default-image

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আর ৪০ দিনও নেই। প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জো বাইডেন যে স্বস্তিতে নেই, তা তাঁদের প্রচারের ধরন থেকেই বোঝা যাচ্ছে। একই সঙ্গে ভোটারদের কোন অংশ তাঁদের জয় এনে দিতে পারে, তা নিয়ে দুই দলের কৌশলবিদেরা চিন্তিত। তাঁরা একদিকে যেমন বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের দিকে দৃষ্টি রাখছেন, তেমনি নজর রাখছেন জনমিতির হিসাবের দিকে। অর্থাৎ বর্ণ, ধর্ম, জেন্ডার ও বয়সের বিবেচনায় কোন অংশের সমর্থন কার প্রতি—সেই হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে। তাঁরা বুঝতে চাইছেন, নিজেদের প্রচারণার দুর্বল জায়গাগুলো কোথায়, এগুলো মোকাবিলায় তাঁদের কী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অবশ্য অনেক অঙ্গরাজ্যেই ডাকযোগে ভোট দেওয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে যেসব জায়গায় আগাম ভোট দেওয়া শুরু হয়েছে, সেখানে ভোটারদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।

যুক্তরাষ্ট্র সময় গত বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জনমত জরিপগুলোয় দেখা যায়, ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জো বাইডেন জাতীয় পর্যায়ে গড়ে ৭ পয়েন্টের বেশি এগিয়ে আছেন, কোনো কোনো জরিপে বাইডেন এগিয়ে আছেন ৯ পয়েন্টে। আর ‘ব্যাটল গ্রাউন্ড’ হিসেবে পরিচিত অন্তত পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে ট্রাম্প পিছিয়ে আছেন, এর কিছু কিছু ২০১৬ সালে তিনি সহজেই ডেমোক্র্যাটদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। উইসকনসিন ও মিনেসোটায় বাইডেন যতটা এগিয়ে আছেন, তা নাটকীয়ভাবে বদলে না গেলে এগুলোতে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনাই কমে আসছে। অন্যদিকে, সিএনবিসি-চেঞ্জ রিসার্চের জরিপে বলা হচ্ছে, অ্যারিজোনা, ফ্লোরিডা, নর্থ ক্যারোলাইনা এবং পেনসিলভানিয়াও বাইডেন এগিয়ে। তবে এবিসি নিউজ ও ওয়াশিংটন পোস্ট-এর করা জরিপে দেখা গেছে, অ্যারিজোনা ও ফ্লোরিডায় ট্রাম্প সামান্য এগিয়ে আছেন।

বিজ্ঞাপন

জরিপে এগিয়ে থেকেও অস্বস্তিতে বাইডেন। ক্ষমতাসীন হয়েও পিছিয়ে পড়ে নির্বাচন করতে হচ্ছে ট্রাম্পকে।

বিভিন্ন জনমত জরিপে এগিয়ে থাকা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটরা যে স্বস্তি পাচ্ছেন না, তার কারণ তিনটি। প্রথমত, ২০১৬ সালের দুঃস্বপ্ন তাঁদের সব সময় তাড়া করছে। যদিও এটাও তাঁরা জানেন যে ২০১৬ সালে নির্বাচনের ছয় সপ্তাহ আগে ফাইভথার্টিএইট-এর হিসাবে ট্রাম্পের চেয়ে মাত্র ১ দশমিক ৫ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। কিন্তু এখন বাইডেন এগিয়ে আছেন ৬ দশমিক ৮ পয়েন্টে। কিন্তু এটি তাঁদের অস্বস্তি কমায় না, কেননা নির্বাচনে জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি দরকার ইলেকটোরাল কলেজ ভোট। তাঁরা বুঝতে পারছেন না যে এ ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলোর জনমত জরিপে ভরসা করা যায় কি না। অথবা গতবারের মতো তাঁরা কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যকে অবহেলা করছেন কি না এবং তার মাশুল গুনতে হবে কি না। এ ছাড়া করোনাভাইরাসের জন্য আরোপিত নিষেধাজ্ঞা মেনে নেওয়ার কারণে তাঁরা ট্রাম্পের মতো সমাবেশ করে প্রচার চালাতে পারছেন না।

দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি রুথ বেইডার গিন্সবার্গের মৃত্যুর পর তাঁর জায়গায় একজন রক্ষণশীল বিচারপতি নিয়োগকে কেন্দ্র করে ট্রাম্পের পদক্ষেপ এবং সিনেটে রিপাবলিকান দলের সদস্যদের ঐক্যে দলের সমর্থকদের মধ্যে যে উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব কী পড়বে, সেই বিষয়ে অনিশ্চয়তা। রক্ষণশীলেরা দেখতে পাচ্ছেন যে তাঁদের কাছে মূল্যবোধ ও আদর্শিক বিবেচনায় যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, যেমন গর্ভপাতের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করার মতো বিষয়গুলোতে ট্রাম্পের ওপরে তাঁরা ভরসা রাখতে পারেন। এর বিপরীতে অবশ্য উদারনীতির সমর্থক ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থক বিভিন্ন সংগঠন তৎপর হয়ে ২৮ ঘণ্টায় ৯৮ মিলিয়ন ডলার তুলতে সক্ষম হয়। শুধু তা-ই নয়, ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংগঠন নতুন ভোটার তালিকাভুক্তিতে সাড়া পাচ্ছে। ভোটডটঅর্গ নামের একটি প্রতিষ্ঠান এই সপ্তাহে দুই দিনে ৪০ হাজার নতুন ভোটার তালিকাভুক্তি করেছে, যা গত সপ্তাহান্তের তুলনায় ৬৮ শতাংশ বেশি।

তৃতীয় কারণ হচ্ছে, বিজয়ের জন্য হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যে বাইডেনের জনসমর্থন যথেষ্ট কি না, সে ব্যাপারে পুরো নিশ্চিত না হওয়া। যদিও জাতীয়ভাবে ল্যাটিনো জনগোষ্ঠীর মধ্যে বাইডেনের সমর্থন ট্রাম্পের চেয়ে অনেক বেশি। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, এনবিসি টেলিমুন্দোর করা জরিপ অনুযায়ী, তা ৬২ শতাংশ বনাম ২৬ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের সময়ের কথা বিবেচনায় নিলে তা অনেক কম। তখন হিলারির প্রতি সমর্থন ছিল ৭৯ শতাংশ। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প পেয়েছিলেন ২৮ শতাংশ। কিন্তু জাতীয়ভাবে এই সমর্থনের চেয়ে যা বেশি দরকার, তা হচ্ছে যেসব অঙ্গরাজ্যে বিশালসংখ্যক হিস্পানিক জনগোষ্ঠী আছে, সেখানে এই সমর্থন নিশ্চিত করা। এসব অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ফ্লোরিডায় কমপক্ষে ২০ শতাংশ, টেক্সাসে ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ, নেভাদায় ২৯ দশমিক ২ শতাংশ, অ্যারিজোনায় ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ হচ্ছে ল্যাটিনো ভোটার। এসব অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের সমর্থনের মাত্রা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৫০ শতাংশ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সামগ্রিকভাবে অবস্থা যে মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়, তার বড় প্রমাণ হচ্ছে ক্ষমতাসীন থাকা সত্ত্বেও তাঁকে জনমত জরিপের ফলাফলে পিছিয়ে পড়েই নির্বাচন করতে হচ্ছে। করোনাভাইরাসের ফলে যে পরিস্থিতির সূচনা হয়েছে, সে জন্য তাঁর অবহেলা এবং দায়িত্বহীনতাকেই দায়ী করা হচ্ছে। তা ছাড়া বাইডেনের বিরুদ্ধে ট্রাম্প যেসব কৌশলই গ্রহণ করেছেন, যেমন তাঁকে একজন সমাজতন্ত্রী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন কিংবা বাইডেন দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও নৈরাজ্যের সমর্থক বলে প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন, সেগুলো কাজে দেয়নি। ট্রাম্পের জন্য তার চেয়ে বড় অস্বস্তির কারণ হচ্ছে, নারীদের মধ্যে তাঁর সমর্থনে বড় রকম ঘাটতি দেখা যাচ্ছে।

বুধবার অল ইন টুগেদার নামের একটি নির্দলীয় সংস্থার করা একটি জনমত জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে, যাতে দেখা গেছে, নারীদের মধ্যে বাইডেন এগিয়ে আছেন ১১ পয়েন্টে, অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে ট্রাম্প এগিয়ে আছেন ৭ পয়েন্টে। শহরতলির নারীদের মধ্যেও ট্রাম্পের সমর্থন বাইডেনের চেয়ে অনেক কম। জরিপে ৫৫ শতাংশ সমর্থন করেছেন বাইডেনকে, অন্য দিকে ট্রাম্পের সমর্থন ৪১ শতাংশ। মাত্র ৪ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্ত নেননি। অথচ ২০১৬ সালে ট্রাম্পের বিজয়ের পেছনে নারীদের সমর্থন সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত নন এমন নারী ভোটারদের মধ্যে বাইডেনের সমর্থন ট্রাম্পের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। তবে কলেজ ডিগ্রি নেই এমন শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যে ট্রাম্পের সমর্থন বাইডেনের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু বিজয়ের জন্য এটাই যথেষ্ট কি না, তা নিয়ে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে যুক্তদের মধ্যে অস্বস্তি এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0