default-image

যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশে এক ঝটিকা সফরে আসেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার। সফর শুরু হয় ভারতে। আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষে গত ২৭ অক্টোবর দুপক্ষের মধ্যে পাঁচটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্কিত ‘বেসিক এক্সচেঞ্জ অ্যান্ড কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা ‘বেকা’ বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই চুক্তির বলে যুক্তরাষ্ট্রের উপগ্রহ মারফত প্রাপ্ত যাবতীয় গোয়েন্দা তথ্য পেতে পারবে ভারত। সশস্ত্র সংঘাতের ক্ষেত্রে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের লক্ষ্যবস্তু নিশানা করতে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা এতে অনেকটা বৃদ্ধি পাবে। ভারতকে অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ও ড্রোন সরবরাহ নিয়েও কথা হয়েছে।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে টু প্লাস টু আলোচনায় চীনা হুমকি মোকাবিলায় দুই পক্ষ পারস্পরিক সহযোগিতার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। আলোচনার শেষে সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন নেতারা চীনের তীব্র সমালোচনা করেন। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর বলেন, আলোচনার সিংহভাগ জুড়ে ছিল ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ইস্যু। মার্কিন মন্ত্রীদ্বয় ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন মন্ত্রীরা পরদিন ২৮ অক্টোবর ভারত থেকে শ্রীলঙ্কা যান। সে দেশে তাঁদের আতিথেয়তা অবশ্য ভারতের মতো উষ্ণ ছিল না। চীনের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমতাসীন রাজাপক্ষে ভাইয়েরাও চীনের মিত্র হিসেবেই পরিচিত। কৌশলগত অবস্থানে নির্মিত হাম্বান্টোটা বন্দর দীর্ঘমেয়াদি ইজারা দেওয়া হয়েছে চীনকে। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে শ্রীলঙ্কায় চীনের অনাচারের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করেন মাইক পম্পেও। তবে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শান্তি এবং সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষায় তাঁর দেশের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এরপর মালদ্বীপ হয়ে ইন্দোনেশিয়া সফর শেষে তাঁর দেশে ফেরার কথা ছিল। শেষ মুহূর্তে তালিকায় যুক্ত হয়েছে ভিয়েতনাম, চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং আগ্রাসী মনোভাব যাদের দুশ্চিন্তায় রেখেছে।

ভারত ও অন্য দেশগুলোয় মার্কিন মন্ত্রীদ্বয়ের এই সফরের উদ্দেশ্য স্পষ্টত এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে রাশ টানা। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী বিগানের ভারত ও বাংলাদেশ সফরেরও মূল প্রতিপাদ্য ছিল তাই। বিআরআই প্রকল্প এবং বিপুল বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন ভারত মহাসাগর তীরবর্তী এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে তার প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে। ফলে কমে আসছে মার্কিন প্রভাব। আঞ্চলিক দেশগুলোর ওপর চীনের এই ক্রমবর্ধমান প্রভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন নেতৃত্বে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) প্রকল্প স্পষ্টতই চীনের প্রভাব খর্ব করার একটি প্রয়াস। চীনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সম্পর্কের কারণে ভারত এই প্রয়াসে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাভাবিক মিত্র।

পক্ষান্তরে ভারতের আশঙ্কা, বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতকে ঘেরাও করে ফেলছে চীন। পাশাপাশি লাদাখ সীমান্তে চীনের সাম্প্রতিক সামরিক শক্তি প্রদর্শন ভারতের গভীর উদ্বেগের কারণ হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই সময়ে ‘বেকা’ চুক্তি স্বাক্ষরকে এই উদ্বেগের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করতে হবে। কেননা শক্তিমান চীনের বিপরীতে ভারতের প্রয়োজন একটি শক্তিশালী মিত্র। জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ চীনবিরোধী ‘কোয়াড’কে আরেক ধাপ এগিয়ে নিচ্ছে ভারত-মার্কিন এই সামরিক সহযোগিতা চুক্তি।

১৯৭০–এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র-সোভিয়েত ইউনিয়ন ঠান্ডা লড়াই যখন তুঙ্গে, তখন দল ভারী করার জন্য মার্কিনরা হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল চীনের দিকে। অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি মার্কিন সহায়তায় পরবর্তী ৩০ বছরে অবিশ্বাস্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয় চীনের। নতুন শতাব্দীতে এ ধারা অব্যাহত রেখে বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত হয়েছে চীন। নতুন এক ঠান্ডা লড়াইয়ের প্রস্তুতি চলছে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে, যদিও এই ঠান্ডা লড়াইয়ে চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশ দুটি পরস্পরের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার যেমন প্রয়োজন চীনা ফ্যাক্টরিগুলো চালু রাখার জন্য, তেমনি চীনে তৈরি ভোগ্যপণ্য না হলে চলবে না যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের।

লাদাখ সীমান্তে উত্তেজনা চীন-ভারত সর্বাত্মক যুদ্ধে রূপ নেবে এমন আশঙ্কা খুব বেশি নয়। কারণ, দুই দেশের কোনোটিরই এমন সংঘাতে পরিপূর্ণ জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। একদিকে যেমন সামরিক শক্তিতে ভারত চীনের তুলনায় দুর্বল, অন্যদিকে চীনের মূল কেন্দ্র থেকে এ অঞ্চল দূরবর্তী বিধায় ভারতের তুলনায় সরবরাহ লাইন অনেক দীর্ঘ। ফলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখা চীনের জন্য কঠিন হবে।

ভারত মহাসাগরের বেলায়ও একই কথা খাটে। সার্বিক নৌশক্তিতে চীন এগিয়ে, কিন্তু ভারত মহাসাগর থিয়েটারে তাদের শক্তির ভারসাম্য অনুরূপ নয়। ভারতের জন্য এটা আঞ্চলিক সমুদ্র, কিন্তু মালাক্কা প্রণালি হয়ে ভারত মহাসাগরে নৌশক্তি প্রদর্শনে চীনের সীমাবদ্ধতা থাকবে। এই থিয়েটারে চীনের নৌশক্তি হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ক্যারিয়ারনির্ভর, যা চীন এখনো অর্জন করতে পারেনি। এমনকি চীন এই সক্ষমতা অর্জন করলেও সংঘাতময় পরিবেশে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে ভারতের নৌঘাঁটি এড়িয়ে এই বহরের জন্য সরবরাহ লাইন ঠিক রাখা দুরূহ হতে পারে। করাচি ও জেবুতিতে সৃষ্ট চীনা নৌ সুবিধাদি এ জন্য যথেষ্ট হবে বলে মনে হয় না।

চীনের কাছে মিয়ানমারের প্রচণ্ড গুরুত্ব এখানেই। নৌবহরের সরবরাহ লাইনই শুধু নয়, সংকটের ক্ষেত্রে চীনের বাণিজ্য ব্যবস্থারও লাইফলাইন হয়ে উঠতে পারে মিয়ানমার। রাখাইন রাজ্যে নির্মীয়মাণ গভীর সমুদ্রবন্দর চীনা আমদানি-রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে যাচ্ছে। মিয়ানমারের ভৌগোলিক অবস্থান একদিকে চীনকে তার ওপর নির্ভরশীল করে তুলছে, অন্যদিকে ভারত, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষিতেও মিয়ানমারকে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে আসছে।

বিজ্ঞাপন

ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষমতা আর প্রভাব বিস্তারের লড়াই ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। স্বাভাবিক কারণেই এই সমীকরণে যুক্তরাষ্ট্রের পাশে থাকবে ভারত। তবে উদীয়মান শক্তি হিসেবে ভারত এটাও চাইবে যে ভারত মহাসাগরে মূল খেলোয়াড় হবে সেই, যুক্তরাষ্ট্র হবে মিত্রশক্তি। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এরূপ সম্পূরক সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য, এমনকি আকর্ষণীয়ও মনে হতে পারে।

ক্রমেই দৃশ্যমান হতে থাকা এই সমীকরণে বাংলাদেশের অবস্থানটা তাহলে কী দাঁড়াবে? সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব? অবশ্যই চাই। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংকটে কথিত বন্ধুরা যদি পাশে না দাঁড়ায়? বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য বিকল্প সম্ভাবনার ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান খুব সুসংহত নয়। চীনের জন্য মিয়ানমার যত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, বাংলাদেশের গুরুত্ব কমবে সেই পরিমাণ। মিয়ানমারকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ নেবে ভারত, এমন লক্ষণও নেই। পরস্পরবিরোধী এই উভয় দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক এবং স্বার্থ বিদ্যমান, যা উপেক্ষা করার সাধ্য নেই বাংলাদেশের। বৃহত্তর স্নায়ুযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ভূরাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের মতো প্রান্তিক দেশের স্বার্থ বিবেচনায় আসবে কদাচিৎ। ফলে নতুন এই চীন-মার্কিন শীতল যুদ্ধের অনাকাঙ্ক্ষিত বলি হতে পারে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে আটকে পড়া ১১ লাখ রোহিঙ্গা, সেই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থ।

মো. তৌহিদ হোসেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব

মন্তব্য পড়ুন 0