default-image

জো বাইডেন ইতিমধ্যেই পরিষ্কার করেছেন, তাঁর প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে কূটনীতি। বাইডেন বলেছেন, তাঁর সরকার যত দ্রুত সম্ভব যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরিয়ে নেবে; ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটোর সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি করে গেছে, তা আবার ঠিক করে ফেলা হবে এবং ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে আবার ফিরে যাওয়া হবে। বাইডেন আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করতে তিনি একটি ‘গণতন্ত্র সম্মেলন’-এর আয়োজন করবেন। গত মার্চে ফরেন অ্যাফেয়ার্স পত্রিকায় তিনি লিখেছিলেন, ‘কূটনীতিই আমেরিকার শক্তির মূল অস্ত্র হওয়া উচিত।’

গত চার বছরে ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বব্যবস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে বিযুক্ত করেছে, তাতে বাইডেনের এসব চুক্তিতে ফিরে আসা এবং মিত্রদের সঙ্গে আবার সম্পর্ক ঝালাই করার উদ্যোগকে স্বাগত জানানো উচিত।

বিজ্ঞাপন

এ কথা হয়তো সবাই মেনে নেবে, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বা ‘আগে আমেরিকার স্বার্থ’ভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি দেশটিকে কার্যত বিশ্ব থেকে অনেকটাই দূরে সরিয়ে এনেছে; যা মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, পরমাণু অস্ত্র বিস্তার, গণতন্ত্রের পিছু হটা এবং বাণিজ্যিক ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলার মতো বহু বৈশ্বিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ কারণেই বাইডেন প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর জোর দিতে চেয়েছেন।

তবে এই পদক্ষেপের শুরুতেই বাইডেনকে ভাবতে হবে, আসলে প্রতিরক্ষা বলতে কী বোঝায় এবং সেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আসলে কার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। সাধারণভাবে রাজনীতিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা যে সংজ্ঞা দিয়ে থাকেন, তাতে প্রতিরক্ষার পরিসরকে সংকীর্ণ করে দেখা হয়ে থাকে। তাঁদের সংজ্ঞা অনুযায়ী প্রতিরক্ষা বলতে একটি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমা ঠিক রাখা এবং দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থাকে নির্দেশ করে। এই সংজ্ঞায় স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার ওপর আলোকপাত করা হয়ে থাকে।

কিন্তু প্রকৃত জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হয়, যখন একটি দেশের মানুষ তাদের প্রাত্যহিক জীবনে রোগ-বালাই, মহামারি, সহিংসতা, দুর্ভিক্ষ, বন্যা বা এই ধরনের দুর্যোগের হুমকি থেকে থেকে রক্ষা পায়।

রাজনৈতিক সহিংসতা আমেরিকানদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ইতিমধ্যেই দেখা গেছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবাদীদের হামলায় যত লোক আমেরিকায় নিহত হয়েছে, বিশ্বে তার চেয়ে বেশি লোক নিহত হয়েছে দক্ষিণপন্থীদের সন্ত্রাসের কারণে।

বাস্তবতা হলো, একটি দেশের সবচেয়ে অরক্ষিত জনগোষ্ঠী এই ধরনের প্রকৃতিগত ও মনুষ্যসৃষ্ট নিরাপত্তাঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি পড়ে দেশটির নিরাপত্তা নীতির কারণে, দুর্যোগ বা দুর্ভাগ্যের কারণে নয়। একটি দেশের জাতীয় প্রতিরক্ষা কিংবা নিরাপত্তা নীতির ভুলের কারণে মহামারির মতো দুর্যোগ শুধু সেই দেশটিতে নয়, বরং তা অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। এ কারণে জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি শুধু একটি দেশের বিষয় নয়, বরং তা একটি বৈশ্বিক বিষয়।

সেই হিসেবে কূটনীতি আগে ঘর থেকে শুরু করতে হয়। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, মহামারি যদি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকিতে ফেলে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়নে আরও বরাদ্দ বাড়াতে হবে এবং পরবর্তীকালে করোনাভাইরাসের মতো যাতে আরও কোনো বিধ্বংসী ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়াতে না পারে, সে জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় করতে হবে।

রাজনৈতিক সহিংসতা আমেরিকানদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ইতিমধ্যেই দেখা গেছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবাদীদের হামলায় যত লোক আমেরিকায় নিহত হয়েছে, বিশ্বে তার চেয়ে বেশি লোক নিহত হয়েছে দক্ষিণপন্থীদের সন্ত্রাসের কারণে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রকে এই দক্ষিণপন্থী সন্ত্রাসীদের ঠেকাতে দেশের ভেতরে ও বাইরে আরও তৎপর হতে হবে। এ ছাড়া ভোট ব্যবস্থার মতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠনে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে এবং বাইরের যেসব দেশে গণতন্ত্র হুমকির ভেতরে পড়ছে, সেসব দেশের গণতন্ত্রের পাশে দাঁড়াতে হবে।

বিজ্ঞাপন

একইভাবে যদি দেখা যায়, আমেরিকার কিছু লোক অন্য সবার মতো ইন্টারনেট সুবিধা পাচ্ছেন না এবং সে কারণে তাঁরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাহলে সরকারের উচিত হবে ডিজিটাল কানেকটিভিটি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া। একই সময়ে বিশ্বের বাকি সবখানে ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়ার জন যুক্তরাষ্ট্রের অন্য সরকার ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে দাঁড়ানো উচিত।

বাইডেন প্রশাসনের প্রথম কাজ হওয়া উচিত হবে পররাষ্ট্র দপ্তরে বড় ধরনের সংস্কার আনা। বাইডেন যদি বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আদান–প্রদান বাড়ান, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাকি বিশ্বের যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত অপসৃত হবে।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

অ্যান মারি স্লটার: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের নীতি পরিকল্পনা বিভাগের সাবেক পরিচালক

আলেকসান্দ্রা স্টার্ক: বেসরকারি সংস্থা নিউ আমেরিকার জ্যেষ্ঠ গবেষক

মন্তব্য করুন