বিজ্ঞাপন

২০১৮ সালের নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হওয়ার পরও কেন এ পরিস্থিতির উদ্ভব হলো? কেন সেখানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এল না? যাঁরা নেপালের রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা বলেছেন, নেপালের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পেছনে চীন ও ভারতের ‘হাত’ আছে। কোন ‘হাত’ কখন সবল হয় বলা কঠিন। ভূমিবেষ্টিত নেপাল অর্থনৈতিকভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। আবার নেপালের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থদাতা চীন।

২০১৯ সালের নভেম্বরে নেপাল সফরকালে দেশটির মন্ত্রী ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা জানিয়েছিলেন, আমরা দুই দেশেরই সহযোগিতা চাই। নেপালের সাংবাদিক মহলে এ কথা চালু আছে যে ওলির ক্ষমতারোহণ ও দুই কমিউনিস্ট পার্টির একীভূত হওয়ার পেছনে চীনের ইন্ধন ছিল। এটি ভারতের নীতিনির্ধারকেরা ভালো চোখে দেখেনি। এরপরই সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবিতে ভারত সীমান্তবর্তী অঞ্চলে মদেশীয়দের জোরদার আন্দোলন শুরু হয়। নেপাল সরকার যে নতুন মানচিত্র প্রকাশ করে, তাতে ভারতের ভেতরে থাকা বেশ কিছু এলাকা তাদের বলে দাবি করা হয়। এর জবাবে নয়াদিল্লি তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। প্রধানমন্ত্রী ওলি ঘোষণা করেন, ভারতের সঙ্গে কোনো সমস্যা থাকলে আলোচনার মাধ্যমেই তা সমাধান করা হবে। করোনার কঠিন সময়েও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লিতে গিয়েছিলেন দ্বিপক্ষীয় নানা বিষয়ে আলোচনা করতে। নেপালের সাংবাদিক বন্ধুরা জানিয়েছেন, প্রথম দিকে চীনের প্রতি ওলির পক্ষপাত থাকলেও পরে তিনি ভারতের আস্থা লাভের চেষ্টা করেন।

ওলির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেস নেতা শের বাহাদুর দেউবা, যিনি মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছেন, ভারতের কংগ্রেসের সঙ্গে বরাবরই সুসম্পর্ক রেখে চলতেন। অন্যদিকে নেপালে হিন্দুত্ববাদের প্রসার ঘটাতে বিজেপি ওলির সঙ্গে ‘রাজনৈতিক সম্পর্ক’ গড়ে তোলে।

নেপালের রাজনৈতিক পালাবদল সম্পর্কে বেশ কয়েকজন কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পণ্ডিতের সঙ্গে কথা বলি। তাঁরা মনে করেন, এর পেছনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে ভূরাজনীতির প্রভাব আছে। আর সেটি কেবল চীন ও ভারতের মধ্যে সীমিত নয়। চীনের অন্যতম প্রতিবেশী নেপালের প্রতি নজর আছে আমেরিকারও। আফগানিস্তান থেকে আমেরিকান সেনা চলে যাওয়ার পর ওয়াশিংটনের দক্ষিণ এশীয় নীতি যে পুনর্বিন্যস্ত হবে, সেটাই স্বাভাবিক। দিল্লি ও ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে নেপালে নতুন প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়েছে।

আর এ পালাবদলে অভ্যন্তরীণ কারণ হলো উন্নয়নশীল দেশে রাজনীতিকেরা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যতটা গণতান্ত্রিক থাকেন, ক্ষমতায় গেলে তাঁদের আচরণে বিপরীতটাই প্রতিফলিত হয়। যেসব রাজনৈতিক দল একক নেতৃত্বে চলে, সেসব দলে সমস্যা হয় না। তাঁর কথাই আইন। কিন্তু যেসব দলে একাধিক বড় নেতা থাকেন, সেসব দলে একক কর্তৃত্ব মেনে নেওয়া এবং মানিয়ে নেওয়া কঠিন। নির্বাচনের আগে সমঝোতা হয়েছিল মেয়াদের প্রথমার্ধে ওলি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, দ্বিতীয়ার্ধে প্রচণ্ডকে ক্ষমতা দেওয়া হবে। যদিও ওলি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর কোনোভাবে চাননি প্রচণ্ড বা অন্য কেউ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ না করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরকেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু করেন তিনি। রাষ্ট্রীয় সব গোয়েন্দা সংস্থাকেও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়; যাতে বিরোধী দলের পাশাপাশি ‘সহযোগী কমরেডদের’ ওপরও কড়া নজর রাখা যায়।

যাঁরা নেপালের রাজনীতির খোঁজখবর রাখেন, তাঁরা বলেছেন, নেপালের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পেছনে চীন ও ভারতের ‘হাত’ আছে। কোন ‘হাত’ কখন সবল হয় বলা কঠিন। ভূমিবেষ্টিত নেপাল অর্থনৈতিকভাবে ভারতের ওপর নির্ভরশীল। আবার নেপালের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থদাতা চীন।

এ অবস্থায় দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিদ্রোহ করেন এবং ওলির বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অনাস্থা প্রস্তাব আনা হলে তিনি হেরে যান। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ওলি গত ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট বিদ্যাদেবী ভান্ডারীকে দিয়ে প্রথমবার পার্লামেন্ট ভেঙে দেন। সেবার অবশ্য বিরোধীরা নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে পারেনি। ফলে অন্তর্বর্তী সময়ে ওলিই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা এ আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে গেলে সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্টের আদেশকে অবৈধ ঘোষণা করেন। স্বাভাবিকভাবে পার্লামেন্ট পুনর্বহাল হয়। কয়েক মাস রাজনৈতিক ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যে যাওয়ার পর ওলি মে মাসে পার্লামেন্ট ভেঙে দেন এবং আগাম নভেম্বর-ডিসেম্বরে নতুন নির্বাচন হবে বলে ঘোষণা দেন। এবারও প্রেসিডেন্ট তাঁকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে বলেন। নিজের ক্ষমতা প্রলম্বিত করার জন্যই বারবার পার্লামেন্ট ভাঙা ও নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট বিদ্যাদেবীও সংবিধান অনুসরণ করেছেন বলা যাবে না।

এ অবস্থায় বিরোধী দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী নেতারা প্রেসিডেন্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আদালতে যান এবং তাঁরা বিরোধী দলের নেতা দেউবার পক্ষে ২৭৫ সদস্যের পার্লামেন্টে ১৪৬ জন সদস্যের সইসহ পার্লামেন্ট পুনর্বহালের আবেদন জানান। সুপ্রিম কোর্টের ছয় সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ ১১ জুলাই পার্লামেন্ট পুনর্বহালের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী থেকে ওলির পদত্যাগ এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেউবাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ানোর নির্দেশ দেন। আইনজ্ঞদের মতে, এখানে সুপ্রিম কোর্ট অন্যায় কিছু করেননি বরং রাজনৈতিক নেতৃত্বের স্বেচ্ছাচারিতা রহিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাঁদের মতে, যদি এটি বিচারিক অভ্যুত্থান বা জুডিশিয়াল ক্যুও হয়ে থাকে, তার জন্য দায়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের অতিশয় ক্ষমতালিপ্সা।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া নেপালি কংগ্রেসের নেতা দেউবার সামনে এখন তিনটি চ্যালেঞ্জ। করোনা সংক্রমণে বিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি সচল রাখা এবং জনগণের মৌলিক চাহিদা মেটানো। কাঠমান্ডু পোস্ট-এ একটি সচিত্র খবর দেখলাম, সেখানেও প্রবাসী শ্রমিকেরা টিকার জন্য বিক্ষোভ করছেন। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়েছেন। নেপাল আমাদের চেয়ে বুদ্ধিমান বলে প্রথম থেকেই ভারত ও চীন থেকে টিকা কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, পার্লামেন্টে নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করা। নেপাল ও ভারতের গণমাধ্যমে যেসব খবর বের হয়েছে, তাতে ধারণা করা যায় এ যাত্রা দেউবা উতরে যাবেন। কিন্তু এর চেয়েও তাঁকে যে কঠিন চ্যালেঞ্জটির মুখোমুখি হতে হবে, তা হলো ওলির ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া, দল ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতান্ত্রিক রীতি অনুসরণ করা। বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে তাঁকে সীমান্তসংলগ্ন দুই বৃহৎ প্রতিবেশী চীন ও ভারত উভয়ের সঙ্গেই সদ্ভাব রাখতে হবে; কোনো দিকে ঝুঁকে পড়লে চলবে না।

একটি বিষয়ে নেপালের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সাধুবাদ জানাতেই হয়। যেখানে উপমহাদেশের বৃহত্তম সেক্যুলার রাষ্ট্র ভারত ধর্মবাদী জিকির তুলেছে, মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে একদা ঘোষিত হিন্দুরাষ্ট্র নেপাল সেক্যুলার চরিত্র বজায় রেখে চলেছে রাজনৈতিক ঝোড়ো হাওয়া সত্ত্বেও।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন