default-image

শিশুর জন্য সবচেয়ে আনন্দের দিন তার জন্মদিন। আনন্দেই ছিল সে। কেননা মা এসেছেন তাকে দেখতে। মা–জননী সেদিন ঘরে থাকতে পারেননি। অনেক দূরের পথ উজিয়ে সন্তানকে একনজর দেখতে এবং দেখা দিতে এসেছিলেন। আনন্দের সেই লগ্নের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র আধা ঘণ্টা। তারপর মায়ের চলে যাওয়ার সময়। কারাগারেও স্বজনেরা দেখতে এলে এর চেয়ে বেশি সময় পান। মাসুম শিশুর কান্নায় খোদারও মন গলে, কিন্তু হাটহাজারীর ওই মাদ্রাসাশিক্ষকের মন সম্ভবত অন্য ধাতুতে গড়া।

মা–বাবা যখন চলে যাচ্ছে, স্থির থাকতে পারেনি আট বছরের বাচ্চাটা। সে–ও হাঁটা দেয় তাদের পিছু পিছু। ওই শিক্ষক পারতেন বাচ্চাটিকে বুঝিয়ে, আদর করে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণ তিনি পাননি। মাদ্রাসায় পড়তে পড়তে, মার খেতে খেতে তাঁর হৃদয় থেকেও হয়তো সব কোমলতা উবে গিয়েছিল। তিনি শিশুটিকে ধরে এনে নৃশংসভাবে পেটান। এই বর্বরতার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই তীব্র মানসিক দহনে ভুগছেন। এই দরিদ্র, কখনো–বা এতিম শিশুদের এ কোথায় রেখেছি আমরা? এটা কি শিক্ষালয় নাকি পুলিশের রিমান্ডকক্ষ?

সবখানে নয়, তবে অনেক মাদ্রাসায় শিশুদের নির্মমভাবে পেটানো হয়। এতে কেউ কেউ মারাও যায়। রাষ্ট্রীয় হেফাজতেও কাউকে কাউকে নির্যাতন করা হয়, তাঁদের কেউ কেউ মর্মান্তিকভাবে মারাও যান। যেমন, অভিযোগ রয়েছে সম্প্রতি আলোচিত লেখক মুশতাকের মৃত্যুর বিষয়ে।

শুধু কি মাদ্রাসা? বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্রাবাসে সন্ত্রাসীদের অত্যাচারের কথা সুবিদিত। বাসাবাড়িতে খেটে খাওয়া কিশোর-কিশোরীদেরও বর্বরভাবে নির্যাতিত হওয়া কিংবা হত্যার শিকার হওয়াও বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ঢাকায় এক নারী বাসযাত্রী ভাড়া দিতে না পারায় বাস কন্ডাক্টর তাঁকে ছুরিকাঘাত করে বাস থেকে ফেলে দেন। খুবই গা–সওয়া হয়ে গেছে এসব ঘটনা। নির্যাতন করা কি তাহলে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠল?

বিজ্ঞাপন

মাদ্রাসা থেকে বিদ্যালয়, কারাগার থেকে কারখানা, কিংবা প্রকাশ্য সদরে নির্যাতন খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। লেখক কিংবা ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী কিংবা সাংবাদিক—কে নির্যাতিত হচ্ছে না? কেননা এসব মেনে নেওয়া হয়, কেননা এসবের বিচার ঠিকঠাকমতো হয় না। কেননা আইন কার কথা শুনবে আর কার কথা শুনবে না, তা আইনের বয়ান দিয়ে ঠিক হয় না, ঠিক হয় আইন ব্যবহারকারীর ক্ষমতা দিয়ে।

মাদ্রাসাছাত্রটির বেলায় অভিযুক্ত শিক্ষকের নির্যাতনের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল অপরাধের বিচার কিন্তু ভাইরাল হয় না, যা কিছু হয়, তা ওই আলোচিত ঘটনার সীমাতেই আটকে যায়। এই ঘটনায় নামকাওয়াস্তে যা হয়েছে তা হলো মাদ্রাসা থেকে ওই শিক্ষককে বহিষ্কার। শিশুটির মা–বাবা সন্তানের নিপীড়কের বিরুদ্ধে মামলা করতে ভয় পেয়েছেন। মামলা চালানোর উপায় তাঁদের নেই। তা ছাড়া শিশুটিকে তো এরপরও ওই মাদ্রাসাতেই পড়তে হবে।

এভাবে কত অজস্র শিশুর কান্না দেয়ালের বাইরে আসে না বলে প্রশাসন শুনতে পায় না। সমাজের বিবেক নামক জগদ্দল পাথরটির নড়েচড়ে বসার অবকাশও আর মেলে না। কেননা এসবই এখন ‘নতুন স্বাভাবিক’।

আরও হতাশার ব্যাপার হলো, আমাদের সমাজের প্রবীণ থেকে নবীন অনেকের বিশ্বাস: মাইরের ওপর ওষুধ নাই। কী ভয়াবহ! খোলাখুলি বলপ্রয়োগের, নিষ্ঠুরতার নীতির ওপর আস্থা জানানো হচ্ছে।

যাঁরা ছোটবেলায় মারের নুন খেয়ে বড় হয়ে মাইরের গুণ গাইছেন, তাঁরা নিজেরাই ‘মাইরের’ সমস্যার প্রামাণিক নমুনা। নিপীড়ন সওয়ার অভ্যাস নিপীড়িতকেও নিপীড়নের সমর্থক বানাতে পারে। বানায় ধর্ষকামী নির্যাতক, নয়তো সহ্যকারী মর্ষকামী। নিপীড়নে কেবল কেউ কষ্টই পায় না, তার ভেতরকার মানবসত্তাটা দুমড়ে–মুচড়ে গিয়ে তাকেও নিপীড়ক কিংবা দাসভাবাপন্ন করে তুলতে পারে। বিচারহীনতার জঙ্গলে তখন অনেকেই বিচারক হয়ে বসেন। তখনই আপন মনের হিংসা মেশানো শাস্তি দিতে তাদের বুক কাঁপে না।

এমন অবস্থায় সমাজ বলে কিছু থাকে কি? জনতার রক্ষক রাষ্ট্র বলে কিছুও আর থাকে কি? পুরোটাই হয়ে পড়ে ভয়ের জঙ্গল। তাই কেবল রাষ্ট্রীয় নিপীড়নকে দুষলে চলবে না। সমাজের মধ্যে, ব্যক্তির মধ্যে, স্বাভাবিকতার ধারণার মধ্যেই যে বলপ্রয়োগের সংস্কৃতি চালিয়ে গেছে, তাকে পুঁজি করেই সবল দুর্বলের ওপর অত্যাচার চালিয়ে যায়।
বিগত দশকে ভরসা ক্রমে গায়েব হয়ে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক ভয়ের জঙ্গল। ভয় কাউকে দানব আর কাউকে টিকটিকি বানিয়ে ফেলে। যখন জনগণ দুরবস্থা বদালাতে পারে না, তখন শাসকেরাই জনগণকে আপন আদলে বদলে দেয়। নিপীড়িত জনগণই তখন দুঃশাসকের খাসলত রপ্ত করে নেয়। নির্যাতন তখন কারও অভ্যাসে পরিণত হয়, কারও অভ্যাস হয়ে যায় তা সয়ে যাওয়া।

এমন অবস্থায়ই ‘মাইরের ওপর ওষুধ নাই’ নীতির ল্যাবরেটরি হয়ে ওঠে দেশ। মারামারি ছাড়া ঘরে বা রাস্তায় বা রাষ্ট্রের কোনো সমস্যারই সমাধান আমরা করতে জানিনি। ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে আমাদের এই একটাই ওষুধ: মারো, মেরে শিখাও বা বাধ্য করো, রিমান্ডে নাও, ফাঁসি দাও, জেলে ভরো, টিসি দাও, শরীরে–মনে কষ্ট দিয়ে ‘সোজা’ করো।

রাজনৈতিক দলের লোকেরা প্রকাশ্যে মিডিয়ার সামনে মানুষ পিটিয়ে মেরে উল্লাস করেছিল। থানাহাজতে নিয়মিতভাবে মানুষ হত্যা হয়। মেজর সিনহাকে হত্যা করে তাঁর গায়ের ওপর পা তুলে দেওয়া হয়েছিল।

এই বাস্তব কোনো গ্রন্থ, কোনো সংবিধান বানায়নি। এই বাস্তব তৈরি হয়েছে যুগের পর যুগের অন্যায়ের শাসনে। এই বাস্তবতার রাজনীতি, তাতে কার কী ভূমিকা, সেটার বুঝ ছাড়া সব প্রতিবাদ বৃথা যাবে, সব দোষারোপ বুমেরাং হবে।

এভাবে কত অজস্র শিশুর কান্না দেয়ালের বাইরে আসে না বলে প্রশাসন শুনতে পায় না। সমাজের বিবেক নামক জগদ্দল পাথরটির নড়েচড়ে বসার অবকাশও আর মেলে না। কেননা এসবই এখন ‘নতুন স্বাভাবিক’।
বিজ্ঞাপন

হিংসাত্মক ক্ষমতাবাদ বৈষম্যের জমিনে আবাদ করে সমাজটাকে বিষিয়ে দিয়েছে। প্রতিপক্ষকে হত্যার উল্লাস সব শিবিরেই আছে। সবাই কোনো না কোনো ঘৃণার নেশায় নিমজ্জিত। কারাগার থেকে বিদ্যালয়ে, ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রে নিপীড়নের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ তৈরি করতে না পারলে, ব্যবস্থাকে মানবিক করে তোলায় সজাগ না হলে সমাজটা সত্যিই ভয়ের জঙ্গল হয়ে উঠবে।

আমরা চাই, স্কুলে বা মাদ্রাসায় কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলেন, তাকে ভয়ের শাসনে রাখেন, তাহলে তাঁকে চাকরিচ্যুত করে ফৌজদারি মামলা দিতে হবে। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ কিংবা নির্যাতনে শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটলে শুধু সাক্ষাৎ দোষী ব্যক্তিটিকে নয়, প্রতিষ্ঠানের কর্তাদেরও জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। আর অভিভাবকেরা মামলা করুন বা না করুন, পুলিশকেই অপরাধ আমলে নিয়ে মামলা ও চার্জশিট দিতে হবে। শিশুদের সঙ্গে আচরণের যে বিধিমালা রয়েছে, তা স্কুল-কলেজ শুধু নয়, মাদ্রাসায়ও পালিত হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য জেলা শিক্ষা দপ্তরের আলাদা নজরদারি কমিটি থাকতে হবে। তাতে অভিভাবক ও শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষাবিদদেরও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

শিশুরা কেন ভয় পাবে? আমরা চাই ভয়ে কাঁপুক নির্যাতকেরা।

ফারুক ওয়াসিফ: লেখক ও সাংবাদিক।
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন