default-image

১.

ফাঁকা মাঠে ছিরু মোল্লা দৌড়াচ্ছে। কঠিন দৌড়। নিজের জমির ধান দেখতে গিয়েছিল সে। এর মধ্যে ঝড় উঠেছে। আশপাশে আশ্রয় নেওয়ার মতো ঘরবাড়ি নেই। এক কিলোমিটার দৌড়ে মাঠ পার হলে ঘরবাড়ি। বাতাসের প্রচণ্ড ঝাপটা ছিরু মোল্লাকে উড়িয়ে নিতে চাইছে। সে বারবার পড়ে যাচ্ছে। উঠে আবার দৌড়াচ্ছে। একসময় দুর্বল হয়ে সে বসে পড়ল। সিদ্ধান্ত নিল আর দৌড়াবে না, এখানেই বসে থাকবে। ঝঞ্ঝার মধ্যে সে মনে মনে বলতে লাগল, ‘যারে ধইরে রাখার জন্যি দৌড়াইতিছি, দৌড়ের কারণে সে-ই যদি বাইর হয়ে যায়, তাইলে আর দৌড়ায়া কী লাভ?’

করোনায় পাবলিকের দশা হয়েছে ছিরু মোল্লার মতো। শপিং মলের বড় ব্যবসায়ী, কমিউনিটি সেন্টার কিংবা বড় বড় হোটেলের মালিক থেকে শুরু করে দিনমজুরেরা করোনা থেকে বাঁচতে ঘরে থাকার ‘দৌড়ে’ হাঁপিয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে দিনমজুরদের আক্ষরিক অর্থেই না খেয়ে মরার দশা হয়েছে। তাঁদের চিন্তাভাবনা এখন ছিরু মোল্লার মতো। যেমনটা বলছিলেন রিকশাচালক আক্কু মিয়া, ‘করোনার ভয়েতে জান বাঁচানোর জন্যি সব বন্ধ কইরে ঘরে বসে আছি, সেই জানই যদি খিদের ঠেলায় বাইর হয়া যায়, তাইলে আর ঘরে থাইকা কী লাভ। আর ঘরে থাকলিই যে করোনা আমারে ধরবে না, সে গ্যারান্টি দিচ্ছে কেডা?’

আক্কু মিয়ার কথা মিথ্যা না। কে সংক্রমিত হবে আর কে হবে না—এখন আর এই কথা কেউ জোর দিয়ে বলতে পারছে না। পাঁচতলা থেকে গাছতলা—সবখানে করোনা সমান গতিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। গরিব-বড়লোক, এসি-ননএসি মানছে না। এই সাম্যবাদী মহামারিকে বৈষম্যের লকডাউন দিয়ে তালাবন্দী করা কঠিন।

বিজ্ঞাপন

রাস্তায় প্রাইভেট কার চলতে পারবে, আকাশে বিমান উড়লে ক্ষতি হবে না, ব্যাংকে গিয়ে লোকজন টাকা তুলতে পারবে, কিন্তু রিকশা চললে উপুড় করে রাখা হবে—এমন বৈষম্য সবার চোখেই কেমন-কেমন লাগে। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে ২৫ এপ্রিল থেকে মার্কেট খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু মার্কেটে যাঁরা আসবেন, তাঁদের চলাচলে যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তাতে ক্রেতার তালিকায় সমাজের সেই সুবিধাপ্রাপ্তরাই থাকবেন। মাটিবর্তী মানুষকে মাটিতেই থাকতে হবে।

কয়েকটি জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা ছাড়া সাধারণ সবাইকে জরুরি কাজে বাইরে যাওয়ার জন্য পুলিশের মুভমেন্ট পাস নিতে বলা হয়েছে।

কথা হলো মুভমেন্ট পাস পাওয়া লোকের বাইরে এমন মানুষ আছেন, যাঁর হাতে স্মার্টফোন নেই, ইন্টারনেটের নাম যিনি শোনেনওনি। সেই লোককেও জরুরি কাজে বাইরে যেতে হবে। তখন তাঁকে তো পুলিশের জেরায় জেরবার হতে হবে। তার মানে প্রাইভেট কারকে ছেড়ে দিয়ে রিকশাকে আটকে রাখার মতো এখানেও ‘প্রযুক্তিমনস্ক’ লোকদের চলাচল ঠিক রেখে সেই গরিব মানুষেরই নির্বিঘ্ন হাঁটাচলা বন্ধের বন্দোবস্ত করা হয়েছে।

অফিসে না গিয়েও মাস শেষে পুরো বেতনের নিশ্চয়তা পাওয়া সরকারি চাকুরেদের ‘লকডাউন’ শব্দটা ঘরের মধ্যে বনভোজনের অনুভূতি দিতে পারে। কিন্তু দিনমজুর ও ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিষাক্ত মারণাস্ত্র। এ কারণে লুকোচুরির মুভমেন্ট পাস তুলে দেওয়াই ভালো

২.

করোনাভাইরাস ফুসফুসে চট করে ঢুকে ফট করে মানুষের জান রিমুভ করে দেয়—এটা সবার জানা। কিন্তু সে রাম থেকে শ্যামের দেহে, যদু থেকে মধুর গতরে মুভ করে কোন কায়দায়, তা আজও অজানা। গোড়ার দিকে, মানে গেলবার শীতের মধ্যে ভাইরাসটির উদ্ভব ও উল্লম্ফনকালে দুটি তথ্য খুব চাউর হলো। এক. এই ভাইরাস ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপমাত্রায় বাঁচে না, মানে গরম পড়লে আর তার রেহাই নেই। দুই. এটি ছোঁয়াছুঁয়িভিত্তিক ছোঁয়াচে রোগ। করোনাগ্রস্ত একজনের গতরের সঙ্গে করোনাহীন অপরজনের গা ঘষা খেলে সেই ঘষার মধ্য দিয়ে সে মুভ করে। এ ছাড়া কথা বলার সময় খালি চোখে দেখা যায় না—এমন সূক্ষ্ম থুতুকণিকা বা ড্রপলেট করোনাগ্রস্ত অমুকের মুখ থেকে লাফিয়ে সুস্থ তমুকের নাকে, মুখে, চোখে লাগলে সে–ও ভাইরাসটির খপ্পরে পড়ে। ড্রপলেট ওজনদার জিনিস এবং তা বাতাসে ভেসে উড়ে উড়ে ফ্লাইং মুডে মুভ করতে পারে না; মাটিতে পড়ে যায়। তবে কথা বলার সময় ড্রপলেট মুখ থেকে লাফ মারে। সেই লাফানোর ‘দৌড়’ ছয় থেকে সাত ফুটের বেশি না। মাস্ক পরলে ড্রপলেট মুখ থেকে লাফ দিতে পারে না। পারলেও ছয় ফুটের বেশি না। ফলে ছয় ফুট দূরে থেকে কথা চালালে এই ভাইরাসের মুভমেন্টের ঝুঁকি কম।

এই দুই হাইপোথিসিস মাথায় রেখে গেলবার শীতের কাঁথা গায়ে আমরা গরমের অপেক্ষায় থেকেছিলাম এবং মুখে মাস্ক, হাতে পলিথিনের দস্তানা, পায়ে জুতো পরাসহ পুরো শরীর ঢেকে সামাজিক দূরত্ব রাখার চেষ্টা করেছিলাম। পরে দেখা গেল করোনা ইঁদুরের মতো। সে বরফেও আছে, মরুতেও আছে। জিন-পরির মতো জেনেটিক সুরত বদল করে সে বরফ পড়া সাইবেরিয়া থেকে ঠা ঠা গরম পড়া কুয়েত, কাতারে সমানতালে মুভ করতে লাগল।

বিজ্ঞাপন

এখন মেডিকেল জার্নাল ল্যানসেট–এর সর্বশেষ পর্যালোচনা বলছে, এই ভাইরাস বাতাসে ভর করে ছড়ায়। এটি যে একটি বায়ুবাহিত রোগ, তার পক্ষে তারা ‘ধারাবাহিক ও দৃঢ়’ প্রমাণ পেয়েছে। তারা বলছে, জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলো যদি এটিকে বায়ুবাহিত ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে কপালে আরও দুঃখ আছে। পরিস্থিতি আরও ভয়ানক হবে। তার মানে আমাদের আগের সেই ছয় ফুট দীর্ঘ সামাজিক দূরত্ব আর মাস্কের ব্যবহার দিয়ে বাতাসবাহিত জীবাণু আটকানোর ধারণা এখন প্রশ্নের মুখে পড়ে গেল। এটি যদি বায়ুবাহিত ভাইরাস বলে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয়, তাহলে বায়ুশূন্য কাচের ঘরে লখিন্দর হয়ে বসে থাকা ছাড়া সংক্রমণ এড়ানোর আর কোনো উপায় থাকবে না।

প্রথম ঢেউয়ের সময় যে ভয়ডর মানুষের মধ্যে ছিল, তা এবার নেই। গতবার মানুষ নিজ থেকেই ঘর থেকে বের হয়নি। গরিব ও সংকটে পড়া মধ্যবিত্তের ঘরে খাবার পৌঁছে দিতে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও বহু সংগঠন তখন তৎপর ছিল। কিন্তু এবার তারাও মাঠে নেই। এবার সংক্রমণ হচ্ছে বেশি, মানুষ মরছে বেশি। কিন্তু পাবলিক, বিশেষ করে ব্যবসায়ী ও দিনমজুরশ্রেণি এবার আর ঘরে থাকতে চাইছে না।

অফিসে না গিয়েও মাস শেষে পুরো বেতনের নিশ্চয়তা পাওয়া সরকারি চাকুরেদের ‘লকডাউন’ শব্দটা ঘরের মধ্যে বনভোজনের অনুভূতি দিতে পারে। কিন্তু দিনমজুর ও ব্যবসায়ীদের কাছে তা বিষাক্ত মারণাস্ত্র। এ কারণে লুকোচুরির মুভমেন্ট পাস তুলে দেওয়াই ভালো।

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন