default-image

কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বে গঠিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) পক্ষপাতদুষ্টতা ও অসততা সর্বজনবিদিত। এই কমিশনের অযোগ্যতা ও জনস্বার্থবিরোধিতা সাম্প্রতিক কিছু কার্যক্রমে প্রদর্শিত হয়েছে। পক্ষপাতদুষ্টতা ও অসততার সঙ্গে অযোগ্যতা ও জনস্বার্থবিরোধিতার মিশ্রণে যে বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, তা জাতি হিসেবে আমাদের ভয়াবহ বিপদের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বর্তমান নির্বাচন কমিশনের প্রায় সাড়ে তিন বছরের মেয়াদকালে পক্ষপাতদুষ্টতার বড় দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে গত জাতীয় নির্বাচনে। বিরোধী দলের ওপর সরকারের দমন–পীড়ন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মদদে গত জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বিরোধী দলের প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার থেকে বিরত রাখা এবং ভোটের ক্ষেত্রে অনিয়ম–কারসাজি–জবরদস্তির বিষয়ে কমিশন ছিল নির্বিকার। ফলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রহসনে পরিণত হয়।

গত কয়েক বছরে অসততার যেসব উদাহরণ নূরুল হুদা কমিশন সৃষ্টি করেছে, তার একটি হলো ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহারের ব্যাপারে কমিশনের অঙ্গীকার রক্ষা না করা। সিইসি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর নূরুল হুদা একাধিকবার প্রকাশ্য অঙ্গীকার করেছিলেন যে রাজনৈতিক দলগুলো একমত না হলে কমিশন ভবিষ্যতে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করবে না। সব বিরোধী দলের অসম্মতি সত্ত্বেও কমিশন সব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। শুধু তা–ই নয়, কমিশন ভিভিপিএটি (ভেরিফায়েভল ভোটার পেপার অডিট ট্রেইল) ছাড়াই প্রায় চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে এবং কমিশন কর্তৃক গঠিত কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির সর্বজন শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর মতামত উপেক্ষা করে দেড় লাখ ইভিএম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়।

বিজ্ঞাপন

কমিশনের অসততার আরেকটি বড় দৃষ্টান্ত হলো জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনী কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ অর্থের নয়ছয়। প্রথম আলোর (৬ আগস্ট ২০১৯) এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বক্তৃতার নামে সিইসি, অন্যান্য কমিশনার ও সচিবদের বিরুদ্ধে দুই কোটি টাকা পকেটস্থ করার অভিযোগ তোলা হয়। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে কমিশনের সদস্যরা বেতন-ভাতা পান এবং প্রশিক্ষণের আয়োজন করা কমিশনেরই দায়িত্ব। তাই সিইসি ও কমিশনাররা যা করেছেন, তা নিজেদের বেতন-ভাতার বাইরে অন্যায়ভাবে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সমতুল্য। প্রসঙ্গত, শামসুল হুদা কমিশনের সদস্যরা প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য নিজেদের বেতন-ভাতার বাইরে কোনোরকম পারিশ্রমিক নেননি।

এটি সুস্পষ্ট যে আরপিও বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও কমিশন সে দায়িত্বের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে আইনটি সংশোধন এবং রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য একটি নতুন আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মাধ্যমে কমিশনের অযোগ্যতা ও জনস্বার্থবিরোধী ভূমিকাই প্রকাশ পাচ্ছে

কমিশনের জনস্বার্থবিরোধিতার বড় দৃষ্টান্ত হলো ইসির অধীনে রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধন–সম্পর্কিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের একটি ধারা বাদ দেওয়া, যেখানে ২০২০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক দলের সব কমিটিতে এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধি রাখার বিধান রয়েছে। সম্প্রতি কমিশন এই ধারা থেকে সময়সীমা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করেছে, এর ফলে রাজনৈতিক দলের ওপর এটি মানার বাধ্যবাধকতা থাকবে না। এই সিদ্ধান্ত আমাদের সংবিধানের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক, যেখানে বলা আছে, ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ নারীরা আমাদের জনগোষ্ঠীর অর্ধেক, তাই রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে শিথিলতা হবে নিঃসন্দেহে জনবিরোধী।

ইসির জনস্বার্থবিরোধী কাজের আরেকটি দৃষ্টান্ত হলো রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের লক্ষ্যে পৃথক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ। সুশাসনের জন্য নাগরিকসহ (সুজন) আরও বহু নাগরিকের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাজনৈতিক দলের বাধ্যতামূলক নিবন্ধনের বিধান শামসুল হুদা কমিশনের উদ্যোগে আরপিওতে অন্তর্ভুক্ত হয়। দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন ও বিদেশি শাখার বিলুপ্তি দলের নিবন্ধনের অন্যতম শর্ত। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো এসব শর্ত ক্রমাগতভাবে উপেক্ষা করে আসছে এবং কমিশন এ ব্যাপারে টুঁ–শব্দটিও করছে না, যদিও তাদেরই দায়িত্ব আরপিও বাস্তবায়ন করা। এ ছাড়া প্রস্তাবিত নিবন্ধন আইনে এমন অনেক বিধান যুক্ত করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনকে বাধাগ্রস্ত করবে, যা হবে সংগঠন করার অধিকারসংবলিত সংবিধানের ২৮ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন এবং জনস্বার্থবিরোধী। কমিশন সম্পূর্ণ গোপনে সেটি বাতিলের উদ্যোগ নেয়, যদিও ধরা খেয়ে তারা এখন এর থেকে সরে আসার কথা বলছে।

বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন ১০টি ধারার ১১টি উপধারা বাদ দিয়ে আরপিও সংশোধনের একটি প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করে। এ প্রস্তাবে যেসব বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো কমিশনের পক্ষ থেকে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা কর্তৃক ভোট গ্রহণ বন্ধ করা, সর্বোপরি আইনের গুরুতর লঙ্ঘনের জন্য প্রার্থিতা বাতিলের (৯১ই ধারা) ক্ষমতা রোধ। এসব ক্ষমতা রোধ করলে কমিশন ঠুঁটো জগন্নাথের মতো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যার মাধ্যমে কার স্বার্থসিদ্ধি হবে, তা আমাদের বোধগম্য নয়। প্রসঙ্গত, সুজনের প্রস্তাবে ইসিকে ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে এ টি এম শামসুল হুদা কমিশনের উদ্যোগে আরপিওতে এই ধারা যুক্ত করা হয়। রকিবউদ্দীন কমিশন ধারাটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করলেও ব্যাপক প্রতিবাদের মুখে তারা সে উদ্যোগ থেকে সরে আসে। তবে বর্তমান কমিশন লুকোচুরি করে গোপনে এটি বাতিলের উদ্যোগ নেয়।

গত ২২ আগস্ট দৈনিক যুগান্তর–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাবটি তৈরি করেছেন, যাতে অনেক বিধান বাদ পড়েছে অনিচ্ছাকৃতভাবে। অনিচ্ছাকৃতভাবে অনেক মৌলিক বিষয় আরপিও থেকে বাদ পড়া কমিশনের অযোগ্যতারই নগ্ন প্রতিফলন।

এটি সুস্পষ্ট যে আরপিও বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের হলেও কমিশন সে দায়িত্বের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে আইনটি সংশোধন এবং রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের জন্য একটি নতুন আইন প্রণয়নের সিদ্ধান্ত নেয়। এর মাধ্যমে কমিশনের অযোগ্যতা ও জনস্বার্থবিরোধী ভূমিকাই প্রকাশ পাচ্ছে। এ ছাড়া আরপিও সংশোধন ও রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনে নতুন আইন প্রণয়নের দাবি কেউ করেছে বলে আমরা শুনিনি। বরং রাজনৈতিক দলগুলো এর প্রয়োজনীয়তাই উপলব্ধি করছে না বলে কমিশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছে। তবে আমাদের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে সিইসি ও অন্য কমিশনারদের নিয়োগের বিষয়ে একটি আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে, যা গত ৪৮ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। এমন একটি আইনের খসড়া ড. হুদা কমিশন তৈরি করে রেখে গেছে। জনস্বার্থ সমুন্নত করার লক্ষ্যে বর্তমান কমিশন এমন একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারত। সুজনের পক্ষ থেকেও এমন একটি আইনের খসড়া তৈরি করা হয়েছে, যা দিয়ে আমরা কমিশনকে সহায়তা করতে পারতাম।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

মন্তব্য পড়ুন 0