আরও জানালেন, সচিবকে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠানোই যথেষ্ট নয়, চিঠিসহ সরাসরি মন্ত্রণালয়ে চলে এলে কাজ উদ্ধার সহজ হবে। এ ধরনের পরামর্শ দিয়ে কথা শেষ করলেন একান্ত সচিব। আফসার হুদা ভাবতেই পারেননি সচিবকে আমন্ত্রণ জানাতে এতখানি দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হবে তাঁকে। সংশ্লিষ্ট একান্ত সচিবকে বার কয়েক প্রশ্ন করেও ঠিকঠাক জানতে পারলেন না সচিব মহোদয় সেই দিনে খালি আছেন কি না। একদিকে অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি আর অন্যদিকে মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষার তাগিদ; এরপরও সচিব মহোদয়কে অনুষ্ঠানে পাওয়া যাবে তো!

২.

আফসার হুদা অবশেষে তাঁর প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তার স্বাক্ষর নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ই-মেইলে পত্র পাঠালেন সচিব বরাবর। তিন দিন পেরিয়ে গেলেও উত্তর না পেয়ে অবশেষে আবার সেই একান্ত সচিবের শরণাপন্ন হলেন। এইবার তিনি আর তাঁকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতে ভুল করলেন না। কর্মকর্তা আফসার হুদাকে জানিয়ে দিলেন, চিঠিতে অনুষ্ঠানের উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে লেখা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, সচিব ছাড়া অনুষ্ঠানে বিশিষ্টদের মধ্যে আর কে কে আসবেন, সেটিও জানানো হয়নি। এইবার আফসার হুদার মাথায় রীতিমতো আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। কারণ দু-একজন বিশিষ্ট অতিথি অনুষ্ঠানে আসার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত জানালেও, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আরও দুজন কর্মকর্তাকে নিশ্চিত করতে অনেকটা একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন আফসার হুদা এবং তাঁর পুরো টিম। ফলে বিশিষ্টদের তালিকা সচিবকে জানানো আদৌ তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।

সরকারি কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো, সম্মান প্রদর্শন, তাঁদের সম্মানী, তাঁদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, যোগাযোগ রক্ষার কৌশলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয় সাধারণ জনগণকে স্পষ্টভাবে জানানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এতে সরকারের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষ আমলাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে তাঁদের কাছাকাছি পৌঁছতে পারবেন। ফলে তাঁদের হয়রানি কিছুটা হলেও কমবে, বেঁচে যাবে তাঁদের মূল্যবান সময় ও শ্রম।

৩.

অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে আফসার হুদা সফল হলেন অনুষ্ঠানে সেই সচিব, একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা ও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে। এর মধ্যে দফায় দফায় সেই সব কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে অনুষ্ঠানের ধারণাপত্র, আমন্ত্রণপত্র, সময়সূচি, বক্তব্যের বিষয়বস্তু ইত্যাদি। তিনি নিজেও একবার মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার পর সচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। অনুষ্ঠানের দিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে পেরে রীতিমতো গর্ব হচ্ছিল আফসার হুদার। কিন্তু তাঁর সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। অচিরেই কর্মকর্তাদের দিক থেকে প্রশ্ন আসতে শুরু করল মঞ্চে বসার আয়োজন, ব্যানারে লেখা তাঁদের নাম, বক্তব্য দেওয়ার ক্রম ইত্যাদি নিয়ে। এইবার রীতিমতো মুষড়ে পড়লেন আফসার হুদা। এত কষ্ট করেও হয়তো শেষ রক্ষা হলো না তাঁর।

আফসার হুদার নামটি ছদ্মনাম হলেও আফসার হুদার মতো শত শত ব্যক্তি প্রতিদিন একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। বেসরকারি পর্যায়ে উচ্চপদে আসীন আফসার হুদারাই যখন রোজ এ ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তখন সাধারণ জনগণের কথা আর নাইবা বললাম। যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনে উচ্চ পর্যায়ের সরকারি আমলাদের আমন্ত্রণ জানানো যেন অনেকটাই দুঃস্বপ্নের নাম। সাধারণের কাছে সরকারি আমলারা যেন দূর আকাশের তারা! প্রায়ই আমলাদের অনুষ্ঠানে হাজির করাতে যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা আমন্ত্রণকারীকে সরকারি কর্মকর্তাদের সেবক তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে ভৃত্য হওয়ার অনুভূতিও এনে দেয়।

যে সরকারি কর্মকর্তারা জনগণের সেবক হওয়ার অঙ্গীকার করে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কাঁধে নেন, মাত্র কয়েক বছরের মাথায় তাঁরা কী করে জনগণের ‘প্রভু’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তার উত্তর চাওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাই না আজকাল। আমন্ত্রণকারীর হাজারো ভুলত্রুটি কিংবা সীমাবদ্ধতার কথা সরকারি মহল থেকে জানানো হলেও যোগাযোগের কোনো পর্যায়ে আমলাদের দায়বদ্ধতা, দায়িত্বশীলতা কিংবা সামান্য সৌজন্যবোধের প্রকাশ মেলে না বললেই চলে। আমলাদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করানোর সব দায় যেন আমন্ত্রণকারীর একার। বেসরকারি আয়োজনকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ভয়াবহ ঘাটতি পরিলক্ষিত হয় এই সব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বক্তব্য ও আচরণে; যা সরকারি প্রতিনিধিত্বকে প্রায়ই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

সরকারি গণ্ডির বাইরে থাকা সাধারণ মানুষ যেহেতু সরকারি নিয়মকানুন কিংবা প্রটোকলের সঙ্গে পরিচিত নয়, তাই এই বিষয়গুলো সমন্বয় করতে তাঁরা হিমশিম খান। এই সব আমলা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। কিছুদিন আগে এক জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছিলেন, বইমেলা, ইতিহাস সম্মেলন, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সম্মেলন, উচ্চাঙ্গসংগীতশিল্পী সম্মেলন, উচ্চাঙ্গ নৃত্যশিল্পী সম্মেলন, হৃদ্‌রোগ-সার্জারি সম্মেলনসহ প্রাসঙ্গিক কিংবা অপ্রাসঙ্গিক যেকোনো সভা-সম্মেলনে আমলাদের দিয়ে সভা আলোকিত করার বাস্তবতা নিয়ে।

এই যদি হয় বাস্তবতা, তবে সরকারের কাছে জোর দাবি জানাই সরকারি কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো, সম্মান প্রদর্শন, তাঁদের সম্মানী, তাঁদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, যোগাযোগ রক্ষার কৌশলসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয় সাধারণ জনগণকে স্পষ্টভাবে জানানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এতে সরকারের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষ আমলাদের চাহিদা অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে তাঁদের কাছাকাছি পৌঁছতে পারবেন। ফলে তাঁদের হয়রানি কিছুটা হলেও কমবে, বেঁচে যাবে তাঁদের মূল্যবান সময় ও শ্রম।

দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, এতে একদিকে জনগণের সেবা নিয়ে যেমন আমলারা সন্তুষ্ট থাকবেন, অন্যদিকে আমলাদের সন্তুষ্ট রেখে ধন্য হবেন সাধারণেরা। শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘দেশ প্রশাসকে ভরে গেছে। যেদিকে তাকাবেন শুধুই প্রশাসক দেখতে পাবেন।’ তাই আমলাতান্ত্রিকতাই যখন বাস্তবতা, তখন এর সঙ্গে যত তাড়াতাড়ি মানিয়ে নেওয়া যায় ততই মঙ্গল। প্রশাসকসর্বস্ব এই দেশের প্রশাসকদের সঙ্গে মানিয়ে চলার কৌশল রপ্ত করার কোনো বিকল্প আমি অন্তত দেখি না।

নিশাত সুলতানা লেখক ও উন্নয়নকর্মী।

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন