default-image

চলমান করোনা পরিস্থিতিতে একটি বৈশ্বিক যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধটির রূপরেখা সামগ্রিক। যুদ্ধ চলছে নিজ দেশে, অঞ্চলে এবং দেশের সঙ্গে দেশের, যা অনেকটা গৃহযুদ্ধ এবং বিশ্বযুদ্ধের মতো। চীনে সংক্রমণের পর এবং পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশে ছড়িয়ে যাওয়ার ভেতর দিয়ে এই যুদ্ধের শুরু। প্রতিটি দেশ সংক্রমণ প্রতিরোধে নিজস্ব ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। বিশ্ব স্বাস্থ্যের বড় কারিগরেরা অঞ্চলভেদে প্রতিরোধের সাজসরঞ্জাম এবং পদ্ধতি বাতলে দিয়েছিলেন। প্রতিটি দেশের প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ায় সেই রণকৌশল দেশভেদে নতুন করে সংস্কার করতে হয়েছিল। এই সংস্কারে যে দেশ যতটুকু সফল, ঠিক ততটুকুই তারা করোনা প্রতিরোধে সফল। সেই সফলতার গল্প আমরা শুনেছি। চীন, হংকং, কোরিয়া, জার্মানি ও ইতালির মতো দেশগুলো প্রাথমিক ধাক্কা সামলে সংক্রমণ শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছিল। কিন্তু এখানেই তাদের যুদ্ধ থেমে থাকেনি।

সংক্রমণের দ্বিতীয় ধাপ বা সেকেন্ড ওয়েভে তাদের যুদ্ধ আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রসহ অধিকাংশ দেশের অবস্থা কিছুটা নাজুক। কারণ সংক্রমণের প্রথম ধাপেই দেশগুলো এখনো রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক নিয়োজিত জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির অভিক্ষেপ অনুযায়ী সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশে সংক্রমণ নিম্নগামী হওয়ার কথা। কিন্তু সেই লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। সংক্রমণ কিছুটা কমলেও মৃত্যুর সংখ্যা একদিন কমছে তো আরেক দিন বাড়ছে। মানুষ কোভিড হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। শেষ মুহূর্তে চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে দ্বারস্থ হওয়ায় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। পাশাপাশি, মানুষ টেস্টের প্রতিও আগ্রহ হারাচ্ছে। করোনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে চলমান যুদ্ধ এখনো প্রাথমিক স্তরই অতিক্রম করতে পারেনি। কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছে আরও বড় কিছু যুদ্ধ।

বিজ্ঞাপন

মাঝখানে, কোভিড-১৯ চিকিৎসায় ওষুধের ভিন্নতা, ব্যবহার, কার্যকারিতা এবং উৎপাদনের ওপর একটি প্রায় ভূ-রাজনৈতিক যুদ্ধ হয়ে গেছে। আজকে একটি ওষুধের নাম এসেছে, ঠিক কদিন পরই সেটি আবার বাতিল হয়ে গেছে। আবার একটি নতুন ওষুধের নাম এসেছে, কিছুদিন চলেছে, আবার বাতিল হয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ বুঝে কিংবা না বুঝে ওষুধ মজুত করেছি, সেবন করেছি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের হার অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়েছে। এটা করোনা মহামারির চাইতে বড় সমস্যা হয়ে পুরো চিকিৎসাজগৎকে উল্টে-পাল্টে দিতে পারে। প্রতিরোধী জীবাণু মোকাবিলায় শুরু হবে আরও বড় যুদ্ধ। পাশাপাশি যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্সসহ জনস্বাস্থ্যের লোকবল। বুক চিতিয়ে সামনে থেকে যুদ্ধ করে চলছেন তাঁরা। এই যুদ্ধ মোকাবিলায় অন্যতম সরঞ্জাম হলো ঢাল হিসেবে পিপিই, জীবন রক্ষাকারী হিসেবে ভেন্টিলেটর, আইসিইউ বেড, আইসোলেশন সেন্টার প্রভৃতি। অপ্রতুলতার ভেতর এ যুদ্ধ চলেছে। এরপর করোনা মেনে নিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক করে শুরু হলো নতুন যুদ্ধ। কিন্তু এই অদৃশ্য শত্রু, জম্বির মতো প্রতিদিন গড়ে গোটা পঞ্চাশেক মানুষকে ঘায়েল করতে থাকল। করোনা মোকাবিলায় দু-একটি বিষয়ের দুর্নীতির খবর আমাদের কানে এলেও টিআইবি প্রথমবারের মতো জানাল, করোনা মোকাবিলায় এত দুর্নীতি অন্য কোনো দেশে হয়নি। এটি সরকারের চলমান দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে একটি বড় ধাক্কা। স্বাস্থ্যবিধি মানা এবং টেস্টের প্রতি মানুষের অনীহা, কোভিড হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসার জন্য না আসা, পুরো প্রতিরোধ বিষয়টাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে চলছে।

বিজ্ঞাপন

এমতাবস্থায় আমাদের ভরসার একমাত্র নাম কোভিড-১৯ টিকা। টিকা নিয়ে এত বড় কর্মযজ্ঞ, রাজনীতি ও তৎপরতা সম্ভবত পৃথিবীতে এবারই প্রথম। জানতে পেরেছি, ২০০টিরও বেশি টিকা কার্যক্রম সারা বিশ্বে চলছে; এর অনেকগুলো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে আছে। পুতিনের রাশিয়া আবার এক ধাপ এগিয়ে মানবদেহে টিকার প্রয়োগ শুরু করেছে। এত অল্প সময়ে করোনার মতো জটিল একটি ভাইরাসের টিকার সফলতা দাবি কৌতূহলোদ্দীপক। তবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য টিকা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্রিটেনের অক্সফোর্ড, চীনের সিনোভ্যাক্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এসেছে। সে যা-ই হোক, যত বেশি সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে করোনার টিকা অনুমোদিত হবে, বাংলাদেশের জন্য তা ততই মঙ্গলজনক। আমাদের সামনে আসন্ন যুদ্ধটির নাম টিকাযুদ্ধ। করোনা নিয়ে আগের যুদ্ধগুলোর লেজেগোবরে অবস্থা এই টিকাযুদ্ধের মাধ্যমে শোধরাতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সঠিক প্রয়োগ টিকা প্রাপ্তির কাজে ব্যবহার করতে হবে। সবার কাছ থেকেই যাতে চাহিদামতো টিকা পাওয়া যায়, সেই পথ খোলা রেখে রণকৌশল ঠিক করতে হবে।

টিকাযুদ্ধের অন্যতম দুটি প্রধান দিক হলো টিকা প্রাপ্তি এবং এর প্রয়োগ। এই মুহূর্তে প্রাপ্তির দিকটাই বেশি চ্যালেঞ্জিং। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো টিকার মজুত গড়ে তুলবে, এটাই স্বাভাবিক। বৈশ্বিক চাহিদা মিটিয়ে আমাদের মতো গরিব দেশে টিকা আসার ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে এখনই অভ্যন্তরীণ চাহিদা অনুযায়ী টিকা প্রাপ্তির উদ্যোগ নিতে হবে এবং মজুত গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের উপযোগিতা নিশ্চিতে আগ্রহ দেখাতে হবে এবং চুক্তি করতে হবে। দেশে যত বেশি ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হবে, আমাদের মানুষের শরীরে টিকার প্রতিক্রিয়া ততই সুস্পষ্ট হবে; আমরা ততই আমাদের জলবায়ুতে উপযোগী ও কার্যকর টিকার দিকে অগ্রসর হব।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয়ত, টিকার প্রায়োগিক কৌশল এখনই নির্ধারণ করে রাখতে হবে। ১৭ কোটি মানুষের টিকা একসঙ্গে পাওয়া সত্যিই দুরূহ হবে। সে ক্ষেত্রে সরকারের উচিত হবে আগেভাগেই অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে রাখা। বাংলাদেশে সিনোভ্যাক্সের টিকার পরীক্ষামূলক প্রয়োগের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের। এটি আশাব্যঞ্জক খবর। সারা দেশে মূল টিকার অগ্রাধিকার চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাওয়া উচিত। এরপরই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ প্রজন্মের—প্রায় ৫ কোটি শিক্ষার্থীর। কয়েক মাস ধরে তারা রয়েছে শিক্ষাঙ্গনের বাইরে। শিক্ষাকার্যক্রম নির্বিঘ্ন করার ক্ষেত্রে এর বিকল্প নেই। করোনায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বয়স্কদের অগ্রাধিকার এরপরই হওয়া উচিত। একে একে সর্বাধিক মাত্রায় সংক্রমিত এলাকাসহ জনগণের অন্যান্য অংশকে টিকাদানের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। দরিদ্র, খেটে খাওয়া মানুষকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনা মূল্যে টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি টিকাযুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে এখন থেকেই প্রয়োজনীয় জনবল গবেষণা ও প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

বিজ্ঞাপন

একটা সময় আমাদের দেশের ছোট-বড় সব মানুষের ভেতর ভ্যাকসিন ভীতি ছিল। এখন সময় পাল্টেছে, মানুষ অনেক সচেতন। তার পরও টিকা ভীতি দূর করা এবং টিকা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর এখন থেকেই জনগণকে সচেতন করতে হবে।

করোনার ছোবল থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র চেরাগ এখন টিকা। শুধু রাজঘণ্টার মতো দূরে টিকার ঘণ্টার শব্দ আমরা শুনতে পাচ্ছি। মাঝেমধ্যে অনেক কাছে আবার একটু পরেই অনেক দূরে। তারপরও টিকা নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই যুদ্ধে আমাদের জিততেই হবে।

ড. মো. তাজউদ্দিন সিকদার: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের সভাপতি এবং সহযোগী অধ্যাপক

মন্তব্য পড়ুন 0