default-image

বেলারুশের বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীরা গত ১ আগস্ট ধর্মঘটের ডাক দিয়ে তাঁদের শিক্ষাবর্ষের সূচনা করেছেন। তাঁরা পরিকল্পনা করেছিলেন, ওই দিন তাঁরা মিনস্কের ভিক্টোরি স্কয়ারে জড়ো হবেন; সেখান থেকে মিছিল নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যাবেন ও গত মাসে ভোট জালিয়াতির বিরোধিতা করায় ছাত্রদের ওপর যে জুলুম করা হয়েছে, তার প্রতিবাদে মন্ত্রণালয়ে তাঁরা একটি প্রতিবাদপত্র জমা দেবেন। কিন্তু ভিক্টোরি স্কয়ারে তাঁরা জড়ো হওয়ামাত্রই সেখানে দাঙ্গা পুলিশের বাধার মুখে পড়েন।

সম্প্রতি যত সরকারবিরোধী বিক্ষোভ–সমাবেশ হয়েছে, সবখানে পুলিশ কঠোরভাবে ধরপাকড় করেছে। কিন্তু ভিক্টোরি স্কয়ারে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ওই দিন দাঙ্গা পুলিশ অপেক্ষাকৃত কম রূঢ় আচরণ করেছে। কিন্তু সেখানে ছাত্রদের বাধা দেওয়া হয়েছে—এ খবর ছড়িয়ে পড়ামাত্র রাজধানীর অন্য এলাকায় অজস্র শিক্ষার্থী নেমে আসেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্কুলপড়ুয়ারাও তাতে শামিল হয়। একপর্যায়ে অন্য আরও কয়েকটি দল মিকিবেউইকস স্কয়ারের দিকে যেতে থাকে।

বিক্ষোভকারীদের সামনে-পেছনে পোশাকধারী দাঙ্গা পুলিশ যেমন ছিল, ছদ্মবেশে সেখানে সাদাপোশাকের পুলিশও ছিল।

বিজ্ঞাপন

একপর্যায়ে কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিল ছাত্রছাত্রীদের আর জোটবদ্ধ হতে দেওয়া হবে না। এরপরই খাকি এবং সাদাপোশাকধারী পুলিশ মারমুখী হয়ে ওঠে। তবে মজার বিষয় হলো দাঙ্গা পুলিশ বা সাদাপোশাকধারী গোয়েন্দারাও চান না সংবাদমাধ্যমে তঁাদের ছবি আসুক। কারণ, এ মুহূর্তে বিরোধী দল ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বহু সরকারি কর্মচারী সরকারবিরোধীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। যে পুলিশ সদস্য মারমুখী হচ্ছেন, খবরের কাগজে যদি তাঁর ছবি ছাপা হয়, তাহলে তাঁকে সামাজিকভাবে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। এমনকি বিচারক, প্রসিকিউটর এবং অন্য কর্মকর্তারাও এ চাপে আছেন। অনেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিরোধীদের প্রতি সংবেদনশীলতা প্রকাশ করছেন।

১ আগস্ট সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ছাত্ররা আবার স্বাধীনতা চত্বরে মিলিত হওয়া শুরু করেন। এ সময় কালো পোশাকধারী নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁদের ঘিরে ধরেন এবং বিক্ষোভকারীদের স্লোগান ও ভাষণ যাতে শোনা না যায়, সে জন্য তাঁরা মাইকে দেশাত্মবোধক গান চালিয়ে দেন। রাত আটটা নাগাদ সেখানে হাজারখানেক বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে যান। এ সময় নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে শিথিলতা দেখা দেয়। তাঁরা বিক্ষোভকারীদের ব্যাগ তল্লাশি করা থেকে বিরত থাকেন। সবাই ভেবেছিলেন, পুলিশ হয়তো সবাইকে ছত্রভঙ্গ করতে চাইবে। কিন্তু পরে তা আর হয়নি।

ভোট জালিয়াতির অভিযোগে প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দর লুকাশেঙ্কোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে নিরাপত্তাকর্মীরা যেসব দমন–পীড়ন করেছে, তা লুকাশেঙ্কোর অবস্থানকে সংহত না করে বরং নড়বড়ে করে তুলেছে। স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের ওপর দাঙ্গা পুলিশ যেভাবে লাঠিপেটা করেছে, মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাঁর সন্তানকে যেভাবে পুলিশ ভ্যানে তোলা হয়েছে, সেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে জনগণ প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়েছে। সেই জনক্ষোভ ধীরে ধীরে বহু নিরাপত্তাকর্মীর মধ্যেও সম্প্রসারিত হয়েছে।

ছাত্রদের বিক্ষোভের প্রতি জনগণ সমর্থন জানিয়েছে। আমি নিজে ভিক্টোরি স্কয়ারে গিয়ে দেখেছি, সেখানে পঁচাত্তরোর্ধ্ব বহু প্রবীণ ব্যক্তিও ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

লুকাশেঙ্কো তাঁর গদি বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। গণমাধ্যমকে কড়াভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন। কিন্তু বেলারুশের শিক্ষার্থীরা সবাই একেকজন সংবাদকর্মী হয়ে উঠেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই তাঁদের মূল ধারার সংবাদমাধ্যম হয়ে উঠেছে। লুকাশেঙ্কোর প্রতিটি অন্যায়–অবিচারের গল্প তাঁরা সেখানে তুলে ধরছেন।

ইতিহাসের শিক্ষা ও আমার অভিজ্ঞতা বলে, যখন একটি দেশের ছাত্রসমাজ সরকার পতনের ডাক দেয়, তখন আর সেই সরকারকে টিকিয়ে রাখা যায় না। বেলারুশের শিক্ষার্থীরা লুকাশেঙ্কোর ভোট জালিয়াতির বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন। তাঁদের সমর্থনে আছে সর্বস্তরের মানুষ। এ অবস্থায় লুকাশেঙ্কোর বিদায় প্রায় নিশ্চিত।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
স্লাভমির সিয়েরাকোভস্কি: ওয়ারশর ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডির পরিচালক

মন্তব্য পড়ুন 0