default-image

এই লেখা যখন লিখছি, তখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট গণনা চলছে। ভোট গণনা শেষ হলে এটি নিশ্চিত, পুনর্গণনার দাবি উঠবে এবং ভোটের ফল চ্যালেঞ্জ করে মামলা হবে। রেকর্ড পরিমাণে ভোট পড়া প্রচণ্ড প্রতিদ্বন্দ্বিতার এ নির্বাচন ঘিরে এমন ধারণা সবার মধ্যেই তৈরি হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শুধু আমেরিকান ভোটাররা ভোট দেন কিন্তু তাঁদের মতামত বিশ্বের সব মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। আমি যে মুহূর্তে এ লেখা লিখছি, তখন ভোটের ফল কী হবে, তা হয়তো নিশ্চিত করে বলার মতো সময় আসেনি। কিন্তু আশার কথা হলো যুক্তরাষ্ট্র এখনো মজবুত গণতন্ত্রের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মহামারির মধ্যেও রেকর্ডসংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভোটের ফল নিয়ম মেনেই প্রকাশ পাচ্ছে। সহিংসতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে আছে। আদালতের নির্দেশে চলা তদন্তে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে ডাক বিভাগ ভোটারদের ডাকযোগে পাঠানো ভোট প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেয়নি। মঙ্গলবার রাতে প্রেসিডেন্ট বিজয় অর্জনের ঘোষণা দিলেও তা ধোপে টেকেনি। তিনি ভোট গণনা বন্ধ রাখার আহ্বান জানালেও তা কেউ কানে তোলেননি।

তবে দুশ্চিন্তার বিষয় হলো মার্কিন ভোটাররা গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। দুই প্রার্থীর শিবিরেই প্রায় সমানসংখ্যক সমর্থক। অবাক হওয়ার কিছু নেই, এ বিভক্তি সরকারের মধ্যেও বিভক্তি টানবে।

যা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, ডেমোক্র্যাটরা হোয়াইট হাউস জয় করবেন এবং প্রতিনিধি পরিষদ দখল করবেন। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা সিনেটে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবেন। এমনকি গভর্নরশিপ এবং প্রাদেশিক সরকারও দুই পার্টিতে বিভক্ত হয়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে।

ডেমোক্র্যাটরা যে ‘নীল সুনামির’ আশা করেছিলেন, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি। প্রায় ১৬ কোটি ভোটার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে জো বাইডেন ৪০ থেকে ৫০ লাখ বেশি ভোট পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ পপুলার ভোটে তিনি ট্রাম্পের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকছেন। কিন্তু রিপাবলিকানরা সিনেটে তঁাদের আসন ধরে রেখেছেন। অনেকে ভেবেছিলেন, ডেমোক্র্যাটরা সিনেট দখল করে নেবেন। কিন্তু তা হয়নি। এমনকি প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের এক রকম পরাজয়ই হয়েছে।

এ নির্বাচনে ট্রাম্প বলা যায় ভীষণ ভালো করেছেন। ২০১৬ সালে তিনি যত ভোট পেয়েছিলেন, এ বছর তার চেয়ে ৫০ লাখ বেশি ভোট পেয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক ভোট পাওয়া প্রার্থী হলেন ট্রাম্প।

ট্রাম্প যদি হেরে যান, তারপরও তিনি শক্তিশালী কণ্ঠ হিসেবে সংবাদমাধ্যমে টিকে থাকবেন। কারণ, তাঁর প্রতি সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টি থাকবে। আগামী ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি যদি না–ও দাঁড়ান, তাহলেও রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী নির্বাচনে হয়তো তাঁর ভূমিকা থাকবে। জর্জ ডব্লিউ বুশ বা রোনাল্ড রিগ্যানের যে রিপাবলিকান পার্টি ছিল, এখন সেই রিপাবলিকান পার্টি আর নেই। ট্রাম্প থাকুন আর না থাকুন, আধুনিক আমেরিকান জনতুষ্টিবাদীদের কাছে ট্রাম্পিজম যেভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তা শক্তিশালী অবস্থানেই থেকে যাবে।

ট্রাম্প সফলভাবেই গণতন্ত্রের উর্বর মাটিকে লবণাক্ত করে দিতে পেরেছেন। তিনি কোনো ধরনের তথ্য–প্রমাণ ছাড়াই ভোট চুরির অভিযোগ তুলে নির্বাচনের ফলকে অবৈধ সাব্যস্ত করেছেন। এতে কিছু মানুষের মনে সন্দেহের বীজ বপন করে দিয়েছেন। ট্রাম্পের অনেক সমর্থক বাইডেনের প্রেসিডেন্ট পদকে বৈধ বলে মানতে রাজি হবে না।

বিজ্ঞাপন

ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার করবেন—সে সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এমনকি তাঁর উত্তরসূরির শপথ অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকবেন, এমন সম্ভাবনাও ফিকে হয়ে আসছে।

যত দিন যাচ্ছে, তত আমেরিকানরা বিভক্তির দিকে যাচ্ছেন। তাঁরা বসবাস ও ওঠাবসার জন্য সমমনা সম্প্রদায়ের এলাকা বেছে নিচ্ছেন। রক্ষণশীলেরা তাঁদের পছন্দের টেলিভিশন চ্যানেল, রেডিও স্টেশন বা পত্রিকা থেকে খবরাখবর জানছেন এবং তাঁদের অপছন্দের সংবাদমাধ্যমকে এড়িয়ে চলছেন। একই প্রবণতা ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।

শুধু আর্থিক বিষয় তাঁদের বিভক্তির মাপকাঠি হচ্ছে না। রাজনৈতিক মতাদর্শ অনুসরণের বিষয়ে আমেরিকানদের মধ্যে কট্টর পন্থা বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিষয়ে ক্রমবর্ধমানভাবে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে।

এটি সরকার পরিচালনা করাকে কঠিন করে তুলবে। বাইডেন প্রেসিডেন্ট হলে তাঁকে যেকোনো বড় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে সিনেটে রিপাবলিকানদের বাধার মুখে পড়তে হবে। সবাই মিলে কাজ করার পরিবেশ তৈরি করতে হলে বাইডেনকে রিপাবলিকানদের সঙ্গে আপস করতে হবে। সেটি আবার তাঁর নিজের দলের নেতারা মেনে নিতে পারবেন না।

ইংরেজি থেকে অনূদিত। স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

রিচার্ড এন হাস: কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের প্রেসিডেন্ট

মন্তব্য পড়ুন 0