বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বদরুদ্দীন উমরের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় বগুড়া শহরের ফুটপাতে। ১৯৯৩ সালের দিকে। শহরের সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের আড্ডাখানা এশিয়া হোটেল। এর ঠিক সামনের ফুটপাতে মাসুদ রানা, শ্রীকান্ত, দস্যু বনহুরের সঙ্গে পেয়ে গেলাম উমরের বিখ্যাত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বইটা। বইয়ের ভেতরকার সিলছাপ্পর দেখে আন্দাজ হয়েছিল, বইটা প্রথম কেনা হয় সান্তাহার রেলস্টেশনের বুকস্টল থেকে, ১৯৬৮ সালে। ১৯৬৬ সালে প্রকাশিত বইটা দুই বছরের মধ্যে চলে এসেছিল সেই দুর্গম দেশে! বাংলাদেশে মফস্বলের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক উত্থানের সময় ছিল ষাটের দশক। উমরের সংস্কৃতি ট্রিলজি দেশের অনেক ভেতরতক সেই উত্থানের সঙ্গী হয়েছিল। সংস্কৃতির সংঘাত যে গুরুতর রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে, তা আগে তিনিই দেখান। বাঙালিত্বের সঙ্গে মুসলমানত্বের বিরোধ যে বানোয়াট, বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতা বলে যাকে দাগানো হয় তা যে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার, জাতীয়তাবাদ কীভাবে জাতিকেই গ্রাস করে, জনবিচ্ছিন্ন প্রগতিশীলতা যে আসলে শ্রেণিগত পিছুটানেরই রকমফের; এসব তিনিই দেখালেন।

এই দেশে তখনো নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চা কিংবা উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের ঝকমারির আগমন হয়নি। আসছিল উমরের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের একেকটি খণ্ড। জানা হচ্ছিল, কীভাবে ঢাকাই মধ্যবিত্তের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে মফস্বলের উঠতি মধ্যবিত্ত ও খোরাকি-খাওয়া কৃষকের শ্রেণি সংগ্রাম এক লক্ষ্যে বাঁধা পড়ে গেছে। একাত্তরের জাতীয় ঐক্যের ঢালাই যে ’৪৮-’৫২-তেই শুরু হয়েছে, আন্দোলনের কর্মী উমর তা সমকালেই বুঝতে পেরেছিলেন। সমকালের মধ্যে ভবিষ্যতের রূপরেখা দেখতে পাওয়া বিরাট মনীষা আর গভীর দেশপ্রেম ছাড়া হয় না। উমরের মতো এমন দূরদর্শনের ক্ষমতা সত্যিই বিরল।

ঢাকা হয়তো মহাপুরুষ দিতে পারেনি। কিন্তু ভাষা আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িকতার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মতো বিপ্লবী আন্দোলনের ঢেউ মহাপুরুষদের চেয়েও বড় অবদান রেখে গেছে। একটি জাতি ও তার রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। একেকটি আন্দোলন জনগণের চেতনা ও জীবনে যে গতিবেগ এনেছিল, কলকাতা কসমোপলিটনের কোনো মহাপুরুষের পক্ষে তা সম্ভব হতো না। বাংলাদেশ মহাপুরুষের প্রতি ভক্তিভাব দিয়ে নয়, ভক্তির বিরুদ্ধে স্বাধিকারের চেতনায় ঘটিয়েছে তার নিজস্ব রেনেসাঁ। বদরুদ্দীন উমর আমাদের সেই ষাটের রেনেসাঁর পুরোধা সন্তান। উনিশ শতকে কলকাতা যে ধরনের স্বাধীন মনীষা জন্ম দিতে গিয়েও পারেনি, স্বাধীন বাংলাদেশে উমর সেটাই করে গেছেন।

বদরুদ্দীন উমরের এক জীবনের গবেষণা ও লেখালেখি কয়েক জীবনের সমান। উমর তাঁর কাজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অনেক ধারণা ও চিন্তাকে ঝাঁকি দিয়েছিলেন। উনিশ শতকের কলকাত্তাই রেনেসাঁ ও তার মহাপুরুষদের নিয়ে মোহ কাটানোয় ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাংলার কৃষক’ এবং ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালি সমাজ’ বই দুটি এখনো দিশারি। বঙ্গভঙ্গ ও ভারতভাগের দায় যে কংগ্রেসের নেতাদের তা প্রমাণ করেন ‘বঙ্গভঙ্গ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ ও ‘ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন’ বইয়ে। তখনো জয়া চ্যাটার্জির ‘বেঙ্গল পার্টিশনড’ অথবা পেরি অ্যান্ডারসনের ‘দি ইন্ডিয়ান আইডিওলজি’ লেখা হতে অনেক দেরি। ভাষা আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, উনসত্তরের অভ্যুত্থান থেকে স্বাধীনতাসংগ্রাম হয়ে যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পাঁচটি দশকের রাজনৈতিক জীবনী উমরই লিখেছেন। তাঁর প্রতিটি নতুন গ্রন্থ আগের চিন্তাগুলোকে আরও বিকশিত করে, ধরে রাখে চিন্তার সংগতি। বাংলাদেশের বিগত দেড় শ বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যাকরণ বুঝতে উমরকে লাগবেই।

হয়তো বদরুদ্দীন উমর নিজেও এ ব্যাপারে সচেতন নন যে ষাটের দশকের ঢাকায় যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটেছিল, তিনি সেই দেশীয় রেনেসাঁর একজন এবং নিজেই তার ইতিহাসবিদ। উনিশ শতকের কলকাতা ভাবযোগী-কর্মযোগী ব্যক্তি পুরুষদের তৈরি করেছিল। তেমন চিন্তা ও ভাবের মহাপুরুষ ঢাকা জন্ম দিতে পারেনি। কিন্তু উনিশ শতকের কলকাতা যা পারেনি, ঢাকায় সেটাই ঘটেছে। কলকাতার জাগরণ স্বাধীন দেশের জন্ম দিতে পারেনি। উপনিবেশের আশ্রয়ে বসে তা সম্ভবও ছিল না। তা ছাড়া কলকাতার রেনেসাঁ বলে যাকে বলা হয়, তার নায়কেরা ধর্মসংস্কার নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন, আটকে ছিলেন উচ্চবর্ণের সমাজ ও সমস্যার গণ্ডিতে। অন্যান্য সম্প্রদায় এবং বৃহত্তর জনগণের মুক্তির প্রশ্ন তাতে কমই ছিল।

ঢাকা হয়তো মহাপুরুষ দিতে পারেনি। কিন্তু ভাষা আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িকতার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মতো বিপ্লবী আন্দোলনের ঢেউ মহাপুরুষদের চেয়েও বড় অবদান রেখে গেছে। একটি জাতি ও তার রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে। একেকটি আন্দোলন জনগণের চেতনা ও জীবনে যে গতিবেগ এনেছিল, কলকাতা কসমোপলিটনের কোনো মহাপুরুষের পক্ষে তা সম্ভব হতো না। বাংলাদেশ মহাপুরুষের প্রতি ভক্তিভাব দিয়ে নয়, ভক্তির বিরুদ্ধে স্বাধিকারের চেতনায় ঘটিয়েছে তার নিজস্ব রেনেসাঁ। বদরুদ্দীন উমর আমাদের সেই ষাটের রেনেসাঁর পুরোধা সন্তান। উনিশ শতকে কলকাতা যে ধরনের স্বাধীন মনীষা জন্ম দিতে গিয়েও পারেনি, স্বাধীন বাংলাদেশে উমর সেটাই করে গেছেন।

সুবিধাবাদী-পরজীবী বুদ্ধিজীবিতার প্রতিষেধক তাঁর লেখনী। এ জন্যই দরবারি সমাজে তিনি আজীবন উপেক্ষিত। উমর অসন্তুষ্ট, নিরাপসী ও অসম্ভব মর্যাদা নিয়ে সৎ। তিনি শুধু অক্সফোর্ডফেরত বিদ্বানের গরিমাই ছাড়েননি, আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে বিপ্লবে নেমে পড়েছিলেন। একাত্তরের স্বাধীনতাসংগ্রাম নিয়ে জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশপন্থী চিন্তাটা তাঁরই। তাঁর মতো জেদি মানুষের রাজনৈতিক নেতা হওয়ার দরকার ছিল না। সাঁত্রে বা চমস্কির মতো তিনি একাই একটি প্রতিষ্ঠান। সে কারণেই একুশে পদক, আদমজী পুরস্কার, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইতিহাস পরিষদ পুরস্কার, ফিলিপিস পুরস্কার প্রত্যাখ্যানে তাঁর বাধেনি।
স্বাধীনতার পর সংগঠিত করেছেন বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের মঞ্চ বাংলাদেশ লেখক শিবির, নেতৃত্ব দিয়েছেন কৃষক সংগঠনের।

নাগরিক অধিকার রক্ষার যেকোনো উদ্যোগে তিনি আগুয়ান। শহীদজননী জাহানারা ইমামের সঙ্গে গণ-আদালতেও জড়িত ছিলেন। ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে সম্পাদনা করছেন মাসিক ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকা। বাংলা রাজনৈতিক গদ্যে উমর তুলনাহীন। এই গদ্য বাদামের মতো শুকনা হলেও আচারের মতো দীর্ঘস্থায়ী স্বাদ দেয়। তাঁর সমাজতাত্ত্বিক চিন্তা গ্রামসির ধারার। উমরীয় তাত্ত্বিক বীক্ষা আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও চিন্তক আহমদ ছফার বুদ্ধির মজ্জায় রস দিয়েছিল। এঁদের বাইরে কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, মঞ্জু সরকার থেকে শুরু করে সংগ্রামী অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ ও সাহিত্য তাত্ত্বিক আজফার হোসেন কমবেশি উমরের সঙ্গে পথ হেঁটেছিলেন।
বদরুদ্দীন উমর সত্য কথাটা যেভাবে নির্দ্বিধায়, নির্ভয়ে এবং স্বচ্ছভাবে উচ্চারণ করতে পারেন, তা অনেকেই পারেন না। এ জন্যই হয়তো আহমদ ছফা বলেছিলেন, ‘আমি বদরুদ্দীন উমরের যুগে বাস করি বলে গর্বিত।’

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন