default-image

ওলিভার ক্রমওয়েলের ইতিহাস আপনাদের নিশ্চয় জানা আছে। সতেরো শতকের মাঝামাঝি ইংল্যান্ডের রাজা চার্লসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তিনি সিংহাসনে আরোহণ করেন। রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ফলে নিজে রাজা না হয়ে হয়েছিলেন লর্ড প্রটেকটর। আট বছর দেশ শাসনের পর মারা গেলে ক্রমওয়েলের জায়গায় ক্ষমতায় বসেন তাঁর ছেলে রিচার্ড। বছর না ঘুরতেই দেশে ফের বিদ্রোহ। রিচার্ডের জায়গায় এবার ক্ষমতায় ফিরে এলেন নিহত চার্লসের দেশান্তরি পুত্র, দ্বিতীয় চার্লস। তিনি এসেই নির্দেশ দিলেন, ‘ক্রমওয়েলের লাশ কবর খুঁড়ে বের করো।’ যেই কথা সেই কাজ। শুধু মাটি খুঁড়ে বের করাই হলো না, ক্রমওয়েলের মাথা কেটে তা গেঁথে রাখা হলো ২০ ফুট লম্বা এক বর্শায়, ইংরেজিতে যার নাম স্পাইক। সেই থেকে ‘হেড অন আ স্পাইক’ বা ‘বর্শার আগায় মস্তক’ কথাটা ইংরেজি ভাষায় চালু হলো।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইমপিচমেন্ট নিয়ে মার্কিন সিনেটে যখন বিচার শুরু হলো, সে সময় হোয়াইট হাউসের একজন উপদেষ্টা সিবিএস টিভির এক সংবাদদাতাকে বলেছিলেন, যাঁরা অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেবেন, তাঁদের মাথা কেটে বর্শায় ঝোলানো হবে।

কথাটা হয় পরিহাস করে বলা, নয়তো নিজ দলের সিনেটরদের প্রেসিডেন্টের বিপক্ষে ভোট না দেওয়ার জন্য হুঁশিয়ারি। সে হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ইউটাহ থেকে নির্বাচিত সিনেটর মিট রমনি ট্রাম্পকে অপসারণের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, সব প্রমাণপত্র দেখার পর তাঁর নিজের মনে কোনো সন্দেহ নেই, ট্রাম্প ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। এই অপরাধে তাঁকে অপসারণের পক্ষে তিনি। ঈশ্বরের নামে দায়িত্ব পালনের যে শপথ তিনি নিয়েছেন, তার খেলাপ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না।

সব ডেমোক্রেটিক সিনেটর ও ওই এক মিট রমনির ভোট অপসারণের পক্ষে পড়লেও বাকি সব রিপাবলিকান ভোট দিলেন বিপক্ষে। ফলে জিত হলো ট্রাম্পের, ক্ষমতায় রয়ে গেলেন তিনি। ফলাফল যে এই হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ ছিল না, কারণ সিনেটে রিপাবলিকানদের সংখ্যাধিক্য রয়েছে। কিন্তু তাই বলে ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দিলে কাউকে সত্যি সত্যি শূলে চড়ানো হবে, এ কথা কারও বিবেচনায় আসেনি।

মিট রমনিকে এখন নিজ বিবেক অনুযায়ী ভোট দেওয়ার মাশুল গুনতে হচ্ছে। ট্রাম্প কার্যত তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। ভোটের পরপরই তিনি রমনিকে ‘ডেমোক্র্যাটদের গোপন অস্ত্র’ নামে অভিযুক্ত করেছিলেন। ট্রাম্পের জ্যেষ্ঠ পুত্র ডন জুনিয়র দুই কদম এগিয়ে দাবি করেন, এই লোককে রিপাবলিকান পার্টি থেকে বাদ দিতে হবে। এই রোববার ইউটাহ-তে রক্ষণশীলদের এক সম্মেলনে এসে ট্রাম্প নিজে বললেন, রমনিকে তাঁর প্রয়োজন নেই, ইউটাহবাসী যেন তাঁকে এখানেই রেখে দেয়। প্রেসিডেন্ট যা বলেন, তাঁর পারিষদ বলে তার দ্বিগুণ। যে রক্ষণশীল গ্রুপের সভায় ট্রাম্প এসেছিলেন, তাতে রমনিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কেন, তার জবাবে সে গ্রুপের প্রধান বললেন, ‘আমন্ত্রণ জানাব কী, রমনি এখানে এলে তো তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের ঝামেলায় পড়তে হতো।’

ট্রাম্প শুধু নিজ দলের সদস্য রমনির বিরুদ্ধে নয়, বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধেও তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ায় একহাত দেখে নিচ্ছেন। তিনি আশা করেছিলেন, রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার সিনেটর জো ম্যানশিন অভিশংসনের বিপক্ষে ভোট দেবেন। তাহলে তিনি দাবি করতে পারতেন, রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেটিক উভয় পার্টির সমর্থনে অভিশংসন থেকে তিনি অব্যাহতি পেয়েছেন। সে লক্ষ্যে জল ঢেলে দিলেন ম্যানশিন। এতে খেপে গিয়ে ট্রাম্প ম্যানশিনের সমালোচনায় বলেছেন, ‘এই লোক শুধু ডেমোক্র্যাটদের “হাতের পুতুল”ই নয়, সে “দুর্বল ও করুণার যোগ্য”। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার জন্য আমি কত কী করেছি, সেসব কথা ম্যানশিন ভুলে বসল?’ ইউটাহর জনগণ যেমন মিট রমনিকে ঘৃণার চোখে দেখবে, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় ঠিক সে রকম অবস্থা হবে
জো ম্যানশিনের। তিনি ভর্ৎসনা করে ম্যানশিনের নাম দিয়েছেন ‘মানচকিন’, অর্থাৎ খুদে মানুষ, যদিও লম্বায় তিনি ট্রাম্পের চেয়ে কয়েক আঙুল বেশি দীর্ঘ।

বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিটি যখন এমন প্রকাশ্যে কাউকে আক্রমণ করে বসেন, তখন সে কথা হালকাভাবে নেওয়ার জো নেই। রমনি ও ম্যানশিন উভয়েই যাঁর যাঁর রাজ্য থেকে নির্বাচিত সিনেটর, ট্রাম্প চাইলেও তাঁদের সদস্যপদ কেড়ে নিতে পারেন না। কিন্তু যাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধা রয়েছে, তাঁদের তিনি এক এক করে ধরছেন ও পত্রপাঠ বিদায় করা শুরু করেছেন। তালিকার প্রথমেই রয়েছেন অভিশংসন অধিবেশনে তাঁর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দানকারী কর্নেল ভিন্ডম্যান ও রাষ্ট্রদূত গর্ডন সন্ডল্যান্ড। তিনি ইতিমধ্যেই ভিন্ডম্যান ও তাঁর যমজ ভাইকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ থেকে বহিষ্কার করেছেন। সন্ডল্যান্ডকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন। অধিকাংশ পর্যবেক্ষকই ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে ‘প্রতিশোধ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। একাধিক মধ্যপন্থী রিপাবলিকান সিনেটর ট্রাম্পের কাছে আবেদন করেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে যেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া না হয়। দৃশ্যত সে কথায় কান দেওয়ার কোনো প্রয়োজন দেখেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

রাজনীতিতে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ নতুন কোনো ব্যাপার নয়। ক্রমওয়েলের উদাহরণটি মনে করুন। সাম্প্রতিক সময়ের সেরা উদাহরণ অবশ্য রিচার্ড নিক্সন, আরেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট। কংগ্রেসে তিনিও অভিশংসনের হুমকির মুখে পড়ে একের পর এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে ক্ষমতা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। বিরুদ্ধ অবস্থানের কারণে এক রাতে তিনি নিজের অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিশেষ কৌঁসুলিকে পদচ্যুত করেছিলেন। সে সময় অনুগত নন, এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষে তিনি বুদ্ধি দিয়েছিলেন, ‘একবার যখন খাপ থেকে ছুরি বের করেছ, ফের খাপে পোরার আগে সিনা বরাবর তা ঢুকিয়ে দাও।’

ট্রাম্প যে খাপ থেকে ছোরা বের করেছেন, শিগগিরই তা খাপে ভরবেন বলে মনে হয় না। ব্যবসায়ী হিসেবে যেমন, প্রেসিডেন্ট হিসেবেও তিনি বরাবর আঘাত পেলে দ্বিগুণ শক্তিতে আঘাত করতে অভ্যস্ত। কেউ কেউ যুক্তি দেখিয়েছেন, কে চাকরিতে থাকবে, কে থাকবে না—সে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের রয়েছে। কথায় কোনো ভুল নেই, কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষটি যখন নিজের অধস্তনদের প্রতি ভিন্নমত পোষণের জন্য খাপ থেকে ছোরা বের করেন, তখন ভীত না হয়ে পারা যায় না। আমেরিকার গণতন্ত্রের একটি প্রধান ভিত্তিই হলো ভিন্নমত ধারণের অধিকার। সরকারি কর্তাদের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিন্নমত প্রকাশের জন্য এ দেশে ‘ডিসেন্ট চ্যানেল’ বা ভিন্নমত প্রকাশের সুনির্দিষ্ট পথ রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদে নিক্সন প্রশাসনের পাকিস্তান তোষণ নীতির প্রতিবাদে ঢাকায় মার্কিন কনস্যুলেটের যেসব কর্মকর্তা প্রতিবাদ করে স্টেট ডিপার্টমেন্টে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছিলেন, তা সম্ভব হয়েছিল এই ‘ডিসেন্ট চ্যানেল’ থাকার কারণে।

সরকারের অভ্যন্তরে দুর্নীতি অথবা ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকাতে আরও একটি বিধিসম্মত ব্যবস্থা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। কারও নজরে সে রকম অপব্যবহার চোখে পড়লে তিনি ‘হুইসল–ব্লোয়ার প্রোটেকশন’ আইনের অধীনে নির্ভয়ে কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে পারেন। এ জন্য তাঁকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছে, তাঁর নামটি পর্যন্ত প্রকাশ না করার বিধান রয়েছে। ট্রাম্প যে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে টেলিফোন আলাপচারিতার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, সে কথা জানা গেল শুধু একজন অজ্ঞাত ‘হুইসল–ব্লোয়ার’ বা সতর্কতাকারীর সাহসিকতার জন্য। রিপাবলিকান সমর্থকেরা তাঁর নাম প্রকাশের নানা চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্প নিজে সে দাবি তুলেছেন। তাঁর কোনো কোনো সমর্থক সে সতর্কতাকারীর নাম ফাঁস করে টুইট করেছেন, কিন্তু কোনো দায়িত্বশীল পত্রপত্রিকা তা প্রকাশ করেনি। সিনেটে অভিশংসন বিচারের সময় সিনেটর র‍্যান্ড পল হুইসল–ব্লোয়ারের নাম প্রকাশ করে একটি প্রশ্ন করেছিলেন, কিন্তু বিচারে সভাপতিত্বকারী প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস সে নাম প্রকাশে রাজি হননি।

বিপদ এখনো কাটেনি। ট্রাম্প যেভাবে প্রতিশোধ গ্রহণে আগ্রহ প্রকাশ করছেন, তাতে মনে হয় যেকোনো সময় তিনি নিজেই সে হুইসল–ব্লোয়ারের নাম উল্লেখ করে তাঁর চার কোটি টুইট অনুসারীদের জানিয়ে দেবেন। সে নাম প্রকাশিত হলে ওই ব্যক্তির ব্যক্তিগত নিরাপত্তা হুমকিতে পড়বে। ফলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো হুইসল–ব্লোয়ার যে এ রকম ব্যবস্থা গ্রহণে নিরুৎসাহী হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এতে ট্রাম্পের লাভ হলেও ক্ষতি হবে মার্কিন গণতন্ত্রের।

আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন মনে করতেন, যাঁরা সরকারের সমালোচক, তাঁদের কঠোর হাতে দমন করা উচিত। তাঁর সে কথা শুনে জেমস ম্যাডিসন (ওয়াশিংটনের সহযোদ্ধা ও দেশের চতুর্থ প্রেসিডেন্ট) বলেছিলেন, ‘আমরা যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চাই, তাতে সমালোচকদের দমন করার দায়িত্ব সরকারের নয়। বরং সরকারের বাড়াবাড়িকে নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব দেশের জনগণের।’

এই সহজ কথাটা হয়তো আজকের আমেরিকার ক্ষমতাসীনদের নতুন করে মনে করিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।

হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন