ঠান্ডা মাথায় প্রভাব বাড়াচ্ছে আঙ্কারা

বিজ্ঞাপন
default-image

কয়েক বছর ধরে তুরস্কের ইতিবাচক পররাষ্ট্রনীতি তার প্রতিবেশী দেশগুলো অনুভব করতে পারছে। গত জুলাইয়ে নাগোরনো-কারাবাখ অঞ্চলের মালিকানা বিষয়ে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হলে আঙ্কারা আজারবাইজান সেনাদের নিয়ে একটি সামরিক মহড়া দেয়। এর মাধ্যমে তুরস্ক পরিষ্কার বার্তা দেয় যে তারা তাদের প্রতিবেশী আজারবাইজানের সঙ্গে আছে।

গত মে মাসে তুরস্কের সেনাবাহিনী লিবিয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গভর্নমেন্ট অব ন্যাশনাল অ্যাকর্ডের (জিএনএ) সহায়তায় সামরিক শক্তি নিয়োগ করে। জিএনএ সরকার রাশিয়া, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মদদপুষ্ট সামরিক কমান্ডার খলিফা হাফতারের বাহিনীকে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চল থেকে উৎখাত করার চেষ্টা করছে।

গত মাসে সিরিয়ার সরকার ইরানি সমর্থন নিয়ে ইদলিবে আসাদবিরোধীদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য যে বিশেষ অভিযান চালিয়েছিল, সিরিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপে তা বাধাগ্রস্ত হয় এবং তুরস্ক মস্কোকে ২০১৮ সালের যুদ্ধরহিত অঞ্চলবিষয়ক চুক্তি মানতে বাধ্য করে।

প্রকৃতপক্ষে, এখন তুরস্ক তার পররাষ্ট্রনীতি পশ্চিম বলকান এবং ককেশাস অঞ্চল থেকে সরিয়ে উপসাগরীয় এবং হর্ন অব আফ্রিকার দিকে নিয়ে এসেছে। তুরস্কের এই প্রবণতাকে বিশ্লেষকেরা ‘নব্য অটোমান’ অভিলাষ বলে আখ্যায়িত করছেন। তাঁরা বলছেন, আঙ্কারার সামরিক কৌশল এখন ‘নব্য-অটোমান মতাদর্শ’ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।

তবে তুরস্ক তার বাগাড়ম্বর ও প্রতীকী আকার-ইঙ্গিতের বাইরে পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে যে ধারণা দিচ্ছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে, দেশটি এ মুহূর্তে রক্ষণাত্মক নীতি বেছে নিয়েছে। দেশটি তিনটি বিষয়কে তাদের মূল নীতি হিসেবে ধরে নিয়েছে। এগুলো হলো অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ও
ভূখণ্ডের সীমানা সংহতকরণ, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ছেড়ে যাওয়া এলাকাগুলোতে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা যাতে ঘাঁটি গেড়ে না বসতে পারে, তা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানিনির্ভরতা কমানো।

কয়েক বছর আগেও তুরস্কের ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) মূলনীতি ছিল ‘প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিন্দু পরিমাণ সমস্যা থাকা চলবে না।’ তবে আরব বসন্ত শুরু হওয়া এবং ২০১১ সালে ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনী সরিয়ে আনার পর সেই আদর্শ থেকে তুরস্ক সরে এসেছে।

আঞ্চলিক যেসব এলাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে যাওয়ায় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেই শূন্যতা যাতে প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ পূরণ করতে না পারে, সে বিষয়ে তুরস্ক তৎপর হয়ে ওঠে। এ ছাড়া আলাদা রাষ্ট্রের জন্য ৪০ বছর ধরে সংগ্রাম করে আসা কুর্দি যোদ্ধারা ২০১৫ সালে তৎপরতা দেখালে তাদের বিরুদ্ধে তুরস্ক বিশেষ অভিযান শুরু করে। এ ছাড়া ২০১৬ সালে এরদোয়ানকে উৎখাতের জন্য অভ্যুত্থানচেষ্টার পর সরকার কঠোর অবস্থানে চলে যায়। ২০১৭ সালে সংবিধান সংশোধন করে প্রেসিডেন্ট হিসেবে এরদোয়ানের ক্ষমতা বাড়ানো হয়।

এরপরই এরদোয়ান নিজের শক্তিমত্তা দেখানো শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানো শুরু করেন। সম্প্রতি আয়া সোফিয়াকে জাদুঘর থেকে আবার মসজিদে রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এরদোয়ান জনগণকে বিশেষ একটি বার্তা দিয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি অটোমান সাম্রাজ্যের সোনালি অতীতকে সামনে এনেছেন এবং সেই সাম্রাজ্যের অন্তর্দর্শন অনুসরণ করে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানোর অভিলাষ প্রকাশ করেছেন। তবে তুরস্ক ধীর পথ বেছে নিয়েছে বলে মনে হয়। দেশটি আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য এগোলেও তার মধ্যে তাড়াহুড়া দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবেশীদের সঙ্গে যথাসম্ভব সদ্ভাব রেখে আঞ্চলিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ করার পক্ষে রয়েছে তুরস্ক।

আগামী ২০২৩ সালে ঐতিহাসিক লুজানে চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বহু শর্তের বেড়াজাল থেকে তুরস্ক মুক্তি পাবে। তখন তার মূল শক্তি প্রকাশ পাবে। তবে তার আগেই দেশটি প্রবল আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে চায় না।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত
মারওয়ান কাবালান: আরব সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি স্টাডিজের ডিরেক্টর অব পলিসি অ্যানালাইসিস

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন