্যোগ এটিও মনে করিয়ে দিচ্ছে যে গণতান্ত্রিক বিশ্ব প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মুখে পড়ে একেবারে অসহায় হয়ে যায়নি।

ফ্রিডম হাউসের জরিপে দেখা যাচ্ছে, ১০টি বৃহত্তম ভোক্তা বাজারের মধ্যে আটটিই ‘মুক্ত দেশ’ হিসেবে পরিচিত দেশগুলোতে রয়েছে এবং বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৫টিও রয়েছে সেই একই দেশগুলোতে৷ যদি প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং প্রতিযোগিতার একটি নতুন পরিসর হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক বিশ্ব তা সাফল্যের সঙ্গে সামাল দেওয়ার জন্য সজ্জিত আছে।

সত্ত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

  • মানুয়েল মুয়িজ স্পেনের আইই ইউনিভার্সিটির স্কুল অব গ্লোবাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স বিভাগের ডিন

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন