বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জলবায়ু সম্মেলনে আরও বহু প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে, আরও বহু বিতর্ক হবে, আশাবাদও ব্যক্ত হবে। তবে সমস্যা হচ্ছে, এখানে ভাষা আর ধারণার মারপ্যাঁচ থাকে বেশি। এর প্যাঁচ খোলার দায়িত্ব আমাদের মতো দেশগুলোতে কেউ অনুভব করেন না। অথচ উন্নত বিশ্বের গণমাধ্যমে এসব সম্মেলনের সময় নানা গ্রাফিক, সিম্পল গাইড, তুলনামূলক তালিকা ও পাওয়ার পয়েন্ট প্রকাশ করে সাধারণ মানুষকে এটা বুঝতে সহায়তা করা হয়। সেখানে পরিবেশবিষয়ক সহজ জ্ঞানদানের প্রক্রিয়াও শুরু হয় প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায় থেকে।

আমাদের মতো দেশে এসব নেই। জলবায়ু সম্মেলনের মতো বিষয় তাই এখানে সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য বিষয়। আমি অনেক ‘বিশেষজ্ঞ’ পর্যায়ের মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে বোঝার দুর্বলতা লক্ষ করেছি। অথচ জলবায়ুসহ অনেক পরিবেশ চুক্তিতে এসব বিষয়ে জনগণের সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বেশি ঝুঁকিতে থাকা আমাদের মতো দেশে এর গুরুত্ব আরও বেশি।

২.

এখন গ্লাসগোতে যে সম্মেলন হচ্ছে, তাতে নতুন কোনো চুক্তি হচ্ছে না। এ সম্মেলন হচ্ছে ১৯৯২ সালের ইউএনএফসিসি কনভেনশনের পক্ষের রাষ্ট্রগুলোর (কনফারেন্স অব দ্য পার্টি সংক্ষেপে সিওপি বা কপ) মধ্যে এবং সেই কনভেনশনের আলোকে গৃহীত প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সর্বজনীন, সর্বশেষ এবং সম্ভবত চিরস্থায়ী চুক্তিটি হচ্ছে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি। শিল্পযুগ–পূর্ব সময়ের তুলনায় (১৮৫০-১৯০০) পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা এ সময়ের মধ্যে কমপক্ষে ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি পেয়েছে। যার ফলে আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যায়, হিমবাহ গলে সমুদ্রের স্তর উঁচু হয়ে ওঠে, বিভিন্ন নিচু এলাকায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি ঢুকে যায়, এতে জীববৈচিত্র্য ও প্রাণীর আবাসস্থলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

তাপমাত্রা একই গতিতে বাড়তে থাকলে আগামী ৫০ বছরে পৃথিবীর অধিকাংশ এলাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। প্যারিস চুক্তিতে তাই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশ নিচে সীমাবদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত এবং তা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করার অঙ্গীকার গৃহীত হয়। এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের বৃদ্ধি ঠেকানো এবং ২০৫০ সালের দিকে তা শূন্যের কোঠায় (নেট-জিরো) নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।

বিশ্বে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার কোটি (!) গাছ কেটে ফেলা হয়েছে নগর ও বসতি নির্মাণ, কৃষি ও খামারের সম্প্রসারণ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও অবৈধ বাণিজ্যের কারণে। প্রতিবছর এখনো প্রায় ২০০ কোটি গাছ কেটে ফেলা হয় এসব কারণে। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হলে তা শুধু বন্ধ করা নয়, নতুন বনায়নের মাধ্যমে ক্ষতিমোচনের চেষ্টাও করতে হবে।

এর বাস্তবায়ন খুবই জটিল, ব্যয়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য। কারণ, এটি করতে হলে জীবাশ্ম জ্বালানির (যার ওপর আমাদের শিল্পকারখানা, যানবাহন, ভোগবাদী জীবনাচরণ নির্ভরশীল) ব্যবহার এবং বন ও জলাশয় উজাড় বন্ধ করতে হবে। মিথেনের উৎস (যেমন গবাদিপশুর খামার ও ফসলের ভূমি) নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব জ্বালানির (যেমন সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ) ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাপক বনায়ন করতে হবে। এটি কতটা কঠিন তার একটি উদাহরণ এখানে তুলে ধরা হলো। বিশ্বে এখন পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার কোটি (!) গাছ কেটে ফেলা হয়েছে নগর ও বসতি নির্মাণ, কৃষি ও খামারের সম্প্রসারণ, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও অবৈধ বাণিজ্যের কারণে। প্রতিবছর এখনো প্রায় ২০০ কোটি গাছ কেটে ফেলা হয় এসব কারণে। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হলে তা শুধু বন্ধ করা নয়, নতুন বনায়নের মাধ্যমে ক্ষতিমোচনের চেষ্টাও করতে হবে।

এ বিশাল কর্মযজ্ঞ কীভাবে সম্পাদন করতে হবে, তার প্রাথমিক কর্মকৌশল প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে সব পক্ষ রাষ্ট্র কতটুকু কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারবে এবং কীভাবে তা করবে, তা ঠিক করে জানাতে বলা হয়। যে দলিলে এটি জানানো হবে, তার নাম হচ্ছে ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন বা সংক্ষেপে এনডিসি। তবে প্রায় ২০০ দেশের যেসব এনডিসি পাওয়া গেছে, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৩ ডিগ্রির বেশি বেড়ে যাবে। যা প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনতে পারে। এ জন্য পাঁচ বছর অন্তর অন্তর প্রতিটি রাষ্ট্রের নতুন এনডিসিতে আরও বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশল জমা দেওয়ার অঙ্গীকারও করা হয়েছে এতে।

৩.

এনডিসি বা দীর্ঘমেয়াদি কর্মকৌশল মূলত কাগুজে অঙ্গীকার, এর মধ্যেও বহু ফাঁকি রয়েছে। যেমন অনুন্নত অনেক দেশের এনডিসিতে কার্বন নিঃসরণ কমানোর যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তা নিউমার্কেটে শাড়ির মূল্য হ্রাস কৌশলের সঙ্গে তুলনীয়। একসময় এসব দোকানে শাড়ির দাম দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ মূল্যহ্রাসের বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো। একইভাবে বহু স্বল্পোন্নত দেশের এনডিসিতে প্রচলিত (বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল) হারে কার্বন নিঃসরণ ৫ বছর পরে ৩০ শতাংশ বাড়বে দেখিয়ে ১০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্যমাত্রা দেখানো হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে অনুন্নত দেশের এ দায়িত্ব পালন উন্নত দেশগুলো থেকে অর্থ, প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য সহায়তা পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল, যা এখনো উল্লেখযোগ্য পরিমাণে পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের দলিলে অস্পষ্টতা রয়েছে (যেমন আমেরিকার তুলনায় চীনের), এতে লক্ষ্যমাত্রায়ও ভিন্নতা রয়েছে। যেমন এটি যারা জমা দিয়েছে, তার মধ্যে অধিকাংশ দেশ ২০৫০ সালের মধ্যে জিরো কার্বন নিঃসরণের কথা বললেও কোনো কোনো দেশ (যেমন চীন ও রাশিয়া) এটি ২০৬০ সালের মধ্যে করবে বলেছে। অনেক দেশ এটি এখনো জমাও দেয়নি। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে শুধু নেপাল এটি জমা দিয়েছে, ভারত ঘোষণা দিয়েছে তারা নেট-জিরো নিঃসরণ করবে ২০৭০ সাল নাগাদ!

জলবায়ুবিষয়ক চুক্তিগুলোতে আরেকটি অমীমাংসিত বিষয় হচ্ছে অ্যাডাপটেশন–সম্পর্কিত বিধানগুলো। অ্যাডাপটেশন মানে হচ্ছে জলবাযু পরিবর্তনের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা। যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূল অঞ্চলে সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের ঘটনা ও তীব্রতা বেড়েছে। এখন সেখানে বসবাস করতে হলে উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তির বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র, প্রাক্-সতর্কতা ব্যবস্থা ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হবে। এ জন্য বিপুল অর্থ, আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা লাগবে। তাই বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে প্রতিবছর ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য দেওয়ার যে অঙ্গীকার শিল্পোন্নত দেশগুলো করেছে, তা বাস্তবায়নের লক্ষণ এখনো খুবই কম। আবার প্যারিস সম্মেলনে লস অ্যান্ড ড্যামেজ (ক্ষতি এত বেশি হয়েছে যে তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে থাকার অবস্থাও নেই) বিধানের অধীন অর্থায়নের যে আলোচনা রয়েছে, তাতে শিল্পোন্নত দেশগুলো কোনো সাড়াই দিচ্ছে না এখন পর্যন্ত।

৪.

গ্লাসগো সম্মেলনে এখন পর্যন্ত অর্জিত অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য বিভিন্ন অ্যাজেন্ডা, নীতি, কর্মসূচি ও কর্মকৌশল ঠিক করা হচ্ছে। এনডিসিগুলো তৈরি ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা বাড়ানো ও তা নিরীক্ষার ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর উপায় নির্ধারণ করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বহুজাতিক কোম্পানি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বেসরকারি খাতের কার্যকর অংশগ্রহণের নীতিকাঠামো ঠিক করা হচ্ছে। এখানেই সব অর্জিত হবে, এমন কোনো কথা নেই। প্রতিটি কপ-এ লক্ষ্য থাকে অন্তত কিছু বিষয়ে অগ্রগতির এবং পরবর্তী কপ-এর জন্য আশাবাদের ভিত্তি সৃষ্টির। এটি সম্ভবত হবে এবার।

আমাদের উচিত এসব সম্মেলন নিয়ে ব্যাপক পর্যায়ের আলোচনা ও জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। স্কুল-কলেজে বিতর্ক, আলোচনা ও পাঠ্যসূচিতে এসব বিষয় সহজভাবে নিয়ে আসা। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এগুলো সচিত্র, আকর্ষণীয় ও সহজভাবে ব্যাখ্যা করা। রাজনৈতিক দল ও অ্যাকটিভিস্ট ফোরামে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির প্রয়াস নেওয়া।

ব্যাপক জনসচেতনতা ও প্রণোদনা মানুষকে জলবায়ুবান্ধব করে তুলতে ভূমিকা রাখে। আর মানুষ জলবায়ু ও পরিবেশবান্ধব না হলে কোনো সরকার বা সম্মেলন খুব বেশি ভূমিকা রাখতে পারে না।

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন