বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

হিন্দু যুগের আয়ুর্বেদিক, মুসলিম আমলের ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যা, ঝাড়ফুঁকের মাধ্যমে লোকজ চিকিৎসা এবং পরবর্তী সময়ে কোম্পানি আমলে পাশ্চাত্য চিকিৎসা আমাদের এখানে যুক্ত হয়। বাংলা প্রদেশে ১৯৪০-এর দশকে বিদ্যমান জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল, যার ফলে জনস্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। এমনকি বাংলায় দুর্ভিক্ষ পরবর্তী যুগেও জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বাভাবিক সামর্থ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জনস্বাস্থ্যসেবার অবনতি ঘটলে ১৯৪৩ সালে স্যার জোসেফ ভোরের নেতৃত্বে উপমহাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ‘স্বাস্থ্য জরিপ ও উন্নয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়। ভোর কমিটি নামে পরিচিত এ কমিটিতে চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রশাসক, প্রকৌশলী ও আইনবিদেরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলতে গেলে ভোর কমিটি দিয়ে আলাপ শুরু করা দরকার। এ কমিটির গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সুপারিশ ছিল সমস্ত প্রশাসনিক স্তরে প্রতিরোধমূলক ও নিরাময়মূলক পরিষেবা সংহতকরণ। প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর দুটি পর্যায়ে উত্তরণ। পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপনের। এ ধরনের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দুজন চিকিৎসক, একজন নার্স, চারজন জনস্বাস্থ্য নার্স, চারজন ধাত্রী, চারজন প্রশিক্ষিত ডাইস, দুজন স্যানিটারি ইন্সপেক্টর, দুজন স্বাস্থ্য সহায়তাকারী, একজন ফার্মাসিস্ট ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী থাকতে হবে। পাশাপাশি একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির আওতায় প্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার জনগোষ্ঠীর জন্য ৫ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালসহ আঞ্চলিকভাবে ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতাল থাকতে হবে। চিকিৎসা শিক্ষার বড় পরিবর্তনগুলোর মধ্যে ‘সামাজিক চিকিৎসক’ প্রস্তুত করার জন্য প্রতিরোধমূলক ও সামাজিক চিকিৎসার তিন মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরও ছিল এমবিবিএস ডিগ্রি ও স্নাতকোত্তর মেডিকেল শিক্ষা ও গবেষণার জন্য একটি প্রধান কেন্দ্রীয় ইনস্টিটিউট গঠন। ভোর কমিটির সুপারিশমালা বাস্তবায়নের আগেই এ উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। তবে এ কমিটির সুপারিশ পরবর্তীকালে দুই দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে সন্দেহাতীতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় জনস্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে। এমনকি বাংলায় দুর্ভিক্ষ পরবর্তী যুগেও জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বাভাবিক সামর্থ্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে জনস্বাস্থ্যসেবার অবনতি ঘটলে ১৯৪৩ সালে স্যার জোসেফ ভোরের নেতৃত্বে উপমহাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য ‘স্বাস্থ্য জরিপ ও উন্নয়ন কমিটি’ গঠন করা হয়।

দেশ বিভাগের পর দ্বিতীয় নিখিল পাকিস্তান স্বাস্থ্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ঢাকায় ১৯৫১ সালে। এ সম্মেলনে ছয় বছর মেয়াদি এক স্বাস্থ্য পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। এসব পরিকল্পনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানো; গ্রামীণ ঔষধালয়ের সংখ্যা বাড়ানো; মেডিকেল স্কুলগুলোকে কলেজে রূপান্তর; উভয় প্রদেশে একটি করে ইনস্টিটিউট অব হাইজিন অ্যান্ড প্রিভেনটিভ মেডিসিন, মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও ওষুধ পরীক্ষার ল্যাবরেটরি প্রতিষ্ঠা করা; প্রতিরোধমূলক ও প্রতিকারমূলক চিকিৎসার সমন্বয় সাধন এবং ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিষ্ঠান স্থাপন। এরপরও প্রশাসনিক অন্যান্য ব্যবস্থার মতোই পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাও পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অনেক অবহেলিত ছিল। ১৯৫২ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে মোট চারটি নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়, এর একটি একান্তভাবে নারীদের জন্য। অথচ এর পাঁচ বছর পর ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রামে দ্বিতীয় মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। একমাত্র ইনস্টিটিউট অব হাইজিন অ্যান্ড প্রিভেনটিভ মেডিসিন প্রতিষ্ঠিত হয় লাহোরে। নানা দিক থেকে স্বাস্থ্যবিষয়ক সব সরকারি কর্মকাণ্ডে পূর্ব পাকিস্তান নানাভাবে বঞ্চিত হয়েছিল। দীর্ঘদিনেও এখানে স্বাস্থ্যবিষয়ক দক্ষ জনশক্তি গড়ার তেমন অবকাঠামো তৈরি হয়নি। সব মিলে দুই অংশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গুরুতর বৈষম্য বিরাজ করত।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকার জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা, মা ও শিশুস্বাস্থ্য এবং পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিগুলোকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনশক্তি গড়ার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। এ সময় জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য আইপিজিএমআর, জাতীয় হৃদ্‌রোগ ইনস্টিটিউট, জাতীয় চক্ষু ইনস্টিটিউট, বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হসপিটাল, পঙ্গু হাসপাতাল, বারডেম, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ও নিপসম। এসব প্রতিষ্ঠানের কয়েকটিতে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ, ডিপ্লোমা বা ডিগ্রি কোর্সের ব্যবস্থা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান ছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও অনেক চিকিৎসা এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয়। বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠাসহ গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উন্নীতকরণ করা হয়। জাতীয় স্বাস্থ্য পাঠাগার ও ডকুমেন্টেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঘোষিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ নিশ্চিতকরণের জন্য ১৯৭৯ সালে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা’ কৌশল গ্রহণ করা হয়। একটু চিন্তা করলে দেখা যায়, একই প্রস্তাবনার সুপারিশ ভোর কমিটি ১৯৪৫ সালে দিয়েছিল।

বর্তমানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিম্নমান বা গরিব মানুষের চিকিৎসাসেবা হওয়ায় অনেকেই এ সেবা নিতে অনাগ্রহী। প্রাথমিক শব্দটি মূলত ভিত্তি অর্থে ব্যবহৃত হয়। একজন ব্যক্তির স্বাস্থ্য সমস্যা একেবারে শুরুর পর্যায়ে নির্ণয় করে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করাই যার মূল উদ্দেশ্য। এতে অসুস্থতাজনিত জটিলতা ও ব্যয় কমানো সম্ভব। এ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান তৈরির সুপারিশ ছিল ভোর কমিটির। সেই সুপারিশ ছিল প্রান্তিক স্তরের ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যসেবা আওতায় আনার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। বাংলাদেশের ভৌগোলিক গঠন থেকে সহজেই বোঝা যায়, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হলে ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার ওয়ার্ড পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ভোর কমিটির সুপারিশের বাস্তব রূপ দিয়েছে। বর্তমানে ১৩ হাজার ৯৪৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক সফলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা শতভাগ নিশ্চিতকরণে এ কমিউনিটি ক্লিনিকই হতে পারে একমাত্র সুপরিকল্পিত কাঠামোগত কৌশল। সময় এসেছে এ কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম সমৃদ্ধ, শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করতে আরও কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করার।

ড. মো. তাজউদ্দিন সিকদার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সভাপতি ও সহযোগী অধ্যাপক। পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।
জুয়েল আহমেদ চৌধুরী বাংলাদেশ মেডিকেল সায়েন্স হোম এর কর্ণধার

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন