অবস্থা এমন যে হাঁটার গতি ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার বলার উপায়ও বুঝি নেই। টানা দু-চার মিনিট নির্ঝঞ্ঝাটে হাঁটার মতো ফুটপাতও কি আছে এ শহরে? নেই। দখলে শুধু ফুটপাতই হাপিস নয়, সড়কেও বসে হরেক পণ্যের দোকানপাট। যখন যেখানে খুশি, যত্রতত্র গাড়ি পার্ক করার অবারিত সুবিধার নিশ্চয়তাও দেয় ঢাকা!

সুতরাং রাজধানীর রাজপথে যানবাহনের গড় গতিবেগ ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার—বাক্যটি টিকে থাকে। এ বাক্যে ব্যবহৃত তথ্যের উৎস বিশ্বব্যাংক ও বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গবেষণা। (এ গবেষণা অনুযায়ী ২০০৭ সালে এ মহানগরে সড়কে যানবাহনের গড় গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার)। কিন্তু ঢাকাবাসী তাঁদের প্রাত্যহিক ‘পথযুদ্ধে’ জানেন, এ তথ্যেও ফাঁক আছে! গতিবেগ শহরের সব সড়কে এক রকম নয়, কোনো কোনো সড়কে যেন গতিবেগ ‘শূন্য’।

গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি, অটোরিকশা, বাইক, রিকশায় গাদাগাদি অবস্থা, একচুল নড়ছে না একটি যানও। হঠাৎ দেখলে কারও ‘স্থিরচিত্র’ বলে ভ্রম হতে পারে বৈকি। তবে যানগুলোর তীব্র হর্নে ভুল ভাঙে, এটা ‘স্থিরচিত্র’ নয়, ‘জটচিত্র’। অকারণে হর্ন বাজানোর বিষয়ে কোনো সমীক্ষা হয় কি না, জানা নেই। তবে অন্য অনেক ‘অর্জনের’ মতো এ ক্ষেত্রেও আমাদের প্রিয় শহরের প্রাপ্তির ডালা অপূর্ণ থাকবে না, তা হলফ করেই বলা যায়!

জাতিসংঘের অনুমান, ২০৫১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫৮ শতাংশই নগর এলাকায় বাস করবে। ‘স্মার্ট সিটি’, ‘মেগা সিটি, ‘মেট্রাপলিস’ কিংবা ‘ডিজিটাল রাজধানী’—যে নামেই ডাকি, ঢাকার সেই সময়ের সম্ভাব্য ছবির কথা ভাবলে হাত-পা হিম হয়ে আসে! অবশ্য ঘুমিয়ে থাকলে তেমন অনুভূতি হওয়ার কথা নয়। একদল মানুষ তাই ইচ্ছাকৃত ঘুমিয়ে আছেন, অন্যরা ঘুমে ঢলে পড়ছেন একের পর এক হোঁচট খাওয়ার ক্লান্তিতে!

সুতরাং গণপরিবহন, ব্যক্তিগত গাড়ি বা রিকশা-অটোরিকশায় গন্তব্যে কখন পৌঁছাবেন, তা কেউ জানে না। অথচ ঢাকার সেবায় আছে ৭টি মন্ত্রণালয় ও ৫৪টি প্রতিষ্ঠান। নগরপিতাও দুজন। তাঁরাও, বোধ করি, হেঁটেও যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর নিশ্চয়তা দিতে দশবার ভাববেন। কিন্তু এ শহরে যিনি ১০ দিন থাকবেন, তিনি কোনো ভাবাভাবির ধার না ধরে সোজা বলে দিতে পারবেন শহরটির ‘গন্তব্য’ কোন দিকে! ঢাকার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে বলতে জ্যোতিষশাস্ত্র না জানলেও চলে, নগর বিশেষজ্ঞ হওয়ারও দরকার পড়ে না।

দিনদুনিয়ায় প্রচলিত কোনো সূচক, মানদণ্ড বা জরিপই বলছে না, ঢাকা ‘বাসযোগ্য’ শহর। তবু এ শহরে প্রায় দুই কোটি মানুষ থাকি। কারও কারও মতে, সংখ্যাটি আড়াই কোটির কম নয়।

ঢাকার চারদিকের নদ-নদীকে কেবল ‘নাম’ দিয়ে চিনতে হয়! এত দিন ‘বায়ুদূষণ, বায়ুদূষণ’ বলে খুব চেঁচানো হলো। সেখানে যুক্ত হলো শব্দদূষণের অর্জনও! তবু এই শহর প্রতিদিনই বাড়ছে। খাল বুজিয়ে, নদী-খাল ভরাট করে, জলাশয় হাপিস করে, গাছপালা উজাড় করে, খাসজমি দখল করে। এমনকি ইতিহাস-ঐতিহ্যের সাক্ষী পুরাকীর্তিও বাদ যাচ্ছে না দখল থেকে। চারদিকে শুধু দালান আর দালান। খোলা জায়গা নেই, জলাশয় নেই, খেলার মাঠ নেই। কলাবাগানের একচিলতে তেঁতুলতলা মাঠটি রক্ষা পেল কত-না কাঠখড় পুড়িয়ে! স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে এ ব্যাপারে নির্দেশ দিতে হলো। সংশ্লিষ্ট দপ্তর, সংস্থা কি এটা উপলব্ধি করতে অক্ষম যে আবাসন মানে শুধু থাকার ঘর নয়, হাত-পা ছড়ানোর জন্য একটু খোলা জায়গাও দরকার? শ্বাস নেওয়ার জন্য বায়ু দরকার?

যদিও এ শহর ও এর আশপাশ ঘিরে একরাশ উন্নয়নকাজ চলমান, আরও কিছু রয়েছে পরিকল্পনার টেবিলে। আর স্বপ্ন? ঢাকাকে ঘিরে আমাদের স্বপ্ন রাশি রাশি। যদিও প্রতিমুহূর্তে এ স্বপ্ন ঠোকর খায় রূঢ় বাস্তবতায়।

শুধু ঢাকা কেন, দেশের জেলা-উপজেলা শহরসহ পৌরসভাগুলোতেও যেন বসতি গাড়ার ধুম পড়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) বলছে, অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নগরায়ণের হার অনেক, অনেক বেশি। এবং বলাই বাহুল্য, এই নগরায়ণ মোটাদাগে অপরিকল্পিত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নগরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ১। ২০১১ সালে দেশের নগরগুলোয় বাস করত ২৮ শতাংশ মানুষ, ২০২০ সালে এসে দাঁড়ায় তা ৩৮ শতাংশে। অর্থাৎ এখনই দেশের এক-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ নগরের বাসিন্দা। এর মধ্যে ‘নগরশ্রেষ্ঠ’ ঢাকায় বসবাসকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি এবং নগরজীবনের ‘দুর্ভোগ’ও এখানে সবচেয়ে বেশি।

দুই থেকে আড়াই কোটি মানুষের ঢাকা বস্তিরও নগরী। অন্তত এক-তৃতীয়াংশ মানুষের বাস বস্তিতে। ফুটপাতে, রেলস্টেশন-বাসস্টপে, ওভারব্রিজের নিচে, যাত্রীছাউনিতে, ফুটপাতে, পার্কের ধারেকাছে—এখানে-ওখানে গোটা একটা জীবন কাটিয়ে দেয় আরও বহু মানুষ।

গরিব মানুষের বসবাসের এলাকাগুলোয়, বহু বস্তিতে পানীয় জল, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শৌচাগারের মতো ন্যূনতম নাগরিক পরিষেবা নামকাওয়াস্তে। অথচ ফ্ল্যাট-বাড়িতে নিয়োজিত গৃহকর্মী, রিকশাওয়ালা, পেপারওয়ালা, সবজিওয়ালা, বাসচালক, নির্মাণশ্রমিকের উৎস এসব বস্তি। শহরটাকে যতটুকু সাফসুতরো পাই, তা বস্তিবাসীরই কল্যাণে। ফুটপাতে সস্তার নানা পণ্যের দোকান, ভ্যানে করে ঘরের সামনে শাকসবজি থেকে শুরু করে ফলমূল, মনিহারি পণ্যও পৌঁছে দিচ্ছেন তাঁরা। নানাভাবে নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন প্রয়োজন মিটিয়ে চলেছেন, শহরটাকে গড়েপিঠে তৈরি করে চলেছেন, অথচ তাঁদের ন্যূনতম নাগরিক পরিষেবা দিতে পারছেন না নগরপিতারা। ছোট চাকুরে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গার্মেন্টসকর্মী থেকে শুরু করে নানা খাতের শ্রমিক, দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ করোনার আঘাতে অনেকটাই ধরাশায়ী। তথাকথিত মধ্যবিত্তরাও টেনেহিঁচড়ে তাঁদের জীবন টেনে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা জিনিসপত্রের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি।

করোনা পরিস্থিতিতে কাজকর্ম হারিয়ে কিছু মানুষ ঢাকা ছেড়েছে নবটে, কিন্তু সব শ্রেণি-পেশার রুটিরুজির ‘কেন্দ্রস্থল’ যে সেই এক ঢাকাই। ফলে, উপায়ন্তর না থাকায় প্রতিদিনই কাজের সন্ধানে, বেঁচে থাকার তাগিদে এ নগরে ভিড়ছেন বহু মানুষ। ফলে, প্রতিনিয়ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, পরিষেবা থেমে থাকছে আগের জায়গাতেই। এই পরিষেবা পেতেও পদে পদে খেতে হয় হোঁচট। দুর্নীতি, অনিয়ম, দায়িত্বহীনতা, অব্যবস্থাপনাকে ভোক্তা-সেবাগ্রহীতারা নিয়তি বলেই মেনে নিয়েছেন!

নানা সময়ে নগরকেন্দ্রিক পরিকল্পনা ও নীতি গৃহীত হলেও সেগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন হয়নি। এ কারণে ঢাকার সার্বিক পরিস্থিতি দিন দিন খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। উপরন্তু, ঢাকাকেন্দ্রিক অতি নির্ভরতার কারণে অন্যান্য নগর গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও মাঠে মারা যাচ্ছে।

ঢাকায় গত এক দশকে বাস-মিনিবাসের তুলনায় ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল বেড়েছে হাজারে হাজারে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাবে, ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে মোটরসাইকেল বেড়েছে প্রায় ৮ গুণ। একই সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। বুয়েটের এআরআইয়ের হিসাবে যানজটের কারণে ঢাকায় দৈনিক ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা।

জাতিসংঘের অনুমান, ২০৫১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫৮ শতাংশই নগর এলাকায় বাস করবে। ‘স্মার্ট সিটি’, ‘মেগা সিটি, ‘মেট্রাপলিস’ কিংবা ‘ডিজিটাল রাজধানী’—যে নামেই ডাকি, ঢাকার সেই সময়ের সম্ভাব্য ছবির কথা ভাবলে হাত-পা হিম হয়ে আসে! অবশ্য ঘুমিয়ে থাকলে তেমন অনুভূতি হওয়ার কথা নয়। একদল মানুষ তাই ইচ্ছাকৃত ঘুমিয়ে আছেন, অন্যরা ঘুমে ঢলে পড়ছেন একের পর এক হোঁচট খাওয়ার ক্লান্তিতে!

হাসান ইমাম সাংবাদিক। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন