default-image

এ বছরের ডিসেম্বরে প্যারিসে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলনে একটি বৈশ্বিক মতৈক্য হওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। এই আশাবাদের সঙ্গে কয়লাকে যত দ্রুত সম্ভব জ্বালানির খাতা থেকে ক্রমেই বাদ দেওয়ার লক্ষ্যে সচেতনতাও সৃষ্টি হচ্ছে। ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার চিন্তাও ক্রমেই গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে।
এর প্রথম দিককার প্রবক্তারা ইতিমধ্যে নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়, পেনশন ফান্ড, গির্জা, ব্যাংক এমনকি রকফেলার তেল সাম্রাজ্যের উত্তরসূরিরা জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পদ থেকে তাঁদের বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম দ্রুত কমতে থাকায় এই সুযোগটি ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
এসব সত্ত্বেও একটি ক্ষেত্র এখনো পৃথক অবস্থান বজায় রেখেছে। কয়লাশিল্প বৈশ্বিক পরিসরে পরিবেশ দূষণ করেও মুনাফার জন্য লড়ছে। আর তারা বিকৃতভাবে দাবি করছে, জ্বালানির দুরবস্থা দূর করতে কয়লা খুবই প্রয়োজনীয়, এর মধ্য দিয়ে তারা নৈতিক অবস্থানও বজায় রাখতে চাইছে।
কয়লা কোম্পানি ও এদের দোসররা বলছে, কয়লা উৎপাদন সীমিত করা হলে দরিদ্র দেশগুলো অন্ধকারে ডুবে যাবে। কারণ, এর ফলে তারা সস্তায় বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে পারবে না। কয়লা কোম্পানির একজন দোসর অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট বলেছেন, ‘কয়লাকে দানব না বানাই।’ কয়লা মানবতার জন্য উপকারী। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে সন্দিহান চিন্তক-প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ওয়ার্মিং পলিসি ফাউন্ডেশনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে যুক্তরাজ্যের সাবেক জ্বালানিসচিব ওয়েন পিটারসন জলবায়ু পরিবর্তনের বিরোধিতাকারী কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাঁদের হাত আফ্রিকার রক্তে রঞ্জিত।
সমালোচকদের কণ্ঠ রোধ করার আক্রমণাত্মক অভীপ্সা আড়াল করে কয়লাশিল্প এক মিথ্যা বিকল্পের অবতারণা করেছে: কয়লা ব্যবহার বন্ধ অথবা দারিদ্র্য দূরীকরণ। ভাবখানা এমন যে কয়লা ব্যবহার বন্ধ হলে দারিদ্র্য দূরীকরণ প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু দারিদ্র্য দূরীকরণে জ্বালানির কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকলেও এ বিষয়ে পরিষ্কার থাকতে হবে যে ইতিহাসের এই পর্যায়ে কয়লা কারও জন্যই ভালো নয়।
একটা বিষয় ভেবে দেখুন: গত কয়েক মাসে ইবোলা যতটা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তার চেয়ে অনেক মারাত্মক হওয়া সত্ত্বেও কয়লা সে তুলনায় একেবারেই দৃষ্টির বাইরে রয়েছে। বিষাক্ত ফ্লাই-অ্যাশের কারণে প্রতিবছর আট লাখ মানুষ মারা যায়। আরও কয়েক মিলিয়ন মানুষ অসুস্থ হয়। চীনের রাজধানী বেইজিং শহর কুয়াশা ও ধোঁয়ার মিশ্রণে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। এ বিষয়টি এখন ‘এয়ারপোক্যালিপস’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। পরিবেশের ওপর কয়লার কী প্রভাব পড়তে পারে, এটা তার গুরুতর লক্ষণ। ভারতীয় অনেক শহরের অবস্থা বেইজিংয়ের মতোই, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও খারাপ।
জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এর কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দরিদ্র দেশগুলোর ৪০০ মিলিয়ন মানুষ খাবার ও পানির মারাত্মক সংকটে পড়তে পারে।
কয়লাশিল্প উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঘাড়ে বোঝা চাপাতে চাইছে। কয়লাশিল্প সেসব দেশে যে উন্নয়ন মডেল চাপিয়ে দিতে চাইছে, তা টেকসই নয়। যে মডেলের কারণে দুনিয়া জলবায়ু বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে গেছে। ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ এ বিষয়ে বারবার সতর্ক করছে। আর মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর দূরবর্তী কোনো হুমকি নয়। জীবাশ্ম জ্বালানি দহনের ভয়াবহ পরিণতির কথা আমরা জানি। স্বাভাবিকভাবেই দুনিয়ার সবচেয়ে দরিদ্র মানুষ এর শিকার হচ্ছে।
অধিকাংশ মানুষই মনে করে কয়লা খুবই নোংরা ব্যাপার। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের নিজের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জলবায়ুর জন্য কয়লা পরিত্যাগ করা উচিত। সে কারণেই কয়লাশিল্প নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় চেষ্টা করছে, যদিও কয়লার দিন শেষ হয়ে এসেছে।
দুনিয়াকে এখন বাজে জ্বালানি থেকে দ্রুত সরে আসতে হবে, এই সরে আসার প্রক্রিয়ার মধ্যে আবার ন্যায্যতাও থাকতে হবে। এর মানে হচ্ছে, উন্নত অর্থনীতিকে বর্জ্যমুক্ত করা ও যে শিল্প আমাদের সামষ্টিক স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের জন্য খারাপ, তার ব্যাপক বিস্তার রোধ করা। এর আরও অর্থ হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আধুনিক ও পরিষ্কার জ্বালানির উৎসের দিকে ধাবিত করা, যাতে স্থানীয়ভাবে সস্তায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। আর তাদের জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারে বাধ্য না করা।
সর্বোপরি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উপদেশ দেওয়া বন্ধ করে আমাদের উচিত হচ্ছে, তারা কী চায়, সেটা শোনা। আর তাদের চাহিদা হচ্ছে বিশুদ্ধ ও সস্তা বিদ্যুৎ। যে বিদ্যুৎ তাদের বর্তমানকে আলোকিত করবে, ভবিষ্যতের ক্ষতি না করেই।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
রাজা জয়রমন: হিন্দু কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়ার ভাইস চেয়ারম্যান।
জোনাথন কেরেন-ব্ল্যাক: জুশ ইকোলজিক্যাল কোয়ালিশনের প্রতিষ্ঠাতা।
থিয়া ওরমেরদ: অস্ট্রেলিয়ান রিলিজিয়াস রেসপন্স টু ক্লাইমেট চেঞ্জের প্রেসিডেন্ট।
স্টিফেন পিকার্ড: চার্লস স্টার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ক্রিশ্চিয়ানিটি অ্যান্ড কালচারের নির্বাহী পরিচালক।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন