গত ২৫ এপ্রিল প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, মধুপুর বনাঞ্চলের দোখলা ও চুনিয়া গ্রামের মাঝামাঝি এলাকায় আমতলী বাইদ নামক স্থানে ৪৫ বিঘা জমি আছে। এ জমি ১৩ জন গারো জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বংশপরম্পরায় চাষাবাদ করে আসছেন। ওই বাইদ এলাকার ৪ একর জমির মধ্যে লেক খননের উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। কিন্তু ওই জমির মালিকেরা সেখানে লেক খনন করতে সম্মত হননি। এ নিয়ে বন বিভাগ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে জমির মালিকদের কয়েক দফা বৈঠকও হয়। কিন্তু বন বিভাগের দোখলা রেঞ্জ কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মীরা ওই জমিতে একটি সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘সংরক্ষিত বনাঞ্চল, সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ, উন্নয়নমূলক কাজ চলমান, আদেশক্রমে কর্তৃপক্ষ’। এ নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় স্থানীয় গারোদের মধ্যে। তাঁরা যেকোনো মূল্যে নিজেদের ভূমি রক্ষার ঘোষণা দেন।

এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ২৬ এপ্রিল বান্দরবানের লামায় জুমচাষের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল পুড়িয়ে দেয় রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানি। ৪ এপ্রিল প্রথম আলোর খবরে বলা হয়েছে, বান্দরবানের লামায় জুমচাষের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল পুড়িয়ে দেওয়ায় তিনটি পাড়ার ম্রো ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মানুষ খাদ্যসংকটে দিন কাটাচ্ছেন বলে জানা গেছে। অনেক পরিবার একবেলা খেয়ে এবং কিছু পরিবার তিন-চার দিন ধরে জঙ্গলের আলু ও লতাপাতা খেয়ে দিন যাপন করছে বলে জানিয়েছে। পাড়ার বনাঞ্চল পুড়িয়ে দেওয়ার কারণে গাছ-বাঁশ সংগ্রহ করে বিক্রি করতে না পারা এবং দিনমজুরির কাজ না থাকায় তাঁরা সংকটে পড়েছেন।

আগুন দিয়ে জুমের জমি ও বাগান পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা বংশপরম্পরায় চাষের জমিতে লেক নির্মাণের মতো ঘটনার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এতে মানুষগুলো শুধু খাদ্যসংকটে পড়ছেন না, ভূমি ও বসতি থেকে উচ্ছেদ হয়ে প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর হয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে। স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের এই জাতিসত্তাগুলোকে রাষ্ট্র ও সমাজ অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার বদলে তাদের বাদ দিয়ে দেওয়ার সমস্ত আয়োজনই চলমান।

পাহাড়ে বসবাসকারী ম্রো, ত্রিপুরা, মুরং, বমসহ বেশির ভাগ জাতিগোষ্ঠীর সিংহভাগ মানুষই শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ফলে কৃষি ও শিকারের মতো ঐতিহ্যবাহী পেশার বাইরে তাঁরা অন্য কোনো পেশায় সম্পৃক্ত হতে পারেন না। জীবনধারণের জন্য তাঁদের জুমচাষ, বন থেকে গাছ-বাঁশ সংগ্রহ করে বিক্রি ও দিনমজুরির ওপর নির্ভর করতে হয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামে লোকসংখ্যা বেড়ে যাওয়া (এর একটি বড় কারণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সমতলের বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর পুনর্বাসন), পাহাড় ও বনাঞ্চলগুলো নির্বিচার বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রভাবশালীদের কাছে লিজ দেওয়া, পর্যটনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প (পাহাড়িদের অন্তর্ভুক্ত না করেই) নেওয়ার ফলে প্রাকৃতিকভাবে জুমচাষের জমির পরিমাণ ক্রমাগতভাবে কমে আসছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রীষ্ম মৌসুমে পাহাড়ের অনেক এলাকায় এমনিতেই খাদ্যসংকট দেখা দিচ্ছে। এর ওপরে যখন জুমভূমি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন তাদের দুর্দশার পরিসীমা থাকে না।

রাবার কোম্পানির আগুনে শুধু ৩৫০ একর প্রাকৃতিক বনাঞ্চল ধ্বংস হয়নি। একই সঙ্গে কলাবাগান, ফলদ-বনজ বাগান, ধানের খেতও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে ম্রো ও ত্রিপুরাদের তিনটি পাড়ার মানুষের জীবন-জীবিকার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

আগুন দিয়ে জুমের জমি ও বাগান পুড়িয়ে দেওয়া কিংবা বংশপরম্পরায় চাষের জমিতে লেক নির্মাণের মতো ঘটনার প্রভাব সুদূরপ্রসারী। এতে মানুষগুলো শুধু খাদ্যসংকটে পড়ছেন না, ভূমি ও বসতি থেকে উচ্ছেদ হয়ে প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর হয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে। স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের এই জাতিসত্তাগুলোকে রাষ্ট্র ও সমাজ অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার বদলে তাদের বাদ দিয়ে দেওয়ার সমস্ত আয়োজনই চলমান। তিনটি গ্রামের জুমভূমিতে আগুন দেওয়ার এক সপ্তাহ পরও সরকারি সহায়তা তাদের কাছে পৌঁছেনি। অথচ তাঁদের অনেককেই জঙ্গলের লতাপাতা খেয়ে জীবনধারণ করতে হচ্ছে। এর চেয়ে বড় বেদনার, লজ্জার আর অবহেলার বিষয় কী হতে পারে?

অবশ্য সংখ্যালঘুদের প্রান্তিক করে ফেলার নীতি বেশ পুরোনো, পাকিস্তান আমল থেকেই চলছে। ১৯৬০-এর দশকে কৃত্রিম কাপ্তাই লেক তৈরির মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়েছিল। সেই বিদ্যুতে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো আলোকিত হলেও এর বিপরীতে রয়েছে অন্ধকারের এক অধ্যায়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মহা বঞ্চনা আর দীর্ঘশ্বাসের ইতিহাস সেটা। গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তিবাহিনী, জিয়া হত্যা ও মনজুর খুন’ বইয়ে সেই আখ্যানকে তুলে ধরেছেন: ‘কাপ্তাই বাঁধ তৈরির ফলে কর্ণফুলী নদীর অববাহিকায় বাঁধের উজানে ৪০৭ বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল হ্রদ তৈরি হলো। এর নাম কাপ্তাই লেক। এর ফলে প্রায় ৫০ হাজার একর বসতি ও চাষের জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। ডুবে যাওয়া জমি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামে চাষযোগ্য মোট জমির ৪০ শতাংশ। ভিটেমাটি হারায় ১০ হাজার পরিবার। তাদের ৯০ শতাংশই চাকমা। যেহেতু তাদের পুনর্বাসনের জন্য পর্যাপ্ত চাষযোগ্য জমি ছিল না, প্রায় ৪০ হাজার চাকমা ভারতে চলে যায়। ভারত তাদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করেনি।

পাকিস্তান সরকার জমির ক্ষতিপূরণ ও ভিটেহারা মানুষের পুনর্বাসনের জন্য ২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। বাস্তবে খরচ করা হয় মাত্র সোয়া কোটি টাকা। অনেক বছর পর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৯ শতাংশ অপর্যাপ্ত সরকারি সাহায্যের অভিযোগ করেছে এবং ৯৩ শতাংশ লোক বলেছে যে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা আগের চেয়ে খারাপ হয়েছে। পাহাড়িদের অভিযোগের ব্যাপারে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মন্তব্য ছিল, ‘ওদের পেছনে টাকা অপচয় করার চেয়ে বরং ওদের ঘাস খেতে দেওয়া উচিত।’

পাহাড় কিংবা সমতলের সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে প্রান্তিক করে দেওয়ার এই নীতি থেকে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ বেরিয়ে আসতে পেরেছে কি? বান্দরবানের লামায় পাহাড়িদের জুমের খেতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন (সিএইচটি কমিশন)। এক বিবৃতিতে তারা বলেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে আগুন দেওয়াসহ চলমান নানা ধরনের সহিংস তৎপরতা এবং ভূমি দখলের ঘটনায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পাহাড়িদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা দিতে ক্রমাগতভাবে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার।

পাহাড় ও সমতলের সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব সরকার ও রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। জীবনধারণের প্রধান অবলম্বন ভূমি থেকে তাঁদের যেন উচ্ছেদ করা না হয়, সেই নীতি ও পদক্ষেপ নিতে হবে। বাদ দেওয়া বা প্রান্তিক করে দেওয়া নয়, সংখ্যালঘু জাতিসত্তাগুলোকে তাঁদের সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতাসহ সমাজ ও রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে হবে।

  • মনোজ দে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক। ই–মেইল: [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন