বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে দেশের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ সৃষ্টির পেছনে তাঁকে বলির পাঁঠা বানানোর প্রচেষ্টার জন্য ভাই গোতাবায়ার প্রতি ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। গত সোমবার তিনি শ্রীলঙ্কার বিভিন্ন প্রদেশ থেকে হাজার হাজার সমর্থককে কলম্বোয় নিয়ে আসেন। মাহিন্দা যাতে প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারেন, সেই দাবি তাঁরা তোলেন। মাহিন্দার সমর্থকেরা একপর্যায়ে রাস্তায় রাস্তায় সহিংসতা শুরু করেন। তাঁরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু করেন। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে এবং কলম্বোর ‘গলে ফেস গ্রিন’ চত্বরে তরুণ বিক্ষোভকারীরা যে অস্থায়ী শিবির গড়েছিলেন, সেগুলোর ওপর হামলা শুরু করেন। অনেক বিক্ষোভকারীকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠাতে সফল হন তাঁরা! গলে ফেস গ্রিন চত্বরে স্থাপিত বিক্ষোভকারীদের অস্থায়ী শিবির ধুলায় মিশিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল মাহিন্দা রাজাপক্ষের সমর্থকদের। কিন্তু পুলিশি হস্তক্ষেপে সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। কাঁদানে গ্যাস, জলকামানের সঙ্গে পিটুনি খেয়ে দাঙ্গাবাজেরা সরে যেতে বাধ্য হন।

কিন্তু ‘গোতা বাড়ি যাও’ প্রতিবাদকারীদের শান্তিপূর্ণ এই আন্দোলন যে শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে নয় বরং মাহিন্দা রাজাপক্ষের সমর্থকদের হাতে আক্রমণের শিকার হলো—তাতে আন্দোলনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়াটা অনিবার্য হয়ে যায়। শ্রীলঙ্কায় এরই মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে আরও খারাপ না হয়, সেটা থেকে জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রেসিডেন্টের। এই দুঃস্বপ্ন থেকে শ্রীলঙ্কার জনগণকে তিনি এবং একমাত্র তিনিই উদ্ধার করতে পারেন।

শ্রীলঙ্কার জনগণের সামনে এখন অস্তিত্বের সংকট। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়াকে এখন তাদের একটি প্রশ্নই করতে হবে, যদি শ্রীলঙ্কা ও দেশের জনগণের প্রতি তাঁর কোনো শ্রদ্ধা থেকে থাকে, তাহলে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে তাঁর এবং সরকার থেকে তাঁর দলের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শ্রীলঙ্কার সব সংকট সমাধানের শুরুটা এখানেই।

একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর আইনপ্রণেতাদের নিজেদের গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। মাহিন্দার সমর্থকদের হাতে মার খাওয়ার পর আইনপ্রণেতারা ফেস দ্য গলেতে যান সংহতি জানাতে। এ সময় বিক্ষোভকারীরা তাদের কাউকে কাউকে কঠোরভাবে প্রতিরোধ করেন, আবার কাউকে কাউকে স্বাগতও জানান। ভবিষ্যতে সরকার গঠনের দাবিদার এই আইনপ্রণেতারা। তঁাদের নিজেদের আত্মমূল্যায়ন এবং নিজেদের অবস্থান পরিবর্তনের সময় এসেছে।

প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া যদি এখন শ্রীলঙ্কার দিকে ফিরে তাকান, তাহলে কী দেখতে পাবেন? কৃষিতে তাঁর নেওয়া জৈব সার ব্যবহারের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। যে দেশটি একসময় ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল, প্রচুর পরিমাণে শাক-সবজি উৎপাদিত হতো, যেখানকার চা–শিল্পের খ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ছিল সমৃদ্ধিশালী—সেই দেশটাকেই তিনি কত অপূরণীয় ক্ষতি করে ফেলেছেন। একইভাবে অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে শ্রীলঙ্কা চরম ডলার–সংকটে পড়েছে, যা জীবনযাত্রার প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে। এর ফলে শুরু হওয়া শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এক মাস পেরিয়েছে। এ প্রতিবাদ আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।

প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষের দল বাস্তবিক অর্থে পরাজয়ের বৃত্তে প্রবেশ করতে শুরু করে নতুন অর্থমন্ত্রী নিয়োগের মধ্য দিয়ে। প্রেসিডেন্ট একসময় সর্বদলীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানাতে বাধ্য হন। কিন্তু সেই আহ্বানে কোনো দলই সাড়া দেয়নি। এরই মধ্যে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রস্তাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সংলাপ চলমান রয়েছে।

প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের দাবিতে প্রতিবাদ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া আর জনসম্মুখে আসেননি। বিরোধী দলগুলোর আইনপ্রণেতারা এরই মধ্যে আইনসভায় প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে একটা অনাস্থা প্রস্তাব তুলেছিলেন। প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে কাকে পদত্যাগ করা উচিত, তা নিয়ে শাসক দলে দুজনের সমর্থকদের মধ্যে বিবাদ চলতে থাকে। আর এর মধ্যে জনগণের জীবনমান ভয়ংকরভাবে নামতে শুরু করে।

শ্রীলঙ্কার জনগণের সামনে এখন অস্তিত্বের সংকট। প্রেসিডেন্ট গোতাবায়াকে এখন তাদের একটি প্রশ্নই করতে হবে, যদি শ্রীলঙ্কা ও দেশের জনগণের প্রতি তাঁর কোনো শ্রদ্ধা থেকে থাকে, তাহলে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে তাঁর এবং সরকার থেকে তাঁর দলের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শ্রীলঙ্কার সব সংকট সমাধানের শুরুটা এখানেই।

শ্রীলঙ্কার দ্য আইল্যান্ড পত্রিকার অনলাইন থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

সাঞ্জা দ্য সিলভা জয়তিলকা শ্রীলঙ্কার লেখক ও মানবাধিকারকর্মী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন