দক্ষ প্রশাসক হিসেবে বিচারপতি সাত্তারের খ্যাতি ছিল। আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধুও তাঁকে সম্মান করতেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে সাংবাদিকদের বেতনকাঠামো ঠিক করার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল কলকাতা থাকতেই, যখন আবদুস সাত্তার কলকাতা করপোরেশনের চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার। মধ্য-পঞ্চাশে তাঁরা একসঙ্গে সরকারেও ছিলেন যুক্তফ্রন্টের সময়। কয়েক দিন যাবৎ রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে একটি ব্যাপারে মনে পড়ছে।

তাঁর সময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মচারীরা ধর্মঘট করেছিলেন। ব্যাংকের সিবিএগুলোর এখনকার মতো তখনো প্রবল প্রতিপত্তি ছিল। তারা তাদের অন্যায্য দাবিদাওয়া টেবিল চাপড়ে আদায় করত। যে কাজ করার কথা ব্যাংকের এমডির, তা করতেন সিবিএর নেতা, যেমন কর্মচারী নিয়োগ প্রভৃতি বিষয়। কোনো কোনো কর্মচারী নেতার মাসিক আয় একজন মাঝারি শিল্পপতির সমান বা বেশি ছিল। কিন্তু তাতেও তাঁদের মন ভরেনি। আরও চাই। তাঁরা ব্যাংকে ধর্মঘটের ডাক দিলেন। সাধারণ কর্মচারী-কর্মকর্তাদের জন্য ধর্মঘট একটি খুশির বিষয়, কারণ, তাহলে বাড়িতে থেকে টানা ঘুম দেওয়া যায়। সরকারের অনুরোধ-উপরোধ সত্ত্বেও নেতাদের আস্ফালন ও ধর্মঘট একসঙ্গে চলল। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। রাষ্ট্রপতি সাত্তার এক দিন সময় বেঁধে দিলেন: আগামীকাল সকাল নয়টার মধ্যে যাঁরা কাজে যোগ দেবেন না, তাঁদের চাকরিচ্যুত করা হবে।

বাংলার মাটিতে সরকারের কোনো হুমকি কেউ বিশ্বাস করে না। কেউ মনে করলেন, আলটিমেটাম দিয়েছে তো কী হয়েছে? কিন্তু সাত্তার সাহেবকে সিবিএর নেতা ও ব্যাংক কর্মচারীরা চিনতেন না। নির্দিষ্ট দিন সাড়ে নয়টায় ব্যাংকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়। আমি ওই দিন বাংলাদেশ বিমানের অফিসে গিয়েছিলাম টিকিট কিনতে। তখন পৌনে ১০টার মতো বাজে। এক ব্যাংকে দেখলাম কয়েকজন একটি মইমতো এনে দেয়াল টপকে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করছেন। অনেকের পক্ষে নির্দিষ্ট সময়ে ব্যাংকে গিয়ে কাজে যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। গ্রামের বাড়ি থেকে অনেকে ফিরে আসতে পারেননি। চাকরি হারালেন কয়েক হাজার ব্যাংক কর্মচারী। জেলের ভাত খেতে লাগলেন সিবিএর নেতারা।

খুবই মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছিল সে সময়। পত্রিকায় খবর হয়েছে, চাকরিচ্যুত অনেকে না খেয়ে মরেছেন। কেউ আত্মহত্যা করেছেন। এক দুর্ধর্ষ ও দুর্নীতিবাজ সিবিএর নেতা জেলখানায় আত্মহত্যা করেন বা মারা যান। তাঁর বাবা ছিলেন আমার পরিচিত। সেই পরিবারের হাহাকার আমি দেখেছি। আরও দেখেছি অন্যায্য দাবি আদায় করতে ধর্মঘট ডাকার মজা কাকে বলে। প্রেসিডেন্ট সাত্তার সরকারের কথা তাই এই সময় মনে পড়ছে।

যখন কোনো গোত্র সরকারের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বের সীমা থাকে না। গোষ্ঠীবিশেষের কাছে সরকার কখন অসহায় হয়? সরকার যখন তার নৈতিক ও সাংবিধানিক অবস্থান থেকে সরে আসে, তখনই সরকার নতি স্বীকার করে। কবি তাঁর আবেগ, দেশের প্রতি ভালোবাসা ও সারল্যবশত বলে গেছেন, ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, এই ভূখণ্ডে জন্মগ্রহণ করে মানুষ অপরাধ করেছে। লোকজনের চরম দুর্ভোগ দেখে রাষ্ট্র দাঁত বের করে বলছে, ‘এখানে জন্মালি কেন? বোঝ এবার ঠেলা!’

default-image

মানুষ কাজকামে বেরোয় বলে গণপরিবহনে চড়তে হয়। ওই বাস-মিনিবাসে চড়তে চাওয়াটাই একটা বড় অপরাধ। তবে এ দেশের কেউই বিনা পয়সায় বাসে চড়তে চায় না। তা ছাড়া লোকজন যদি বাসে না চড়ে, তাহলে ওই সব যানবাহনের মালিকদের খালি বাস চালিয়ে বিত্তবান হওয়া সম্ভব নয়। ভাড়া পরিশোধ করে বাসে যাবে, তাতেও কত জিল্লতি। বাসমালিক নিজে গিয়ে কখনো যাত্রীদের অপমান করেন না। যাত্রীদের অসম্মান করার জন্য রয়েছেন তাঁদের চালক, হেলপার এবং আরও কেউ কেউ। মৌখিক অপমান তো আছেই। কখনো শারীরিক অপমান। বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা যাত্রী। পায়ে সমস্যা আছে, আস্তে-ধীরে নড়াচড়া করতে হয়। ঠেলাঠেলিতে উঠতে কষ্ট হচ্ছে। সে কষ্ট লাঘব করে দেন হেলপার। দরজায় দারোগার মতো তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। যাত্রী কষ্ট করে কোনো রকমে এক পা পা-দানিতে রেখেছেন তো হেলপার সজোরে হ্যাঁচকা টান মেরে তাঁকে বাসের ভেতরে তুলে ফেলেন। যাত্রী বুঝতেই পারেন না কখন তিনি অবলীলায় বাসের ভেতরে ঢুকে গেছেন। ঢোকাই শেষ নয়। তিনি কীভাবে দাঁড়াবেন, সে ইনস্ট্রাকশনও হেলপার থেকে আসে: ‘এই মিয়া, সোজা হইয়া খাড়ান। কাইত হইয়া রইছেন যে!’ শুধু মুখে বলাই নয়। কোমরে কনুই দিয়ে এমন গুঁতা দেন যে সোজা হয়ে না দাঁড়িয়ে দ্বিতীয় কোনো বিকল্প থাকে না। এ কথা শুনেছি যাত্রীদের মুখে।

বঙ্গীয় যাত্রীদের সবাই যে খুব নম্র-ভদ্র, তা আমরা হলফ করে বলব না। দাঁড়ানো নিয়ে, বসা নিয়ে, ভাড়া পরিশোধ নিয়ে বচসা হয়ে থাকে চালক-হেলপারদের সঙ্গে অনেক যাত্রীর। বচসা গড়ায় হাতাহাতি পর্যন্ত। ক্ষেত্রবিশেষে দোষ যাত্রীরই। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দোষ পরিবহন কর্তৃপক্ষের।

বাস যদি কানায় কানায় পূর্ণ থাকে, তাহলে নির্দিষ্ট স্টপেজে থামবে যাত্রীদের ওঠা-নামা করাতে, তার নিশ্চয়তা নেই। স্টপেজে না থামতে দেখে কোনো যাত্রী হুংকার দিয়ে বাসের গায়ে থাপ্পড় মারলেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও চালক বাস থামালেন বটে, তবে তা শ দু-এক গজ দূরে এবং বাসটি সম্পূর্ণ থামবে না। চালক বাস থামিয়ে যাত্রীকে বাসে ওঠালে তাঁর দায়িত্ব। নামাতে বাধ্য নন। চলন্ত অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীকে নামতে হবে। তাতে যদি তার মৃত্যু হয়, অথবা হুমড়ি খেয়ে পড়ে তার হাঁটু ভাঙে—কুচ পরোয়া নেই। ওই যে পথের মধ্যে পড়ে অপমৃত্যু, তার দায় কেউ নিয়েছে—এমন কথা আমি অন্তত শুনিনি। ওই অপমৃত্যুর জন্য দায়ী কেউ সপ্তাহখানেক হাজতবাস করেছে, এমন খবরও কোনো কাগজে পড়িনি।

গণপরিবহন আজ বাংলার মানুষের জন্য অভিশাপ। কী রকম অভিশাপ এবং কতটা অভিশাপ, তা যাঁরা পাজেরো, প্রাডো, বিএমডব্লিউ হাঁকান, তাঁদের পক্ষে ধারণা করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। যাঁরা নিজের বাড়ির পোর্চের নিচ থেকে গাড়িতে উঠে গন্তব্যের দোরগোড়ায় গিয়ে নামেন, তাঁদের পক্ষে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে ফুটপাতে বাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করার বিড়ম্বনা কী, তা বোঝা সম্ভব নয়। তবে তাঁদের কেউ যদি তাঁদের প্রথম জীবনের দিকে চোখ বন্ধ করে তাকান, দেখতে পাবেন বাস বা হিউম্যান হলারে যাতায়াতের সুখ কাকে বলে।

মহানগরের মানুষের জীবনযুদ্ধ শুরু হয় সকাল থেকে। গণপরিবহনের জন্য ফুটপাতে অপেক্ষা। বাস বা মিনিবাস আসছেও। আসে, আবার এক-দুই করে চলেও যায়। প্রতিটির দরজায় পাঁচ-সাতজন ঝুলছে। কারও এক পা পা-দানিতে, আরেক পা বাইরে বাঁশের খুঁটির মতো ঝুলে আছে। কারও বা এক পাটি স্যান্ডেল ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে যায় রাস্তায়।

বাংলার নারীকে নিজের সংসারের মধ্যে অত্যাচার সইতে হয়। কর্মজীবী নারীদের কর্মস্থলে নির্যাতন হজম করতে হয় এবং প্রতিদিন তাঁকে ঘর থেকে বেরিয়ে কর্মস্থলে যাতায়াতের সময় গণপরিবহনে অত্যাচার সইতে হয় নিঃশব্দে। শুধু চাপাচাপি নয়, চিমটি পর্যন্ত খেতে হয়। অল্পবয়সী কোনো নারী যদি হন সুন্দরী, তাহলে তাঁর যন্ত্রণার শেষ নেই।

অনেক সময় যাত্রীবাহী বাসের ছাদ দেখলে মনে হয় সেখানে জনসভা হচ্ছে। আমাদের ট্রেনগুলোর ছাদে তাকালে মনে হয় যেন চলন্ত জনসভা। মানুষের যাতায়াতের জন্য বাসের খোল রয়েছে। জনবিস্ফোরিত দেশে সব যাত্রীকে বাসের খোলে ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই কেউ ওঠে ছাদে। ছাদে ওঠার জন্য বাসমালিকদের দোষারোপ করা যাবে না। যাত্রীকে তার গন্তব্যে যেতে হয়। সুতরাং, বাসের ভেতরই কী আর ছাদই কী?

মহানগরে বাস-মিনিবাসের সংকট হবে কেন? বিআরটিসির লাল রঙের বাসগুলো কোথায়? কোন কর্তৃপক্ষ সেগুলো চালায়? ব্যক্তির কাছে যদি লিজই দেওয়া হবে, তাহলে ওই সংস্থা রাখার দরকার কী? সরকারি বাস এত নষ্ট হয়ে ডিপোতে পড়ে থাকে কেন? ট্রেন গেছে। সরকারি বাসও শেষের পথে। প্রাইভেট গণপরিবহনের মালিকদের স্বার্থ আর কতভাবে রক্ষা করা হবে?

বাসের গায়ে বড় করে লেখা ‘বিরতিহীন’, কিন্তু দেখা যাচ্ছে, প্রতি দুই শ গজ পর যাত্রী ওঠানো হচ্ছে এবং থামছে রাস্তার মধ্যে যানজট বাঁধাতে। ‘গেটলক’ লেখা আছে দরজার ওপরে। সে দরজা হাট করে খোলা এবং দরজাতেই জনা পাঁচেক দাঁড়িয়ে বা ঝুলছে। গেটলক, বিরতিহীন বা সিটিং সার্ভিস খেয়ালের বশে লেখা হয়নি। অন্যায্যভাবে ভাড়া আদায় করার জন্য লেখা হয়েছে। সরকার থামাতে পারে না। কী করে পারবে? মালিকদের ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয় সরকারি লোকদের। চাঁদার টাকা তোলা হয় যাত্রীদের ঘাড় মটকে। সাধারণ মানুষ করজোড়ে সরকার বা বাসমালিকদের বলেনি যে কথিত ‘সিটিং সার্ভিস’ তুলে দিন। তারা চেয়েছিল শঠতার অবসান। প্রতারণার অবসান। গণপরিবহনে অপমান ও অত্যাচারের অবসান। অন্যায্য ভাড়া আদায় ও নিষ্ঠুরতা থেকে মুক্তি।

সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক একটি সর্বোচ্চ কমিটি আছে। কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এর সদস্য। আমাকেও সরকার অনুগ্রহ করে তাতে জুড়ে দিয়েছে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে। তিন-চার মাস পরপর এর সভা যখন হয়, তখন মালিক সমিতি ও শ্রমিকনেতাদের উচ্চকণ্ঠ বক্তৃতার কারণে নাগরিকদের পক্ষে আমার কিছু বলা সম্ভব হয় না। তাঁরা ধর্মঘট ডাকার ক্ষমতা রাখেন, আমি রাখি না।

গত কয়েক বছরে যেটা বুঝতে পেরেছি, মোবাইল কোর্ট বসিয়ে  বিআরটিএর কর্মকর্তারা গণপরিবহনের নৈরাজ্য দূর করতে পারবেন না। বিষয়টি এখন একেবারেই রাজনৈতিক এবং তা শুধু রাজনৈতিকভাবেই সমাধান করা সম্ভব।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক  গবেষক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0