default-image

সারা বিশ্বে গত এক দশকে যে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উত্থান হয়েছে, গত চার বছরে তার পতাকাবাহী হয়ে উঠেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। না, তাঁর মধ্য দিয়েই এ ধারার রাজনীতির সূচনা হয়নি। তাঁর উপস্থিতির আগেও এই বাস্তবতা বিশ্বে ছিল এবং এখনো আছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আবির্ভাবের আগে দেশে দেশে কট্টরপন্থী লোকরঞ্জনবাদী শাসকেরা একধরনের আন্তর্জাতিক চাপের মুখে থাকতেন, যার নেতৃত্বে থাকত যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ওভাল অফিসে ট্রাম্পের উপস্থিতি সেই চাপটিকে মুহূর্তেই হাওয়া করে দিল। ফলে কট্টর শাসকেরা একধরনের স্বস্তির শ্বাস ফেলেন। এখন ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্লটিং পেপারের দিন ফুরাতে চলেছে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উত্থান কি থেমে যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে অনেকগুলো বিষয়ের দিকে তাকাতে হবে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জো বাইডেন ভূমিধস বিজয় পাননি। বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে। উপরন্তু, ট্রাম্প অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে পুনর্নির্বাচনের দৌড়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। মার্কিন ভোটারদের ৪৭ শতাংশই তাঁর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। গত চার বছরের এত এত বিতর্কিত সিদ্ধান্ত, প্রমাণিত মিথ্যার স্রোত এবং সর্বশেষ মহামারি মোকাবিলায় ব্যর্থতা সত্ত্বেও ট্রাম্প ঠিকই বিপুলসংখ্যক ভোটারকে নিজের দিকে টানতে পেরেছেন। আরও ভালো করে বললে, ট্রাম্পের বর্ণবাদসহ বিভাজনের রাজনীতির পক্ষে ৭ কোটি ৩০ লাখের বেশি ভোটার মত দিয়েছেন। জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির ধারা যে ক্ষয়িষ্ণু নয়, তা তো এ থেকেই প্রমাণিত।

বিভিন্ন দেশে গত এক দশকে যে কট্টর জনতুষ্টিবাদের উত্থান হয়েছে, তার কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ ধরনের রাজনীতিক ও শাসকেরা বরাবরই বিভাজনের তত্ত্ব প্রচার করেন। সঙ্গে থাকে উগ্র জাতীয়তাবাদের নানা উপাদান। তাঁরা সাধারণ ভয় ও আশার এক চমৎকার সমন্বয় সামনে হাজির করেন। নাগরিকদের ভয় দেখাতে তাঁরা রাষ্ট্রীয় সীমার অখণ্ডতা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মতো বিষয়াদি হাজির করেন। আর আশার ভিত্তি হিসেবে খুঁজে বের করেন পুরোনো কোনো সুদিনকে। সেই পুরোনো মোকামে ফেরার এক দারুণ উচ্চাশা তাঁরা বেশ সচেতনভাবে নির্মাণ করেন, যেন সেখানে ফিরতে পারলেই বিদ্যমান দুর্নীতি, দৈন্য ও দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অশিক্ষা ইত্যাদির জাদুকরি সমাধান হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন
গোল বাধল ২০০৮-০৯ সময়ের অর্থনৈতিক মন্দার সময় থেকে। সে সময় থেকেই অভিবাসনবিরোধী অবস্থান থেকে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটল ইউরোপে। চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে যার পতাকাবাহী হয়ে উঠলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গোটা বিশ্বে এ ধারার রাজনীতিকদের উৎসাহিত হওয়ার জন্য আর কোনো কিছু প্রয়োজন ছিল না।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গ্রেট আমেরিকা’ পুনর্নির্মাণ তত্ত্বের সঙ্গে তুর্কি ‘সালতানাত’ বা ভারতের ‘রাম রাজত্ব’ প্রকল্পগুলো তাই মিলে যায়। এ তালিকায় আগে থেকেই হাজির ছিল ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া ও সি চিন পিংয়ের চীন। প্রতিটি ক্ষেত্রেই কথিত এসব মহাপ্রকল্পের বিরুদ্ধে একদল ‘ষড়যন্ত্রকারীকে’ হাজির করা হয়। এ শাসকদের টিকে থাকার জন্যই এই ‘ষড়যন্ত্রকারীদের’ প্রয়োজন পড়ে। এটি দুটি কাজ করে। প্রথমত, যেকোনো বিরুদ্ধতার গলা টিপে ধরার ক্ষেত্রে এই ষড়যন্ত্রের বিষয়টিকে সামনে আনা হয়। দ্বিতীয়ত, এমন কোনো শক্ত প্রতিপক্ষ না থাকলে ক্ষমতায় নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণে সম্মতি উৎপাদনটি কঠিন হয়ে পড়ে।

যুক্তরাষ্ট্রসহ পুরো ইউরোপে জনতুষ্টিবাদী কট্টর শাসকদের উত্থান হয়েছে ওই অঞ্চলে শরণার্থী স্রোত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়, তা সন্ত্রাসবাদ কতটা নির্মূল করতে পেরেছে, তা নিয়ে বিস্তর সংশয় থাকলেও এটি যে বহু রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল ও সহিংসতার আগুনে গ্রাস করতে পেরেছে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। সেই আগুন থেকে বাঁচতে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়াসহ বহু অঞ্চল থেকে লাখে লাখে লোক নিরাপদ জীবন পেতে ছুটেছে ইউরোপের দিকে। এটি তত দিন পর্যন্ত বড় দুর্ভাবনার কারণ হয়নি, যত দিন অর্থনীতির অবস্থা ভালো ছিল। ধনী দেশগুলো আশ্রয়ের দরজা খুলে দিতে পেরেছে। গোল বাধল ২০০৮-০৯ সময়ের অর্থনৈতিক মন্দার সময় থেকে।

সে সময় থেকেই অভিবাসনবিরোধী অবস্থান থেকে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটল ইউরোপে। চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে যার পতাকাবাহী হয়ে উঠলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। গোটা বিশ্বে এ ধারার রাজনীতিকদের উৎসাহিত হওয়ার জন্য আর কোনো কিছু প্রয়োজন ছিল না।

ফলে ব্রাজিলের রাষ্ট্রক্ষমতায় চলে এলেন ‘দক্ষিণের ট্রাম্প’ নামে পরিচিত জইর বলসোনারো। তুরস্কে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান তাঁর মসনদ আরও শক্তিশালী করতে পারলেন। একইভাবে এটি ভারতেও কট্টর ধারার রাজনীতিকে জ্বালানি দিল। শুধু এই দেশগুলোই নয় ফিলিপাইন, মিয়ানমার, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরিসহ বহু দেশের শাসকদের কাছেই ট্রাম্প লোকরঞ্জনবাদের নয়া পুরোহিত হিসেবে নিজের অবস্থান পোক্ত করে নিলেন। এমনকি ফ্রান্সের মতো দেশেও এখন এ ধারার শক্ত উপস্থিতি এক দুঃখজনক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ল দুর্বল গণতন্ত্রের দেশগুলোয়। সেসব দেশে গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে কট্টর শাসকেরা ক্ষমতায় বসে স্বৈরতান্ত্রিক পন্থায় দেশ চালাতে শুরু করলেন। গণমাধ্যমের গলা এমনভাবে টিপে ধরা হলো, যাতে টুঁ শব্দটি না বের হয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদায়ে এখন অনেকে আশার আলো দেখছেন। ভাবছেন, এই বুঝি জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিতে ভাটার টান লাগল। কিন্তু বাস্তবতা কি আদৌ তেমন? এমন আশা তো করোনা মহামারির শুরুর দিকে কট্টর শাসকদের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ব্যর্থতাতেও দেখা দিয়েছিল। সে সময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা শক্তিশালী এমন দেশগুলোই ভালো করছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল, সব একই সমতলে। রুশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান লেভাদা-সেন্টারের এক জরিপ বলছে, গত মে মাসে রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি জনসমর্থন রেকর্ড ৫৯ শতাংশে নেমে আসে। কিন্তু সারা বিশ্বে করোনা সংক্রমণ বাড়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুতিনও জনসমর্থন ফিরে পেতে থাকেন। ঠিক একই ধারায় বিশ্বের অন্য দেশগুলোর কট্টর শাসকেরাও আবার তাঁদের স্বর ফিরে পেলেন। এই একই অবস্থা কিন্তু এ ক্ষেত্রেও হতে পারে।

বিজ্ঞাপন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্থানকে তাই কোনো জাদুকরি নিদান হিসেবে গণ্য করা ভুল হবে। তাঁর এই প্রস্থানের মধ্য দিয়ে কট্টর লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতিকেরা একটু অস্বস্তিতে পড়লেও এটিই তাঁদের ধসিয়ে দেবে ভাবলে ভুল হবে।

হ্যাঁ, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয় বিশ্বের কট্টর শাসকদের একটু অস্বস্তিতে ফেলেছে। কিন্তু তা এখনো এত বড় নয় যে এ ধারার রাজনীতির শেষ দেখে ফেলা যায়। এ ক্ষেত্রে করোনা অনেক বড় অনুঘটক। করোনাভাইরাস মহামারি শরীর ও স্বাস্থ্যেই শুধু আটকে নেই। জীবনের এমন কোনো দিক নেই যেখানে এর প্রভাব পড়েনি। সবচেয়ে বড় প্রভাবটি পড়েছে অর্থনীতিতে। ফলে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতিকদের পক্ষে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশা দেখিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা আগের চেয়ে অনেক সহজ হয়েছে। যেসব দেশে এ ধরনের রাজনীতিকেরা শাসকের ভূমিকায় রয়েছেন, তাঁরা এই আশাকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগাচ্ছেন। আর যাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতায় নেই, তাঁরা বিদ্যমান শাসকদের ব্যর্থ হিসেবে দেখিয়ে নিজেদের সম্ভাবনাময় হিসেবে হাজির করছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্থানকে তাই কোনো জাদুকরি নিদান হিসেবে গণ্য করা ভুল হবে। তাঁর এই প্রস্থানের মধ্য দিয়ে কট্টর লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতিকেরা একটু অস্বস্তিতে পড়লেও এটিই তাঁদের ধসিয়ে দেবে ভাবলে ভুল হবে। কট্টরবাদকে হটিয়ে গণতন্ত্রকে প্রতিস্থাপিত হতে হলে গণতন্ত্রপন্থীদের সক্রিয় হওয়া ছাড়া উপায় নেই। এটি কোনো স্বয়ংক্রিয় ঢেঁকিকল নয় যে এক পাশ একটু নিম্নগামী হলে অন্য পাশটি অবধারিতভাবেই ওপরে উঠবে। কারণ, একটি দেশে বা অঞ্চলে লোকরঞ্জবাদী ধারার উত্থান এক দিনে হয় না। দীর্ঘ সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এটি ঘটে।

এ ধারার শাসকদের উত্থান আপাতদৃষ্টে যত চমৎকারীই হোক না কেন, তার বীজটি রোপিত হয় অনেক আগে। গণতন্ত্রের কাছে মানুষের চাহিদা যত ধাক্কা খায়, তত সে বেড়ে ওঠে। তারপর কোনো এক মুহূর্তকে সে বেছে নেয় চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য। এই বিজয় তাকে পরের ধাপটিতে নিয়ে যায়, যেখানে সে নিজের একচেটিয়াকরণ করে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এই যুগে নিজের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডরকে হারাল

জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি। কিন্তু এটাই সব নয়। এটি কতটা পিছু হটল বা আদৌ হটল কি না, নাকি আরও শক্তিশালী হলো, তার কিছুটা বোঝা যাবে ২০২২ সালে। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রে যেমন মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে, তেমনি ব্রাজিল, ফ্রান্স ও হাঙ্গেরিতেও হবে জাতীয় নির্বাচন। এগুলোর ফলাফলই অনেক কিছু বলে দেবে। সে পর্যন্ত গণতন্ত্রপন্থীদের এটা মনে রাখাই শ্রেয় হবে যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পতন মানেই লোকরঞ্জনবাদের পতন নয়।

ফজলুল কবির সাংবাদিক ও লেখক

মন্তব্য করুন