বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

গুজব বা অপতথ্যের পেছনে যখন কোনো ব্যক্তিবিশেষ থাকে, তখন সেটি যত গ্রহণযোগ্যতা পায়, তার চেয়ে বেশি পায় যখন তার পেছনে কোনো নিউজ পোর্টালের লিংক থাকে। সেটি তখন মানুষের কাছে অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। সাধারণ পাঠকদের অনেকেই নিউজ পোর্টালের মান বা যোগ্যতা নিয়ে খুব বেশি চিন্তা করেন না। ফলে কিছু কিছু নিউজ পোর্টাল সেই হীন সুযোগটা গ্রহণ করে। খুব সচেতনভাবে অপতথ্য ছড়ায়। নিউজ পোর্টালে থেকে এমন গুজবের ব্যবসা করার সুবিধা অনেক। ধরা পড়লে দ্রুত মুছে দেওয়া যায়। লেখা পাল্টে দেওয়া যায়। ছবি পাল্টে দেওয়া যায়। ছাপা কাগজে এই সুযোগ নেই। জাতীয় পর্যায়ের অনেক নামীদামি পোর্টালকেও এমন চিকন চালাকি করতে দেখা যায়। ফলে আঞ্চলিক বা মফস্বল পর্যায়ের পোর্টালগুলোর ক্ষেত্রে কেমন ঘটবে, এটা আন্দাজ করা কঠিন কিছু নয়।

তার মানে এই নয় যে অনলাইন নিউজ পোর্টাল মানেই গুজবের কারখানা! অসংখ্য ভালো পোর্টাল আছে, যারা নিষ্ঠার সঙ্গে সাংবাদিকতা করছে। ছাপা সংবাদমাধ্যম কিংবা ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সমান-সমানে পাল্লা দিচ্ছে। আবার অনেক অনলাইন পোর্টাল আছে, যারা নেহাত প্রয়োজনীয় জ্ঞান এবং প্রযুক্তি না থাকার কারণে বিভ্রান্ত হচ্ছে। প্রশিক্ষিত জনবল নেই, উপার্জন নেই, সৎ সাংবাদিকতা করার কোনো প্রতিজ্ঞাও নেই। তাদের অনেকের পক্ষেই গ্রহণযোগ্য উপায়ে সাংবাদিকতা করা কঠিন হয়ে যায়। দ্রুত হিট পাওয়ার জন্য তারা এক উদ্ভট ‘কপি-পেস্ট’ সংস্কৃতি চালু করেছে সাংবাদিকতার নামে। অনেকেই আবার এটাকেই ‘সাংবাদিকতা’ মনে করে। জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘ভাই, আমি তো অমুক (বড়) পত্রিকা বা পোর্টাল থেকে কপি করেছি। আমার কী দোষ!’

অনলাইনে সবাইকে একই রকম দেখায়। ভালো পোর্টালের লিংক যেমন দেখাবে, ভুতুড়ে পোর্টালের লিংক বা ভেতরের চেহারা খুব বেশি ভিন্ন হবে না। সাধারণ পাঠকের পক্ষে এদের ফারাক করা বেশির ভাগ সময়েই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় তারা সচেতনভাবেই অনেক নামী এবং ভালো পত্রিকার অনুরূপ নাম এবং অঙ্গসজ্জা ব্যবহার করে।

অনলাইনে সবাইকে একই রকম দেখায়। ভালো পোর্টালের লিংক যেমন দেখাবে, ভুতুড়ে পোর্টালের লিংক বা ভেতরের চেহারা খুব বেশি ভিন্ন হবে না। সাধারণ পাঠকের পক্ষে এদের ফারাক করা বেশির ভাগ সময়েই কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় তারা সচেতনভাবেই অনেক নামী এবং ভালো পত্রিকার অনুরূপ নাম এবং অঙ্গসজ্জা ব্যবহার করে।

এসবই জানা গেছে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ-এর একটি সাম্প্রতিক গবেষণায়। দেশের আনাচকানাচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোর সক্ষমতা নিয়ে আমরা একটা গবেষণা চালাই। সেখানে দেখেছি, আমাদের ২১১টি নমুনার মধ্যে ৬৩ শতাংশই অন্য কোনো পত্রিকার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ নিউজ পোর্টালের বাইরেও তাদের কোনো সংবাদপত্র আছে। মাত্র ২০ শতাংশ পোর্টাল দাবি করছে, তাদের সংবাদকর্মীদের সবাই সার্বক্ষণিক। প্রায় ৫০ শতাংশ পোর্টাল জানাচ্ছে তাদের কোনো আয় হয় না, পুরোটাই ভর্তুকি দিতে হয়। যাদের কিছু আয় হয়, তারা সেটা পায় গুগল অ্যাডসেন্স থেকে, বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন থেকে।

কোন কোন উৎস থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে এসব পোর্টাল? একাধিক উত্তর দেওয়ার সুযোগ ছিল, তাই ২১১টির মধ্যে ২০৫টি পোর্টালই খবর সংগ্রহ করে নিজস্ব সংবাদদাতা দিয়ে। দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে ৫১ শতাংশ, সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার করা অপরাপর নিউজ পোর্টাল কিংবা বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্ট থেকে সংবাদ সংগ্রহ করে প্রায় ৪০ শতাংশ পোর্টাল। সরকারি বিজ্ঞপ্তি এবং সংবাদ এজেন্সির কথাও বলেছে বেশ কিছু পোর্টাল।

গুজব নিয়ে এসব নিউজ পোর্টালের ধ্যানধারণাও বেশ আলোচনার দাবি রাখে। সাধারণ সমীক্ষায় দেখা গেছে, তাদের গুজব নিয়ে বোঝাপড়া বেশ ভালো। খবরের সঙ্গে তথ্যসূত্র না থাকলে চটকদার শিরোনাম থাকলে, লিংক না দিয়ে শুধু স্ক্রিনশট দিয়ে সংবাদ প্রচার করলে সেসব সংবাদকে তারা গুজব বলে সন্দেহ করে। প্রায় ৪২ শতাংশ পোর্টালই মনে করে, গুজব যেকোনো ফরম্যাটেই তৈরি হওয়া সম্ভব। এতে বোঝা যায়, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পোর্টাল অন্তত গুজব তৈরির কারিগরি বিষয়ে ওয়াকিবহাল। তবু ৩০ শতাংশ পোর্টাল মূলধারার পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদকে সন্দেহ করে না। সংবাদের সঙ্গে ভিডিও থাকলে তাকে সন্দেহ করে না ১৫ শতাংশ পোর্টাল।

৪৫ শতাংশ নিউজ পোর্টাল মনে করে, পাঠক আকৃষ্ট করার জন্য ‘ক্লিকবেইট’ বা চটকদার শিরোনাম একটি গ্রহণযোগ্য রীতি! তারা নিজেরাই তাদের সক্ষমতা মূল্যায়ন করেছে, আর তা থেকেই আমরা জেনেছি ৭১ শতাংশ পোর্টালের যথাযথ প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব আছে, ৬৪ শতাংশ মনে করেন, তঁাদের সম্পাদকীয় দক্ষতা বাড়ানো দরকার, ৫৯ শতাংশেরই ভালোভাবে তথ্য-যাচাই বা ফ্যাক্ট-চেক করার সামর্থ্য নেই, এমনকি ৫১ শতাংশ পোর্টাল জানাচ্ছে, তাদের প্রতিবেদন লেখার প্রশিক্ষণ দরকার।

অনেকেরই ধারণা, যথাযথ জ্ঞানের অভাবেই সংবাদমাধ্যমগুলো অপতথ্য ছড়ায়। কিন্তু আমাদের গবেষণায় অংশ নেওয়া পোর্টালগুলো বিপরীত ধারণা পোষণ করে। তাদের মতে, অসাবধানে বা না জেনে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর ঘটনা খুব কম। বরং তারা মনে করে, জেনেশুনে মিথ্যাকে সত্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়া, হিট বাড়ানোর মাধ্যমে টাকা উপার্জন কিংবা ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীবিশেষের ব্যাপারে ঘৃণা ছড়ানোকে উপলক্ষ করেই গুজব বেশি ছড়ানো হয়। বেশির ভাগ পোর্টালই মনে করে যে পাঠকেরা তথ্য ও মতামতের মধ্যে পার্থক্য করতে পারেন না। যেসব কারণে অপতথ্য ছড়াতে থাকে। এর কারণ হয়তো এটা যে আমরা শ্রেয়তর পোর্টালগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছি। তারা নিশ্চয়ই সৎ সাংবাদিকতা করার আগ্রহ থেকেই আমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছেন।

তবে এখানে এসে আমাদের থমকে যেতে হলো। তাদের কথামতো, যদি বেশির ভাগ অনলাইন মাধ্যম জেনেশুনে গুজব ছড়ায়, তাহলে সেটা ঠেকাবে কে? সরকারের যে পর্যবেক্ষণ সেল আছে, তার পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ অনলাইন পোর্টালকে পাহারা দেওয়া নিতান্ত অসম্ভব। দেশের কোথায় কোন গ্রাম, কোন পাড়া থেকে একটা অনলাইন পোর্টাল প্রকাশিত হচ্ছে, সেটা ঢাকায় বসে কীভাবে নজরদারি করা সম্ভব? আর কঠোর আইন যতই বানানো হোক, সেটি কখনোই কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। গণসচেতনতা দরকার। গণনজরদারি দরকার। গুজব বা অপতথ্যের বিস্তার যে গোটা সমাজের জন্য সাংঘাতিক ক্ষতিকর একটা বিষয়, সেটা নিউজ পোর্টালসহ সবাইকে বুঝতে হবে।

সেই জায়গা থেকে আমরা অন্য রকম একটা কর্মশালার কথা ভাবলাম। গুজবকে নিছক একটা অপসাংবাদিকতা হিসেবে দেখার কারণে আমরা ভুলেই যাই যে গুজব কিংবা মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে আসলে মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। আর তাতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। যখনই আমরা কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মিথ্যা কথা লিখি, সেটা নানানভাবে সেসব ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মানবাধিকারকে বিপন্ন করে। এভাবে গুজব ঠেকানোর জন্য সুস্থ তথ্য সংস্কৃতির যে বলয় আমরা বানাতে চাই, সেটি শুধু সাংবাদিকের একার কাজ নয়। এই ধারণা থেকে আমরা তৃণমূল পর্যায়ের মানবাধিকারকর্মীদেরও আমাদের কর্মশালায় আমন্ত্রণ জানাই, যাতে করে তাঁরা নিজ নিজ এলাকার গুজব-সংস্কৃতি মোকাবিলায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। আমাদের উদ্দেশ্য একই এলাকার সংবাদকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীদের সমন্বয়ে একটা ইকোসিস্টেম তৈরি করা, যাতে তাঁদের সুষ্ঠু যোগাযোগের মাধ্যমে গুজবকে তার বিষাক্ত ডালপালা গজানোর আগেই থামিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়।


সুমন রহমান কবি, কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ

ফাইজুল করিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশেষজ্ঞ

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন