জল-স্থল-বায়ু, প্লাস্টিক-পলিথিন কমাচ্ছে সর্বত্র আয়ু। তল থেকে অতল, শিকড় থেকে শিখর, কারণে-অকারণে এসবের সয়লাব। অপচনশীল প্লাস্টিকের আয়ু ৫০০ বছর পর্যন্ত। আবার প্লাস্টিক একপর্যায়ে ভেঙে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। যাকে বলা হয় মাইক্রোপ্লাস্টিক। আর এই মাইক্রোপ্লাস্টিক নিমেষে মিশে যায় খাদ্যচক্রে, প্রবেশ করে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর সবচেয়ে সংবদনশীল অংশে। বৈশ্বিক অলাভজনক সংস্থা প্লাস্টিক ওশিন্স ইন্টারন্যাশনালের (পিওআই) তথ্য অনুসারে, বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর ৩০ কোটি টন প্লাস্টিক উৎপাদন হয়। এর অর্ধেক একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া হয়। এর মধ্যে বছরে ৮০ লাখ টনের বেশি প্লাস্টিক সমুদ্রে পড়ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ পরিবেশ (ইউএন এনভায়রনমেন্ট)।

উপরিউক্ত পরিসংখ্যান থেকে প্রশ্ন তোলা ও সমাধান খোঁজা যায়। আমরা কি একটু উদ্যোগী হলে প্লাস্টিক বর্জ্য (পলিথিনসহ) কমিয়ে আনতে পারি না? কারণ, একবারে ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিনের বিকল্পগুলোর সঙ্গে আমরা ঐতিহ্যগতভাবে পরিচিত। এর জন্য নতুন কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। শুধু আমাদের অতীতের জীবনপদ্ধতি ফিরিয়ে আনলেই সমস্যার সমাধান অনেকাংশে লাঘব করা সম্ভব।

শিরোনামে বলা হয়েছে, চলুন বোতল নিয়ে বাজারে যাই। এরপর শুরুতেই কিছু শব্দের স্মৃতিচারণা করা হয়েছে, যা আমাদের গ্রামীণ সংসারের আদি সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত। ‘কডুত্তেল’ আর ‘কিরিচ তেল’ আনার জন্য সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনগুলোতে বাজারে যেতেন গ্রামের মানুষ। তাঁদের হাতে থাকত কাচের বা ধাতব বোতল। এমনও পরিবার ছিল, যাঁদের সংসারের একটি কেরোসিনের বোতল আর একটি ভোজ্যতেলের বোতল কয়েক দশক ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁরা প্লাস্টিকের মাজুনি নয়, ব্যবহার করতেন প্রাকৃতিক ‘ছোপা’। পানি রাখার জন্য ব্যবহার করতেন মাটির কলস। পানের জন্য বা শৌচাগারের জন্য ব্যবহার করা হতো লোডা। পানি, গুড় ও বীজজাতীয় জিনিস রাখার জন্য ব্যবহার করা হতো পাকা লাউয়ের খোল দিয়ে তৈরি পাত্র। যার প্রচলন আমাদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কোনো কোনো পরিবারে এখনো চলমান। নির্দিষ্ট হাট্‌ডুয়া ব্যাগ নিয়ে তাঁরা বাজারে যেতেন। ওই থলেতেই সব জিনিস কিনে নিতেন। লম্বাটে জিনিস যেমন ডাঁটা, আখ, কচু প্রভৃতি নিতেন বাইল বা পাটের রশিতে বেঁধে। অথচ এসব উপকরণ এখনো হারায়নি। ভবিষ্যতেও হারাবে না। কারণ, এগুলো প্রাণের মূলের সঙ্গে জড়িত। এগুলোর বিবর্তন হতে পারে, কিন্তু বিলুপ্তি ঘটার কথা নয়। তাহলে কেন এসব পরিবেশবন্ধু জিনিস নিত্যদিন ব্যবহার করি না?

বাজার এখন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের প্লেট, কাপ, চামচ, বোতল, বাটি, গ্লাস, বক্স, চামচ প্রভৃতিতে সয়লাব। এর বড় অংশ শুধু একটু সচেতন হলেই ব্যবহার এড়ানো সম্ভব। এর বিকল্প হতে পারে সুপারির খোল, কাগজ, পাট এবং কলা, বট প্রভৃতি গাছের পাতার তৈরি জিনিস। সুপারি পাতার খোলের তৈরি জিনিসের ব্যবহার ভারতের তামিলনাড়ুতে বেশ কিছুদিন আগে থেকে বাণিজ্যিকভাবে চলে আসছে। বাংলাদেশেও কোনো কোনো উদ্যোক্তা চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

আমরা যা করতে পারি

হার্ভার্ড সায়মনের র‌্যাশনাল কম্প্রেহেনসিভ মডেল এ ক্ষেত্রে পাঠ হতে পারে। যার মূল কথা হলো, গুণগত মানের সঙ্গে আপস না করে কম ব্যয়ে অধিক লাভের বিকল্প খুঁজে বের করা। জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ ও প্রতিবেশের শত্রু প্লাস্টিকের ক্ষেত্রে এ মডেল ব্যবহার করতে পারি। এর জন্য শুধু প্রয়োজন আমাদের আদিম সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করা, লালন করা।

সঙ্গে রাখি বোতল বাজারের ব্যাগ

আমরা একটু উদ্যোগী হলেই স্বাস্থ্যকর বোতল ব্যবহার করতে পারি। ধাতব পদার্থের পাশাপাশি লাউয়ের স্বাস্থ্যকর খোল, বাঁশ ও পোড়ামাটি এর বিকল্প হতে পারে। এসব এখনো একটু খুঁজলেই পাওয়া যায়। অনেকে ব্যবহারও করছেন। নতুন নতুন উদ্যোক্তাও তৈরি হচ্ছে। চাহিদা বাড়লে তাঁদের উৎপাদনও বাড়বে। বাজার থেকে বোতলসমেত তেল না কিনে আমরা ভালো বোতল নিয়ে বাজারে যেতে পারি। শুধু তেল নয় অন্যান্য তরলের ক্ষেত্রেও একই আবেদন, যেমন গাভির দুধ। নিজের সঙ্গে রাখা থলেতে পানি পানের স্বাস্থ্যকর বোতল রাখা খুব বেশি কষ্টের নয়, অভ্যাসের ব্যাপারমাত্র। অন্যান্য বাজার করতে সহজেই পাট বা চট কিংবা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহার করা যায় ।

ওয়ান টাইম পণ্য

বাজার এখন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের প্লেট, কাপ, চামচ, বোতল, বাটি, গ্লাস, বক্স, চামচ প্রভৃতিতে সয়লাব। এর বড় অংশ শুধু একটু সচেতন হলেই ব্যবহার এড়ানো সম্ভব। এর বিকল্প হতে পারে সুপারির খোল, কাগজ, পাট এবং কলা, বট প্রভৃতি গাছের পাতার তৈরি জিনিস। সুপারি পাতার খোলের তৈরি জিনিসের ব্যবহার ভারতের তামিলনাড়ুতে বেশ কিছুদিন আগে থেকে বাণিজ্যিকভাবে চলে আসছে। বাংলাদেশেও কোনো কোনো উদ্যোক্তা চেষ্টা করে যাচ্ছেন। দেশে বিভিন্ন অনলাইনে এসব পাওয়া যাচ্ছে। প্লাস্টিকের পাত্রের বিকল্প হিসেবে বাঁশ ও কাগজ দিয়ে বানানো পণ্য এখন বাজারে দেখা যাচ্ছে। পলিথিনের বিকল্প হিসেবে ইতিমধ্যে পাটের তৈরি সোনালি ব্যাগ আবিস্কার হয়েছে। আমাদের দায়িত্ব এসব পরিবেশ বান্ধব উদ্যোগগুলোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

বেসরকারি সংস্থা এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে বছরে ওয়ান টাইম প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার টন। অথচ পলি ইথায়লিন ও পলি প্রপাইলিন বা এর কোনো যৌগের মিশ্রণে তৈরি প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করা নিষেধ। কারণ, এটি ‘বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (৬)’-এর ‘ক’ধারার লঙ্ঘন।

এ ধারায় বলা আছে, ...যেকোনো প্রকার পলিথিন শপিং ব্যাগ, বা পলিইথাইলিন বা পলিপ্রপাইলিনের তৈরি অন্য কোনো সামগ্রী বা অন্য যেকোনো সামগ্রী পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর, ...সারা দেশে বা কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় এমন সামগ্রী উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুত, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন বা ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ...করতে পারবে। এই নির্দেশ পালনে সংশ্লিষ্ট সব ব্যক্তি বাধ্য থাকবেন।

পরিবেশবাদীরা বলে আসছেন, এমনভাবে চললে দেশে ২০২৫ সালে দৈনিক ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পরিমাণ ৫০ হাজার টনে পৌঁছাবে। ২০১৪ সালে যা ছিল দিনে ২৭ হাজার টন।

শুরুটা হোক বাসাবাড়ি থেকেই

কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই ঢাকার মতো শহরগুলোর বাসিন্দারা গৃহবর্জ্য ফেলতে পলিব্যাগ ব্যবহার করে থাকেন। এই পলিব্যাগ সকালেই গাড়ি করে নিয়ে যান পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। অথচ প্রতিটি ভবনের নিচে নিজ নিজ মালিকদের উদ্যোগে একটি ছোট ডাস্টবিন রাখা যায়। আর ঘরের ভেতর বাসিন্দারা ব্যবহার করবেন দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় এমন বালতি বা ঝুড়ি। এর ফলে বালতি থেকে ডাস্টবিন, আর ডাস্টবিন থেকে ময়লার গাড়ি করে সোজা বর্জ্য গিয়ে পৌঁছাবে ডাম্পিং স্টেশনে। যেখানে পলিথিন ও প্লাস্টিকমুক্ত জৈববর্জ্য থেকে তৈরি হতে পারে স্বাস্থ্যকর জৈব সার। অথচ এসবের জন্য কারোরই বাড়তি ব্যয়ের প্রয়োজন হচ্ছে না। বরং সবারই ব্যয় সংকোচন কমে লাভ বাড়বে। যার ধারণা মেলে সায়মনের রেশনাল মডেলে।
একটু খেয়াল করলেই দেখা যায়, বাসাবাড়ির প্লাস্টিকের জিনিসগুলো একেবারেই অত্যাবশ্যক, এমনটা নয়। চেয়ার, মোড়া, ওয়ার্ডরোবের মতো বিষয়গুলো সহজেই বাঁশ-বেত-কাঠের জিনিস দিয়ে বিকল্প করা যায়। পানির জগের বিকল্প তো আছেই।
শিশুদের হাত থেকে প্লাস্টিকের খেলনা সরিয়ে ফেলা বাঞ্ছনীয়। সাধারণত নিম্নমানের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এসব খেলনা শিশুরা মুখেও দিয়ে থাকে।

আগে লাগাম টানতে হবে কোম্পানিগুলোর

বড় থেকে ছোট—সব কোম্পানি ক্রেতাকে আকৃষ্ট করতে বিভিন্ন আকারের পণ্য বাজারে ছাড়ছে। বর্তমানে এসবের সব কয়টির মোড়কই প্লাস্টিক ও পলিথিনের। অথচ বিস্কুট, মুড়ি, চানাচুর, তেল, লবণ, ডিটারজেন্ট পাউডার—এসব ইচ্ছে করলেই দোকানে রাখা বড় পাত্রে খোলা আকারে বিক্রি করা যায়, যা থেকে ক্রেতা তার পরিমাণমতো নিজের সঙ্গে আনা পাত্রে করে বা কাগজে মুড়িয়ে নিতে পারবেন। বহুদিন ধরে আমাদের বাজার ব্যবস্থায় এ রীতি প্রচলিত ছিল। পুঁজিবাদী অর্থনীতি এসে আমাদের সেই ব্যবস্থাকে নষ্ট করে দিয়েছে, নষ্ট করে দিয়েছে আমাদের অভ্যাসকেও। পলিথিন একেবারে ব্যবহার না করে বা কম ব্যবহার করে বাজার বা দোকান থেকে পণ্য ঘরে নিয়ে আসার বিষয়টি এখন আমরা কল্পনাই করতে পারি না।

আসুন পৃথিবীকে বাঁচাই, নিজেরা বাঁচি। আধুনিকতার সঙ্গে আদি সংস্কৃতির সেতু গড়ি। নিজে খাব আর মরে যাব, এই ‘চেতনা’ লালন কারোই কাম্য নয়। এই গ্রহের জন্য বিনিয়োগ করি ভালোবাসা, যা ছড়িয়ে থাকবে প্রাণ-নিষ্প্রাণ, প্রকৃতি, উদ্ভিদ, জল, স্থল সবখানে।

  • মো. ছানাউল্লাহ প্রথম আলোর সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন