যুক্তরাষ্ট্র করোনার তাণ্ডব কমাতে ফেডারেল সরকারের সব ক্ষমতা ব্যবহার করেও ব্যর্থ হচ্ছে। এ রকম সময় করোনার ভাইরাস ছড়ানোয় চীনের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করে মূল্যবান অনেক সময় নষ্ট করছে ট্রাম্প প্রশাসন। পণ্ডিতেরা নতুন এক শীতল যুদ্ধের কথা বলছেন। যুক্তরাষ্ট্র সত্যিকারভাবে বিশ্বের নেতার আসন নিয়ে চীনের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে চাইলেও, ট্রাম্প খুব খারাপভাবে সেটা শুরু করেছেন।

এমনকি চীনা সরকারও বিভিন্ন দেশকে মহামারি মোকাবিলার সামগ্রীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে, চিকিৎসক দল পাঠাচ্ছে। আর ট্রাম্প আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে বিনা ঘোষণায় বিমান চলাচল বন্ধ করে দিলেন! গত মার্চ থেকে চীনা সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে দিয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে ট্রাম্প বন্ধ করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের অনুদান।

যখন জি-৭ দেশের মন্ত্রীরা ভিডিও কনফারেন্সে কোভিড-১৯ মোকাবিলায় যৌথ কর্মকৌশল নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মাইক পম্পেওর অবদান এতটুকুই: তিনি সেখানে ভাইরাসের নাম উহান ভাইরাস রাখার জন্য চাপাচাপি করে গেছেন। ট্রাম্পের মন্ত্রীর কথাবার্তায় হতাশ হয়ে অন্যান্য দেশের মন্ত্রীরা কোনো সমাধান ছাড়াই সেই কনফারেন্সের ইতি টানেন।

চীনের সহায়তা নিঃশর্ত ছিল না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তারপর করোনাভাইরাস মোকাবিলায় তাইওয়ানের সাফল্যের স্বীকৃতি জানাতে অস্বীকার করে। তাতে যদি চীন আহত হয়? আর যখন মার্কিন সরকার চীন নিয়ে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ফেঁদেই যাচ্ছে, তখন চীনের আপত্তির মুখে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীন বিষয়ে তাদের সুর কিছুটা নরম করে।

চীনের এই ভয় দেখানো কার্যকর হওয়া দেশটির অর্থনৈতিক পরাক্রমের লক্ষণ। ধরে নেওয়া যায়, এই কৌশল কম কাজ করবে যদি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো জোট বাঁধে। অতীতে এ ধরনের যুক্তফ্রন্টের নেতৃত্ব দিত যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু আত্মকেন্দ্রিক বর্তমান সরকারের কারণে সেটা হওয়ার নয়। সুতরাং দীর্ঘ মেয়াদে চীনই চলে আসবে নেতৃত্বের আসনে।

কার্যত চীন বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর কোনো অভিন্ন নীতি নেই। বিগত আঠারো শতকের শেষ থেকে এর কারণ অপরিবর্তিত আছে। সে সময় ব্রিটেনের রাজা তৃতীয় জর্জ লর্ড ম্যাকার্টনিকে চীনা সাম্রাজ্যের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের জন্য পাঠিয়েছিলেন। এই ব্যর্থ মিশনের অন্যতম একটা পরিহাস হলো সে সময় ব্রিটেন চীনের সঙ্গে আফিম ছাড়া অন্য পণ্যের ব্যবসায় বেশ আগ্রহী ছিল। কিন্তু সে সময়ের কিয়ানলং সম্রাটের বক্তব্য ছিল, ব্রিটেনের কোনো কিছুর প্রয়োজন চীনের নেই।

মূল বিষয় এই, চীন নিজেকে সভ্য দুনিয়ার কেন্দ্র মনে করে। বিদেশের কাছে চীন সমকক্ষতা চায় না। এমনকি এখনো ব্রিটেনের শক্তি নিঃশেষিত হয়নি। ম্যাকার্টনির সময়কার পরাশক্তির দ্বন্দ্ব এখনো আবেদন হারায়নি। প্রায় এক শতাব্দীজুড়ে আমেরিকার যে শ্রেষ্ঠত্বের মনোভাব, তার সঙ্গে চীনের কিং সম্রাটদের মনোভাবের মিল আছে।

চীন যখন গরিব অবস্থায় বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর দয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিল, তখন আমেরিকানদের তরফে চীনকে গণতন্ত্রের সম্ভাব্য দীক্ষিত হিসেবে আনুকূল্য দেখানো সহজ ছিল। বরং সে সময় জাপানি সাম্রাজ্যকে মোকাবিলা করাই ছিল কঠিন।

চেয়ারম্যান মাওয়ের সময়ে চীনের সঙ্গে ব্যবসা করে টাকা বানানো ছিল অত্যন্ত কঠিন। এমনকি সে সময়ও পাশ্চাত্যের দেশগুলো চীনের বিষয়ে কোনো ঐকমত্যে আসতে পারেনি। ১৯৫০ সালে যখন ব্রিটেন চীনকে স্বীকৃতি দেয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র নব উদ্যমে বৈশ্বিক সাম্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রস্তুত। এই স্বীকৃতি যুক্তরাষ্ট্রকে ক্রুদ্ধ করে। সত্তরের দশক অবধি যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানকেন্দ্রিক চিয়াং কাই শেকের সরকারকেই চীনের একমাত্র বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আসে।

এখন চীনে ব্যবসা করা বিরাট লাভজনক। আমরা আবার ফিরে গেছি ম্যাকার্টনির সময়ে। তারপরও চীনের বিশ্বনেতৃত্বের দাবি স্বাগত জানানোর মতো নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বিকল্প হিসেবে ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। আমেরিকান শতাব্দী অজস্র নির্বোধ যুদ্ধ, মতাদর্শিক সংকীর্ণতা এবং বিবেকবর্জিতভাবে অনেক স্বৈরশাসকের প্রতি মদদে ভরা। তারপরও যুক্তরাষ্ট্রকে এখনো এমন এক সরকারব্যবস্থার প্রতিভূ ভাবা হয়, যেখানে স্বাধীনতার জন্য মানবিক আকাঙ্ক্ষার স্বীকৃতি আছে। এমনকি চীনা-ভাষিক জগতেও এই আবেদন রয়ে গেছে।

একই ধারণা চীনের জন্য প্রযোজ্য নয়। চীন যদি দুনিয়ার নেতা হতে চায়, তবে তাদের টাকা ও ভীতি ছাড়া আরও ভালো কিছুর প্রস্তাব আনতে হবে। স্বাধীনতা এখনো গুরুত্ববহ। কেন ১৯৮৯ সালে, তিয়েন আনমেন চত্বরে বিক্ষুব্ধ চীনা ছাত্ররা প্রায় ৩০ ফুট লম্বা গণতন্ত্রের প্রতিমা খাড়া করেছিল? যে কারণে তারা সেটা করেছিল, নিজ দেশে সেই গণতন্ত্রের মহিমা ছাড়া চীন বিশ্বে সেই কার্যক্রম প্রসারিত করতে পারবে না।

ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

আয়ান বুরুমা ডাচ বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রনিবাসী লেখক ও সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন