বিজ্ঞাপন

নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতার দায় চীনপন্থী সরকারের গায়ে

চীনের জন্য মিয়ানমারের মতোই ট্র্যাজেডি ঘটেছে নেপালে, তবে অন্যরূপে। সেখানে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিএন সরকারের মহা সমর্থক ছিল গণচীন। তাদের রাষ্ট্রদূত হু ইয়াংকি রাত-দিন স্থানীয় রাজনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠক করতেন। প্রেসিডেন্ট থেকে সেনাপ্রধানের অফিস—সর্বত্র হামেশা উপস্থিত হতেন তিনি। স্থানীয় মন্ত্রীদের মতোই সংবাদমাধ্যমে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। এ রকম মদদ পেয়ে কে পি শর্মা ওলির সরকার দুটি দুর্যোগ ডেকে আনে।

প্রথমত, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বিবাদ এবং শাসক দলে বিভক্তি। এ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী শর্মার বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিদিন কাঠমান্ডুতে তাঁরই দলের একাংশ মিছিল-মিটিং করছে। চীন থেকে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একাধিক টিম এসেও শাসক দলের কোন্দল মেটাতে পারেনি। সরকারের মেয়াদ ফুরানোর আগেই নতুন নির্বাচনের ডাক দিয়েছেন শর্মা। প্রধান দলে আচমকা ভাঙনে সংকটে পড়েছে প্রতিটি প্রাদেশিক সরকারও। ২০ ডিসেম্বর থেকে চলমান এই রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য জনগণ সিপিএন নেতাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রদূত হু ইয়াংকি এবং চীনের আগ্রাসী নেপালনীতিকে দায়ী করছে। ভারতের প্রচারমাধ্যম তাদের দেশের সঙ্গে নেপালের সম্পর্ক খারাপে ইন্ধন জোগানোর জন্য সরাসরি হু ইয়াংকিকে দুষেছে।

নেপাল অতীতে ভারতের দিক থেকে অন্তত দুবার অবরোধসহ নানান অযৌক্তিক মুরুব্বিপনার শিকার হয়েছে। তারপরও দেশটির সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি থেকে সরে গেলে তার জন্য ঝুঁকি আছে। উভয়ের মধ্যে প্রায় ১১০০ মাইলের উন্মুক্ত এক সীমান্ত আছে। ভারতের ওপর এখনো নেপালের বিস্তর বাণিজ্যিক ও ভূকৌশলগত নির্ভরতা। কিন্তু কে পি শর্মা ওলির আমলে উভয় দেশের সম্পর্ক অস্বাভাবিক শীতল হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে হু ইয়াংকিও এ মুহূর্তে নিশ্চুপ। কাঠমান্ডুতে তাঁর আড়াই বছরের কার্যকালকে চীনের জন্য বিপর্যয়কর হিসেবেই চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর মধ্যেই দেশটিতে অনেক অর্থকড়ি বিনিয়োগ করে ফেলেছে চীন । সামনে নির্বাচন হলে আরেকটি চীনপন্থী সরকার গড়া খুবই কঠিন হবে। বহুল আলোচিত তিব্বত-নেপাল রেলপথ তৈরিও তখন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। উল্টো বরং ভারতের সঙ্গেই কাঠমান্ডুর রেলপথ তৈরি হয়ে যেতে পারে।

মালদ্বীপে চীনের হাত থেকে কর্তৃত্ব স্থানান্তর

নেপালের আজকের ঘটনাবলি যেন কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া মালদ্বীপ নিয়ে চীন-ভারত টানাহেঁচড়ারই আরেক রূপ। ২০১৩ থেকে নিজেদের পছন্দের আবদুল্লাহ ইয়ামিন সরকারকে অন্ধভাবে মদদ দিয়ে সাধারণ ভোটারদের বিরক্ত করে তুলেছিল চীন। অথচ ২০১১-র আগে দেশটিতে চীনের দূতাবাসও ছিল না। আগ্রাসী কূটনীতি আর মিলিয়ন-মিলিয়ন ঋণের পরিণতি কী হলো? ভারতের প্রতি সহানুভূতিশীল ইব্রাহিম সলিহ সরকারের প্রতিষ্ঠা।

চীনের অর্থনৈতিক মদদে আবদুল্লাহ ইয়ামিন সরকারবিরোধী রাজনীতিবিদদের ব্যাপক দমনাভিযানে নেমে দেশটিকে অশান্ত করে তোলেন। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় কিছু ভারতবিরোধী পদক্ষেপ নেয় ওই সরকার। ২০১৮ সালে ভারতের উপহার দেওয়া একটা হেলিকপ্টার ফেরত পাঠায় তারা, নয়াদিল্লির জন্য যা ছিল বিব্রতকর। এখন সেখানে এসেছে এমন এক সরকার, ভারতের সঙ্গে যারা একের পর এক চুক্তি করছে। এমনকি কিছু প্রকল্প চীনের অতীত ঋণের অঙ্কও ছাড়িয়ে গেছে।

পাশাপাশি চীনের ঋণকে মরণফাঁদ হিসেবে উল্লেখ করছেন ক্ষমতাসীন দলের মুখ্য নেতা নাশিদ। চীনের সঙ্গে চুক্তিতে দুর্নীতি করায় পুরোনো প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মালের প্রায় কোনো দৃশ্যই আর বেইজিংয়ের জন্য সুখকর নয়।

শ্রীলঙ্কায় কর্তৃত্ববাদীদের পাশে চীন

দক্ষিণ এশিয়ায় আপাতত চীনের কূটনীতির একমাত্র সাফল্যগাথা শ্রীলঙ্কা। এখনো এখানে চীনের প্রভাবে আঁচড় পড়েনি। তবে তাদের ঋণ-সুনামি এ দেশেও বড় এক উদ্বেগের নাম।

৪-৫ বছরের বিরতির পর রাজাপক্ষে পরিবারের ক্ষমতায় ফিরে আসা চীনের জন্য স্বস্তির হয়েছে। এটাকে তাদের ‘সফলতা’ হিসেবেও দেখা যায়। সিংহলি জাতীয়তাবাদী এই পরিবারের বড় ভাই এখন প্রধানমন্ত্রী আর ছোট ভাই প্রেসিডেন্ট। ২৬ বছর স্থায়ী তামিলবিরোধী যুদ্ধে উভয় ভাইয়ের বিরুদ্ধেই বেসামরিক জনগণকে হত্যার অভিযোগ ছিল। এই দুই ভাইয়ের একজন তখন ছিল প্রধানমন্ত্রী, অপরজন প্রতিরক্ষা সচিব।

দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চীনবিরোধী মেঠো জনমত তিব্বত, জিনজিয়াং, হংকং ও তাইওয়ানে চীনবিরোধী মহলকে নৈতিক শক্তি জোগাতে পারে। এশিয়ার এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি চীনের বিদেশনীতির গুরুতর পুনর্বিবেচনা দাবি করছে।

এই পরিবারের বিশেষ সুহৃদ চীন। যুদ্ধকালে তামিল টাইগারদের নিশ্চিহ্ন করতে স্থানীয় সশস্ত্র বাহিনীও চীনের মদদ পায়। ২০২০ থেকে নতুন করে পুরোনো রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সমর্থন ফিরে পেয়ে রাজাপক্ষেরা একই সঙ্গে হিন্দু তামিল ও মুসলমান তামিল—উভয় সংখ্যালঘুদের সামাজিকভাবে কোণঠাসা করে চলেছেন বলে মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ। জাতীয়তাবাদী উগ্রতায় সিংহলি সমাজের ভিন্নমতাবলম্বীরাও স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার হারাচ্ছে। ফলে দেশটিতে এখন মানবাধিকারের প্রচণ্ড খরা চলছে।

জনপ্রিয় সরকারগুলো বৈদেশিক সমর্থনে দিশা হারাচ্ছে

শ্রীলঙ্কার চলতি চীনবান্ধব সরকারের সঙ্গে নেপালের আজকের সরকার এবং মালদ্বীপ ও মিয়ানমারের বিদায়ী সরকারের বেশ মিল। রাজাপক্ষেরা সর্বশেষ নির্বাচনে বিপুল ভোট পেয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। ২২৫ আসনের মধ্যে ১৪৫ আসন পেয়েছে তাঁদের দল। নেপালে ২৭৫ আসনের পার্লামেন্টে চীনের মদদপুষ্ট সিপিএনের আসন ১৭৪।

মালদ্বীপে এককালের জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদকে হারিয়ে মোহাম্মদ ইয়ামিন সুষ্ঠু নির্বাচনেই বিজয়ী হন। মিয়ানমারে সুচির সরকার গত নির্বাচনের চেয়েও এবার বেশি আসন পেয়েছিল। দেশে-দেশে এসব সরকার ও রাজনীতিবিদদের ব্যাপক জনসমর্থন থাকার পরও নানানভাবে যে হোঁচট খায় এবং খাচ্ছে, তাতে বিদেশি সমর্থক হিসেবে চীনের বিশেষ দায় আছে বলা হচ্ছে। চীন থেকে প্রয়োজনীয় এবং অপ্রয়োজনীয় উভয় ধরনের বিপুল অর্থনৈতিক সহযোগিতা পেয়েছে এসব সরকার। সঙ্গে বেশি করে পেয়েছে—স্থানীয় মানবাধিকার পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি অসহিষ্ণুতার উৎসাহ।

ফলে এ মুহূর্তে চীনের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক করিডরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিপন্ন হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে। বেলুচিস্তানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরে ইতিমধ্যে স্থানীয় বালুচদের ক্ষোভের আগুনের আঁচ লাগছে।

রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ

পাকিস্তান, নেপাল, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, মালদ্বীপসহ এ অঞ্চলের প্রায় সব দেশেই চীন প্রধান এক বিনিয়োগকারী। প্রতিটি দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে তাদের রয়েছে অসামান্য অংশগ্রহণ। কিন্তু এসব দেশে গণতান্ত্রিক সংগ্রামে চীনের সহানুভূতি দেখা যায় না। বরং মিয়ানমার, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা বলছে, অর্থনৈতিক স্বার্থে চীন গণতান্ত্রিক অগ্রগতি দমনেও নীরব থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যায়, রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীনের অবস্থানে বাংলাদেশের তরুণ সমাজও সন্তুষ্ট নয়।

সামগ্রিকভাবে এসব অভিজ্ঞতার কারণে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় তরুণ-তরুণীদের মাঝে চীনের নৈতিক নেতৃত্ব ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠছে, যার একটা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হংকংয়ের গণতান্ত্রিক সংগ্রাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ সমাজের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছিল।

মিয়ানমার থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত বিশাল এই অঞ্চলে ভারতসহ প্রায় ১৮০ কোটি ভোক্তা। কেবল উদীয়মান ক্রেতা গোষ্ঠী হিসেবেই নয়, বিশাল এই জনগোষ্ঠী চীনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার দূরবর্তী রক্ষাকবচ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে চীনবিরোধী মেঠো জনমত তিব্বত, জিনজিয়াং, হংকং ও তাইওয়ানে চীনবিরোধী মহলকে নৈতিক শক্তি জোগাতে পারে। এশিয়ার এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি চীনের বিদেশনীতির গুরুতর পুনর্বিবেচনা দাবি করছে।

আলতাফ পারভেজ গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন