default-image

চাঁদে মানুষের প্রথম পা ফেলার ৫০ বছর হলো এ বছর। এর মাঝে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কেবল রাশিয়া ও চীনের মহাশূন্যযান সফলভাবে সেখানে নামতে পেরেছে। ইসরায়েল ও ভারত চাঁদে সফল অভিযানকারী ‘চতুর্থ দেশ’ হতে চেয়েছিল। তাদের চেষ্টা চূড়ান্ত সফল হয়নি। এপ্রিলে ‘বেরিশিট’ (অর্থ ‘শুরু’) নামে ইসরায়েলের যানটি এবং সেপ্টেম্বরে ভারতের ‘চন্দ্রযান-২’ চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছেও প্রত্যাশামতো জমিনে নামতে পারল না। এ নিয়ে ইসরায়েলি ও ভারতীয় রাজনীতিবিদদের আফসোসের শেষ নেই।

তবে ব্যর্থতার এসব অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও বিশ্বব্যাপী নতুন করে চাঁদে অভিযানে হঠাৎ তুমুল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। যা অভিনব। যার সঙ্গে বিশেষ যোগ রয়েছে রাজনীতির। যা নতুন এক রাজনৈতিক-অর্থনীতিও বটে।

চাঁদের রাজনীতি চাঙা করে দিল চীন
১৯৬৯-এ ‘অ্যাপোলো-১১’ চাঁদে মানুষ নিয়ে গিয়েছিল কিংবা তারও আগে রাশিয়ার ‘ভস্তক-১’ ইউরি গ্যাগারিনকে মহাশূন্যে নিয়ে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার ঠান্ডাযুদ্ধজনিত মর্যাদার লড়াইয়ের অংশ হিসেবে। মানুষ চাঁদে যাওয়ার ২-৩ বছরের মধ্যে এ উত্তেজনার রেশ কেটে যায়। ‘মর্যাদার লড়াই’-এ হেরে ১৯৭৬-এর পর রাশিয়া ক্রমে এই প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রেও চাঁদে আসা-যাওয়ার বিষয়ে মানুষের আগ্রহ বেশ কমে যায়। কেবল ষাটের দশকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে চাঁদে ২৮টি মিশন পাঠিয়েছিল। অদ্ভুত ব্যাপার, আশির দশকে এ রকম মিশনের কথা সবাই ভুলে যায়। তবে মস্কো-ওয়াশিংটন সে সময় বিশ্বসমাজকে যেভাবে বিপজ্জনকভাবে দ্বিধাবিভক্ত করে ফেলতে পেরেছিল, চন্দ্রাভিযানেরও তাতে ছিল বড় হিস্যা।

সম্প্রতি বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের উত্থানের হাত ধরে চাঁদে যাওয়ার প্রবণতা নতুন করে চাঙা হয়েছে। তাতে জ্বালানি জোগাচ্ছে জাতিবাদী রাজনীতি। ২০১৩ সালে চীনের মনুষ্যবিহীন ‘চ্যাং’ই-৩’ চাঁদে যাওয়ার পর বিশ্ব প্রচারমাধ্যমের খেয়াল হয়, সর্বশেষ ৪০ বছর এ রকম কিছু আর ঘটেনি। এরপর ২০১৯-এ চীন ‘চ্যাং’ই-৪’ পাঠিয়ে চাঁদের বুকে মানুষের পদচারণের ৫০ বছর পূর্তি উদ্‌যাপন করায় ট্রাম্প চাইছেন নাসাও আবার চাঁদে মানুষ পাঠাক। ভারতের ‘চন্দ্রযান-২’ উৎক্ষেপণের পর নাসার শুভেচ্ছাবার্তা থেকে জানা গেল, তাদের আসন্ন সেই উদ্যোগের নাম ‘আর্টেমিস’। ২০২৪ কে তারা এ রকম অভিযানের বছর ভাবছে, যেখানে মহাশূন্যযানে মানুষও থাকবে। আগে নির্ধারিত সালটি ছিল ২০২৮। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনী প্রচারণার স্বার্থে রাজনৈতিক কারণেই তারিখটি এগিয়েছে। কারণ, ট্রাম্প আমেরিকাকে আবার ‘মহান’ বানাতে চান। এসব দেখে চীন বলছে, তারা মঙ্গলেও যেতে চায়। ২০২০-এর মাঝামাঝি তাদের মহাশূন্যযান ওই লক্ষ্যে যাত্রা করবে এবং পরের বছর ফিরে আসবে।

জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বড় এক জুয়া চাঁদে অভিযান
এটা খুব সংকীর্ণ মন্তব্য হবে যে চন্দ্রাভিযানমাত্রই অর্থনাশ। যেসব দেশ চাঁদে মানুষ বা মহাশূন্যযান পাঠাতে মরিয়া, তারা প্রযুক্তিগত বিকাশেও অন্যদের থেকে এগিয়ে থাকছে। বিগত দশকগুলোর অভিজ্ঞতা সেটাই বলে। পাশাপাশি এ রকম কর্মসূচি প্রচুর নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি করে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে আজকাল চন্দ্রাভিযানগুলোতে রাজনৈতিক লক্ষ্যই মুখ্য হয়ে উঠতে দেখা যায়। ১৯৬৬-এ রাশিয়ার ‘লুনা-৯’ চাঁদে নামতে সফল হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের ১১টি মিশন যে ব্যর্থ হয়, সেটা বিশ্বব্যাপী সামান্যই মনোযোগ পায়। কিন্তু ভারতের ‘চন্দ্রযান-২’–এর ব্যর্থতা বিশ্বজুড়ে অন্তত দুই দিন প্রধান এক সংবাদ হয়েছিল। এর কারণ, চন্দ্রযান-২ মহাশূন্য পাঠিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছিল রাজনীতিবিদদের উচ্চাভিলাষী সব মন্তব্য। এভাবে জনগণের মধ্যে অন্ধ এক প্রত্যাশা তৈরি করা হয়। রাজনীতি ও প্রচারমাধ্যম এই অভিযান থেকে বড় আকারে ফায়দা তুলতে চেয়েছিল। চন্দ্রযান-২ হারিয়ে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয়দের দুঃখভারাক্রান্ত মন্তব্যগুলো বলে দিচ্ছিল, বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে অতিজাতীয়তাবাদী আবেগের মিশেল ঘটালে কী ধরনের জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়। অথচ বাস্তবতা হলো, চাঁদে অভিযানে এখন পর্যন্ত সফলতার চেয়ে ব্যর্থতাই বেশি। দুনিয়াব্যাপী, ১৯৫৮ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০৯টি মহাশূন্যযান ছোড়া হয়েছে চাঁদের উদ্দেশে। ৬১টিই ব্যর্থ হয়েছে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে। দেশে দেশে জনগণ আসলেই এসব ব্যয়বহুল প্রকল্প চাইছে কি না; সে বিষয়ে অনুসন্ধান প্রচারমাধ্যম বরাবরই এড়িয়ে যায়।

পরিসংখ্যান বলছে, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য বড় এক জুয়া চাঁদে অভিযান। চন্দ্রযান-২ সেই ইতিহাসেরই সর্বশেষ এক দৃষ্টান্ত। যদিও চাঁদের মাটি ছোঁয়নি এই যান তবু বলতে হচ্ছে, অভিযানটি অন্তত ‘৯৫ ভাগ’ সফল! ইসরায়েলও বেরিশিট হারিয়ে বলেছে, ‘আমাদের চেষ্টা থামবে না’। দেশটির জনসমাজে আবারও এ ধরনের অভিযানের তেমন চাহিদা না থাকলেও তেলআবিবে রাজনীতিবিদেরা আরেক দফা চন্দ্রাভিযানে বেশ আগ্রহী।

চাঁদ উন্মাদনা: বিশাল তার রাজনৈতিক-অর্থনীতি
১৯৫৭ সালে ‘স্পুটনিক’ নামের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে রাশিয়া যে ‘মর্যাদার লড়াই’–এর সূচনা করে, তাতে মানবসভ্যতার লাভক্ষতি কতটা হলো সে নিয়ে বিতর্ক আছে। যেকোনো জুয়াতেই বেপরোয়া একটা ভঙ্গি থাকে। ‘অ্যাপোলো-১১’ প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বাজেটের প্রায় ৪.৫ শতাংশ লেগে গিয়েছিল তখন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে ক্লান্ত বাস্তববাদী নীতিনির্ধারকেরা দ্রুতই এ ধরনের বিলাসিতা কমিয়ে দেয়। এরপর থেকে কেবল পৃথিবীর কক্ষপথে কিছু কিছু যান পাঠানো হতো। ২০১৮-এর হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপোলো সিরিজে খরচ হয় প্রায় ২৬৪ বিলিয়ন ডলার। ১৯৫৯-৭২ সময়ে ফেডারেল বাজেটের প্রায় ২ ভাগ নাসার পেছনে ব্যয় হয়েছে। এখনকার বরাদ্দের চেয়ে যা প্রায় ১০ গুণ বেশি ছিল। কমিউনিস্ট রাশিয়ার বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য তখন নাসা কেনেডি ও জনসনের মতো প্রেসিডেন্টদের কাছে যা চেয়েছিল তা–ই পেয়েছে। কারণ, এটা কেবল বৈজ্ঞানিক প্রকল্প ছিল না। অথচ তখনো লাখ লাখ কালো মানুষ দেশটিতে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসুবিধা ও বাসস্থানের জন্য মিছিল-মিটিং করে যাচ্ছিল।

চাঁদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের সেই রাজনীতিকে সমালোচনা করে লেখা কবি গিল স্কট-হেরণের ‘হোয়াইট অন দ্য মুন’ গান সে সময় যুক্তরাষ্ট্রে ঝড় তুলেছিল। নাগরিক আন্দোলনের কর্মীরা তখন বলতেন, ‘চাঁদ, মঙ্গল কিংবা জুপিটার যেখানেই আমরা যাই না কেন, যত দিন পর্যন্ত কোনো দেশে শিশুরা ক্ষুধার্ত থাকছে, তত দিন কোনো জাতিই নিজেকে চূড়ান্ত সভ্য দাবি করতে পারে না।’

কিন্তু এখন নতুন করে সাদাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। নাসা হিসাব করে দেখেছে, চন্দ্রাভিযানের ধারায় ফিরতে তাদের নতুন করে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার লাগবে চলতি দশকে। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের রাজনীতির স্বার্থে মার্কিন করদাতারা হয়তো নিজেদের অজান্তেই আবারও এ অর্থের জোগান দিয়ে দেবে। কারণ, চীনের জুজু যুক্তরাষ্ট্রের প্রচারমাধ্যমে অন্যতম পণ্য হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

বেসরকারি খাতের সামনে ৭৮ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল ব্যবসা
চীন গত জানুয়ারিতে ‘চেঞ্জ-৪’ মনুষ্যবিহীন যান পাঠিয়ে দুটি নতুন বার্তা দেয়। প্রথমত বিশ্বে মুরব্বিপনা করতে হলে চাঁদে আসা-যাওয়ার আবশ্যকতা আছে এখনো। দ্বিতীয়ত মানুষ না পাঠিয়েও তুলনামূলক কম খরচে চাঁদে অভিযান চালানো যায়। উভয় বার্তাই লুফে নিয়েছে ভারত। কারণ, নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হওয়া ছাড়াও এশিয়াজুড়ে চীনকে মোকাবিলার প্রযুক্তিগত সামর্থ্য দেখানোর ব্যাপার রয়েছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের। প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি রুপির চন্দ্রযান-২ সেই প্রতিযোগিতারই অংশ ছিল। অস্বাভাবিক নয় যে চন্দ্রযান নিখোঁজ হওয়ার পর মোদি সরকার তাৎক্ষণিকভাবেই জানিয়েছে, চাঁদ ছোঁয়ার স্বপ্ন থেকে থামবে না তারা। ২০২০ সালে আবার চেষ্টা হবে। আগামী বছর চীনেরও ‘চেঞ্জ-৫’ নামের আরেকটি যান যাবে চাঁদে। খরচ যাই হোক, চাঁদে মানুষ পাঠানোর ইচ্ছাও আছে ভারতের। ৮ সেপ্টেম্বরের ইকোনমিক টাইমস জানাচ্ছে, ওই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ১০ হাজার কোটি রুপি বরাদ্দ হয়ে গেছে।

চীন ও ভারতের এই প্রতিযোগিতামূলক ঘোষণাগুলো গত শতাব্দীর সত্তর দশকের পরিস্থিতি মনে করিয়ে দিচ্ছে বিশ্বকে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া এভাবেই চাঁদে যেতে মরিয়া ছিল তখন। একই আবেগে মেতেছে এখন চীন, ভারত, ইসরায়েল। জাপানও বহু দিন থেকে এ বিষয়ে অতৃপ্তি নিয়ে লেগে আছে। এটা একধরনের রাজনৈতিক উন্মাদনাও বটে। যা শাসকদের রাজনৈতিক সুবিধা এনে দেয়। আর নাগরিকদের এনে দেয় জাতিগত ‘গর্ব’। তবে এ রকম গর্বের প্রকৃত ব্যয়ভার সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সামান্যই প্রচারিত হয়। ভারতের ‘চন্দ্রযান-১’ থেকে অর্জিত তথ্য ছিল ‘চাঁদে পানির অণু রয়েছে’। সেই অভিযানে খরচ ৩৮৬ কোটি রুপি। দেশটির দুটি চন্দ্রাভিযানে মোট ব্যয় হলো, প্রায় ১ হাজার ৪০০ রুপি। যদিও দেশটিতে ২৫ কোটির বেশি মানুষ এখনো দরিদ্রসীমার নিচে রয়ে গেছে এবং তা জনসংখ্যার প্রায় ২২ ভাগ।

এ রকম বিরূপ দৃশ্য ও নাগরিক সমালোচনা এড়াতে বিকল্প ধারণাও তৈরি ইতিমধ্যে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইসরায়েল সবাই এখন মহাশূন্যশিল্পে বেসরকারি খাতের অধিক অংশ গ্রহণ চাইছে। বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এ ক্ষেত্রে আগ্রহের কমতি নেই। স্যাটেলাইন প্রযুক্তিকেন্দ্রিক শিল্প ইতিমধ্যে বিশ্বজুড়ে বড় ব্যবসাক্ষেত্র। ব্যবসায়ীরা একে ‘স্পেস ট্যুরিজম’ পর্যন্ত নিতে চান। চাঁদে বাণিজ্যিক মিশন শুরু করা গেলে খাতটিতে করপোরেট কর্তৃত্ব পূর্ণাঙ্গতা পায়। তবে এর জন্য চীন-ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতির তুমুল সমর্থন দরকার। আঙ্কেল শি এবং নরেন্দ্র মোদির তাতে কার্পণ্য নেই। গত সপ্তাহের ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাক্ষী দিচ্ছে, চাঁদ নিয়ে উন্মাদনার মধ্যদিয়েই বিশ্বজুড়ে বিশাল এক অর্থনৈতিক খাতের জন্ম হতে চলেছে। ইতিমধ্যে যার নাম দেওয়া হয়ে গেছে ‘লুনার ইকোনমি’। গত শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার নেতারা ধারণাও করতে পারেননি, এই খাতে চীন-ভারতের অভিষেক কত বড় বাজারের জন্ম দেবে। ন্যাটোর ২০১৭ সালের হিসাবে এই বাজারের সম্ভাবনা প্রায় ৭৮ ট্রিলিয়ন ডলার!

আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস ও জাতিবিষয়ক গবেষক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন