default-image

এই সময়ে বিশ্বে তিন শ্রেণির শাসক ও কূটনীতিক আছেন। একটি শ্রেণি টুইটারে আসক্ত (যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্প, নরেন্দ্র মোদি, জাভেদ যারিফ প্রমুখ), আরেকটি শ্রেণি এসবের মধ্যে মোটেও নেই (ভ্লাদিমির পুতিন, আঙ্গেলা ম্যার্কেল, সি চিন পিং প্রমুখ) এবং সর্বশেষ শ্রেণি কালেভদ্রে মাইক্রো-ব্লগিং অ্যাপ ব্যবহার করেন। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী মাহিন্দা রাজাপক্ষে এই সর্বশেষ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।

রাজাপক্ষে খুবই ব্যতিক্রমভাবে গত সপ্তাহের একটি দিন টুইটারে সরব ছিলেন। এই দিন তিনি প্রথমে টুইট বার্তায় জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রীকে ‘উষ্ণ অভিনন্দন’ জানালেন। এরপর তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে তাঁর ৭০তম জন্মদিনে সুস্বাস্থ্য ও সাফল্য কামনা করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

এই দুটি টুইট বার্তা চমকানোর মতো কিছু নেই। কিন্তু মোদিকে টুইটারে শুভেচ্ছা বার্তা দেওয়ার চার ঘণ্টার মাথায় রাজাপক্ষে যে টুইটটি করেছেন, সেটি এককথায় শ্বাসরুদ্ধকর। তিনি টুইট বার্তায় বলেন, ‘চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এবং আমি ছয় বছর আগে যে কলম্বো পোর্ট সিটির কাজ শুরু করেছিলাম, তার অগ্রগতি দেখতে আমিসহ চীনের রাষ্ট্রদূত ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেখানে গিয়েছিলাম। সেখানে এক রাউন্ড গলফও খেলে এসেছি।’

তার মানে মোদির ৭০তম জন্মদিনে চীনের বানানো টার্ফে গিয়ে রাজাপক্ষে গলফ খেলেছেন? শ্রীলঙ্কার ভূরাজনীতির নিরিখে বিশ্লেষণ করলে এটিকে তিনটি বড় ঘটনার সংকেতবাহী একটি পরিণাম বলে মনে হবে।

বিজ্ঞাপন

প্রথম ঘটনা হলো, গত ২৬ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ২৪টি কোম্পানির বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করে। এর মধ্যে একটি হলো চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি)। এই কোম্পানিকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক আগেই কালোতালিকাভুক্ত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, এই কোম্পানির মাধ্যমে চীন তার বিস্তারবাদী কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই কোম্পানি কলম্বো পোর্ট সিটির নির্মাণকাজ করছে, যে পোর্ট সিটি ভবিষ্যতে বড় হুমকি হয়ে দেখা দেবে বলে ভারত বলে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্র চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর এমন সময় অবরোধ আরোপ করল, যখন চীন শ্রীলঙ্কায় হাম্বানটোটা বন্দর ও মাতাল্লা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাজ শেষ করেছে এবং কলম্বো পোর্ট সিটির জন্য শ্রীলঙ্কা বিদেশি বিনিয়োগ খুঁজছে।

চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর অবরোধ আরোপ করার মাত্র চার দিনের মাথায় ৩০ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এস্পার শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপক্ষেকে টেলিফোন করেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয় ‘টেলিফোনে তাঁদের দুজনের মধ্যে ভারতীয়-প্রশান্ত মহাসাগরকে সবার চলাচলের জন্য নিরাপদ রাখতে দুই দেশের বিদ্যমান অঙ্গীকার নিয়ে আলাপ হয়।’ তবে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, এস্পার টেলিফোনে গোতাবায়া রাজাপক্ষেকে মানবাধিকার নিশ্চিত করার নামে রীতিমতো হুমকি দিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

এই হুমকির খবর সত্য–মিথ্যা যা–ই হোক, শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে সে দেশের কোনো প্রেসিডেন্টকে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর টেলিফোন করার ঘটনা এই প্রথম। আরও লক্ষণীয় হলো, চীনকে মোকাবিলা করার জন্য গুয়াম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের যে সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেই ঘাঁটি পরিদর্শন করার সময় এস্পার এই ফোন করেছিলেন। কলম্বো এই ফোনের আসল উদ্দেশ্য চেপে গেছে। তবে গুঞ্জন আছে, কলম্বো বন্দরের পূর্ব দিকের টার্মিনাল ভারতের হাতে ছেড়ে দিতে এবং এই অঞ্চলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হতে শ্রীলঙ্কাকে চাপ দিতেও এস্পার ফোনটি করেছিলেন।

শ্রীলঙ্কার জাতীয়তাবাদীরা কলম্বো পোর্টের টার্মিনাল ভারতের হাতে ছেড়ে দেওয়ার ঘোর বিরোধিতা করছেন। এ ক্ষেত্রে চীনেরও বিরোধিতা আছে। ফলে একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের চাপ, অন্যদিকে চীনের চাপ। মাঝখানে ভারসাম্য বজায় রেখে রাজাপক্ষেকে সমঝে চলতে হচ্ছে। শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়নাথ কলম্বাজ সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, শ্রীলঙ্কা ক্ষমতার টানাটানির শিকার হতে চায় না। শ্রীলঙ্কাকে ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হচ্ছে।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

এম কে ভদ্রকুমার: ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য পড়ুন 0