বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

কাকতালীয় ভাবে জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলে যখন এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র সফররত জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা ম্যার্কেলকে জলবায়ু বাঁচাতে তার দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় সম্মান সূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেছে।

বহু বছর থেকেই পৃথিবীর উভয় গোলার্ধের বেশ কিছু শিল্পোন্নত ধনী দেশের খামখেয়ালির কারণে বা অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে জলবায়ু রক্ষার বিষয়টি ততটা আমলে নেয়নি। অথচ বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ গোলার্ধের অনেক দেশ জলবায়ুর বিপর্যয়ে মানবজীবন ও অর্থনৈতিকভাবে সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সত্তরের দশক থেকেই জার্মানি তথা ইউরোপের পরিবেশবাদীদের আন্দোলনকরীরা বৈশ্বিক জলবায়ু বাঁচাতে সরকার গুলির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। উত্তর গোলার্ধের এসব শিল্পোন্নত দেশের কিছু নাগরিক বা ইউরোপীয় পরিবেশবাদীরা ইউরোপজুড়ে দীর্ঘদিন থেকে নানা ধরনের পরিবেশ বিষয়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। এই ধরনের আন্দোলনের সর্বশেষ সংযোজন তরুণ প্রজন্মের ফ্রাইডে’স ফর ফিউচার আন্দোলন, যা এখন পশ্চিমা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

একসময় বন্যা, জলোচ্ছ্বাস প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি ইউরোপ বা আমেরিকার সরকারগুলি ততটা গুরুত্বের সঙ্গে দেখেনি। এখন এই সব অঞ্চলগুলোতেও ঝড়, উচ্চ তাপমাত্রা, অতিবৃষ্টি, বন্যা ছড়িয়ে পড়েছে। প্রকৃতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক জলবায়ু বা উষ্ণতার কোনো উত্তর বা দক্ষিণ গোলার্ধ নেই। জলবায়ুর রূপান্তর ও পরিবর্তনের প্রভাব বৈশ্বিক। আর সব গোলার্ধেই তার প্রভাব দৃশ্যমান।

জলবায়ুর জন্য ক্ষতিকারক অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নিরোধে বা রক্ষা পেতে কয়লা ও আণবিক চুল্লি থেকে উৎপাদিত জ্বালানি ব্যবহার থেকে ক্রমেই সরে আসছে ইউরোপ। কয়লা ও আণবিক চুল্লির ব্যবহার হ্রাস করে বিকল্প জ্বালানির বিকাশ ও ব্যবহারে এই মুহূর্তে ইউরোপ মহাদেশে জার্মানি এক অগ্রগণ্য দেশ।

বিগত দুই দশক থেকে জার্মানিতে সৌর, বায়ু বা পানিবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত জ্বালানির হার ক্রমেই বেড়েছে। জার্মানিতে একসময় কয়লা ও আণবিক চুল্লি থেকে উৎপাদিত জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহার হলেও পরিবেশবাদীদের চাপের মুখে এই দুটি খাত নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা থেকে তারা বের হয়ে আসছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘ফিট ফর ফিফটি ফাইভ’ নাম যে জলবায়ু সংরক্ষণ কর্মসূচি উপস্থাপন করেছে, তাতে আগামী দিনগুলিতে পেট্রল এবং ডিজেল গাড়িগুলোর নিবন্ধন বন্ধ হয়ে যাবে। সে ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রচলন হবে। ক্ষতিকারক সিও ২ বা কার্বন ডাই- অক্সাইড নির্গমন রোধে অতিরিক্ত নতুন শুল্কের প্রচলন হবে।

জার্মানির দুর্যোগ প্রতিরোধ ও সমন্বয় সংক্রান্ত মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নর্থ রাইন ভেস্টফ্যালিয়া ও রাইনল্যান্ড-ফ্যালৎস রাজ্য দুটিতে বন্যায় দারুণ ভাবে বিপর্যস্ত হয়েছে। রাইনল্যান্ড-ফ্যালৎস রাজ্যের অহরওয়েলার জেলার বাড নয়েনার, শুল্ড এলাকাতেই ১১০ ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে। দুই রাজ্যে সর্বমোট ১৬৪ জন ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এখনো পর্যন্ত বেশ কিছু মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। ওই এলাকার বাসিন্দারা বলেছেন, প্রবল বৃষ্টিপাতের মধ্যে কিছু বুঝে ওঠার আগেই পানির তোড়ে তাদের ঘরবাড়ি, বেসমেন্ট পানির নীচে তলিয়ে যায়। বন্যাজনিত কারণে কোলোন শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইরফট্যাডট-ব্লেসেমে বিশাল এলাকাজুড়ে বড় ধরনের ভূমিধসের নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে। ভূমিধসে এই এলাকায় বড় এলাকাজুড়ে গর্ত সৃষ্টি হয়েছে।

জার্মানির নর্থ রাইন ভেস্টফ্যালিয়া রাজ্যের এরফস্টেড শহরের নিকট অবস্থিত ২৬৫ নম্বর মহাসড়ক থেকে বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া ২৮ গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সৌভাগ্যবশত গাড়িগুলো পানিতে ডুবে যাওয়ার আগেই, গাড়ির যাত্রীরা নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হন। এখন জার্মান সেনাবাহিনীর সাজোঁয়া গাড়িগুলো এখন গাড়িগুলোকে সড়ক থেকে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ধ্বংসাত্মক বন্যার পর উপদ্রুত অঞ্চলের পানি ধীরে ধীরে কমছে-সঙ্গে সঙ্গে দুর্গত অঞ্চলে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া ভয়ংকর রকমের ক্ষয়ক্ষতি আরও বেশি করে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। বন্যাজনিত বিপর্যয় শেষ হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগবে বলে জানানো হয়েছে।

জার্মানির পশ্চিমাঞ্চলে হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে জার্মানির ৭ জন জলবায়ু বিজ্ঞানী সম্প্রতি জার্মান রেডিওতে তাদের মতামত প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতাই মূলত এই ধরনের ভারী বৃষ্টিপাতের কারণ।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই জাতীয় চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘটতে থাকবে। বার্লিনের বিখ্যাত হমবল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞান ও বিশ্লেষণ বিভাগের প্রধান ড. কার্ল ফ্রিডরিশ শ্লেউসনার বলেছেন, আমরা জানি যে উষ্ণায়নের ফলে ভারী বৃষ্টিপাত বৃদ্ধি পাবে এবং দুর্ভাগ্যক্রমে ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে জার্মানির পশ্চিমাঞ্চল ও সংলগ্ন বেলজিয়াম এবং লুক্সেমবার্গে আরও ঘন ঘন ও সর্বনাশা বন্যার ঘটনা ঘটবে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতি এক ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বায়ুমণ্ডল প্রায় সাত শতাংশ বেশি আর্দ্রতা শোষণ করতে পারে। উষ্ণায়নের ফলে সৃষ্ট এই অতিরিক্ত আর্দ্রতা দীর্ঘ মেয়াদে উচ্চতর পরিমাণে বৃষ্টিপাত বা বিশেষত ভারী বৃষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রাকৃতিক নিয়মে পৃথিবীর বিষুবরেখা সংলগ্ন অঞ্চলে গ্রীষ্মের তীব্রতা থাকায় বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হয়ে থাকে। তবে এখন বিশ্ব জলবায়ু উষ্ণায়নের কারণে উত্তর গোলার্ধের দেশগুলিতে হিমবাহ গলে যাচ্ছে, কম তুষারপাত ও গরমকালে অতিরিক্ত গরম ও অতিবৃষ্টির ঘটনা ঘটছে।

এখন ভাবার সময় এসেছে, পৃথিবীকে বাঁচাতে বিশ্বের সব প্রান্তের মানুষকে সজাগ হওয়ার। নইলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ তার সীমারেখা মানছে না, সে হোক উত্তর বা দক্ষিণ গোলার্ধ।

সরাফ আহমেদ প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি

sharaf. [email protected] net

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন