প্রধানমন্ত্রী ও সরকারি দল আওয়ামী লীগ তথা ১৪-দলীয় জোটের নেতার সঙ্গে প্রধান বিরোধী জোট, সদ্য গঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এবং অন্যদের সংলাপ আপাতদৃষ্টে শেষ হয়েছে। এই সংলাপের ফলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ আরও কয়েকটি দলের বেশ কিছু দাবিদাওয়ার তেমন কোনো সুরাহা হয়েছে বলে মনে হয়নি। এ অবস্থায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে কতখানি প্রস্তুত আছে বা এই পরিস্থিতিতে প্রস্তুতি সমাপ্ত করতে পারবে কি না, তা এখনো খুব পরিষ্কার নয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বেশ কিছু দাবি ছিল। তফসিল পিছিয়ে দেওয়ার দাবি সরকারি দল এবং নির্বাচন কমিশন নাকচ করেছে। তফসিল অনুযায়ী ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল ঘোষণা হওয়ায় এখন বড় ধরনের কোনো আইনি পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে বিধির পরিবর্তন হতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

তফসিল ঘোষণা হলেও নির্বাচন নিয়ে কিছু জটিল ও সংবেদনশীল প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে। তবে তা খতিয়ে দেখার সময় ইসির হাতে রয়েছে বলে আমি মনে করি।

নির্বাচন বেশ আগে হয়ে যাওয়ার কারণে নতুন নির্বাচিত সাংসদদের প্রায় এক মাস অপেক্ষা করতে হবে শপথ গ্রহণের জন্য। কারণ, সংসদের মেয়াদ শেষ হবে জানুয়ারির শেষে। এ ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশে এই প্রথম। কাজেই এটা হবে এক নতুন অভিজ্ঞতা। অনেক সাংসদ বহাল থাকবেন, যাঁরা হয়তো একাদশ সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নই পাননি। কাজেই এই এক মাসের সময়ের মধ্যে কোনো নতুন ধরনের সমস্যার উদ্ভব হয় কি না, তা দেখার বিষয় হয়ে থাকবে।

আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তফসিল ঘোষণার আগে সমাধান না হলেও প্রচার-প্রচারণা শুরু হওয়ার আগেও ইসি নিষ্পত্তি করতে পারে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনীর নিয়োগ প্রসঙ্গ। সেনাবাহিনী নিয়োগ নিয়ে এই বিতর্কের আদৌ প্রয়োজন ছিল বা আছে বলে আমি মনে করি না। কারণ, বিষয়টি নির্বাচনকালীন নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত, যার মূল দায়িত্ব ইসির। তাদেরই নির্ধারণ করতে হবে প্রয়োজনে বাহিনী কী পর্যায়ে, কীভাবে নিয়োগ হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের দেশের সংঘাতমূলক রাজনৈতিক পরিবেশের এবং নেতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রায় ৪০ হাজার কেন্দ্র এবং ১০ কোটির বেশি ভোটারের নিরাপত্তার বিষয়টি বাংলাদেশের সব নির্বাচন কমিশনের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ ছিল এবং হয়ে আছে। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে নির্বাচনগুলোতে বিভিন্ন কারণে নিরাপত্তাঝুঁকি অনেক কম ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ২০১৪ সালের নির্বাচনে নিরাপত্তার জন্যই নির্বাচন বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ বরাদ্দ ব্যয় করতে হয়েছিল, এই নির্বাচনে তার কম হবে বলে মনে হয় না। নিরাপত্তার বিষয়টি আগামী নির্বাচনেও ইসির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হবে।

নির্বাচনকালীন, বিশেষ করে ভোট গ্রহণের দিন ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তার জন্য যে সংখ্যায় সদস্যের প্রয়োজন, তার স্বল্পতার কারণেই প্রধানত সেনাবাহিনী নিয়োজিত হয়। সেনাবাহিনীকে সাধারণত অন্যান্য বাহিনীর শক্তিবর্ধক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যাতে প্রয়োজনে অন্যান্য বাহিনীকে সহায়তা করতে পারে। অন্য যেসব কারণে সামরিক বাহিনী নিয়োজিত হয়ে আসছে, তার মধ্যে মুখ্য হলো নিরপেক্ষ বাহিনী হিসেবে ভোটার ও জনগণকে নিরাপত্তার বিষয়ে সামরিক বাহিনীর ওপর জনগণের যথেষ্ট আস্থা আছে। এসব কারণে সেনা নিয়োগ শুধু রাজনৈতিক দলের দাবিই নয়, ভোটারদেরও অন্যতম দাবিতে পরিণত হয়। ভোটার ও জনসাধারণের উৎকণ্ঠা ও দাবির কারণেই ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে তৎকালীন ইসি সেনাবাহিনীকে ইসির আইনের অধীন নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ওই সময়ে সামরিক বাহিনী নির্বাচনী আইনের আওতায় থাকা সত্ত্বেও পাওয়া যায়নি। পরে ২০১৩ সালে আরপিও সংশোধন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘সংজ্ঞা’ থেকে সেনাবাহিনীকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে সামরিক বাহিনীর নিয়োগ আরপিও বা নির্বাচনী আইনের অধীনে হচ্ছে না। এ কারণেই বলা হচ্ছে যে সামরিক বাহিনী মোতায়েন করতে হলে ফৌজদারি কার্যবিধির আওতায় করতে হবে।

সরকারি দলের প্রধান প্রতিপক্ষের দাবি, সামরিক বাহিনীকে নির্বাচনে নিয়োগ দিতে হবে ম্যাজিস্ট্রেটের (হাকিমের) ক্ষমতা দিয়ে। এই দাবি আরপিও ৮৯-এ অনুচ্ছেদের বিপরীত। আরপিওর অধীন না হওয়ায় সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হলেও তারা সরাসরি ইসির অধীনে থাকবে না। এ ক্ষেত্রে সামরিক বাহিনী নিয়োজিত হবে ‘ইন এইড অব সিভিল পাওয়ার’ বা বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য। এ ক্ষেত্রে এ ধরনের নিয়োগের সময়, ক্ষণ, সিদ্ধান্ত ও কর্তৃত্ব থাকে একজন সর্বোচ্চ ক্ষমতাধারী হাকিম অথবা মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ কমিশনারের হাতে। এবং বাহিনীর যেকোনো কার্যক্রম পরিচালিত হবে একজন নির্বাহী হাকিমের হুকুমে। এমনকি নির্বাহী হাকিমের হুকুম ছাড়া নিয়োজিত সামরিক বাহিনীর কোনো কর্মকর্তা কাউকে আটক বা গ্রেপ্তারের হুকুম দেবেন না বা ক্ষমতা রাখেন না। নির্বাহী হাকিমের অনুপস্থিতিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক অথবা অন্য যেকোনো আইনসিদ্ধ ব্যবস্থা নিলেও পরবর্তী সময়ে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে নির্বাহী হাকিমের ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নিতে হয়।

সিআরপিসি অনুযায়ী সামরিক বাহিনীর নিয়োগ প্রয়োজনীয়তা এবং আইনানুগ ব্যবস্থাপনা সবই সর্বোচ্চ নির্বাহী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আওতায় থাকে। ফলে এর আওতায় সেনাবাহিনী নিয়োগ নির্বাচনী কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে যৌক্তিক কারণেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নির্বাচনী ব্যবস্থাপনায় এবং নির্বাচনকালীন সাংবিধানিক শক্তিবলে নির্বাচন কমিশনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তথাপি সামরিক বাহিনী নিয়োগ ওই আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। সামরিক বাহিনীকে আরপিওর অন্তর্ভুক্ত না করার যৌক্তিক কারণের ব্যাখ্যা কখনোই পাওয়া যায়নি।

উল্লেখ্য, ভারতের মতো সেন্ট্রাল রিজার্ভ ফোর্স বা সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ (সিআরপি) বাংলাদেশে নেই। যে ফোর্স নির্বাচনকালীন ইসির আওতায় ন্যস্ত হয়। যেহেতু বাংলাদেশ এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত, সে কারণে সব বেসামরিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ক্ষমতাসীন সরকার দ্বারা পরিচালিত এবং প্রভাবে প্রভাবিত। ফলে সামরিক বাহিনী নিয়োগ করা হলে আরপিওর আওতায় অন্যান্য বাহিনীর মতো সেনাবাহিনীরও সরাসরি ইসির আওতায় থাকা বাঞ্ছনীয়।

অপর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ইসি এখনো খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে এবং বিষয়টি সাংসদ-সংশ্লিষ্ট। ৩৫০ (নারী সদস্যসহ) সাংসদকে রেখেই প্রথমবারের মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যার অতীত অভিজ্ঞতা (২০১৪ বাদ দিলে) ইসির নেই। যে ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রশ্ন থাকবে। তাঁদের মধ্যে অনেকেই পুনরায় মনোনয়ন না-ও পেতে পারেন, সে ক্ষেত্রে নির্বাচনী এলাকায় তাঁদের পদচারণ কী ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে? নির্বাচনী আচরণবিধি এ ধরনের মনোনয়নের বাইরে থাকা সাংসদদের ক্ষেত্রে কতখানি প্রযোজ্য হবে, তা পরিষ্কার নয়। তা ছাড়া, সাংসদেরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়কারী বা উপদেষ্টা পদে এবং স্থানীয় স্কুল ও কলেজের সভাপতি পদে নিয়োজিত রয়েছেন, এ নিয়োগ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে। এ বিষয়ে ইসি কী পদক্ষেপ নিয়েছে বা নিতে যাচ্ছে, তা পরিষ্কার নয়।

যাই হোক, ওপরের আলোচনায় উত্থাপিত বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে, বিশেষ করে সামরিক বাহিনী নিয়োগের ক্ষেত্রে। এসব বিষয়ে ইসির চিন্তা–ভাবনা করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি। অবশ্য যদি ইসি এসব বিষয়ে বিচার-বিবেচনা না করে থাকে। আগামী নির্বাচন ইসির জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, তফসিল ঘোষণার পর ইসিকেই তার মুখোমুখি হতে হবে। আমাদের আন্তরিক আশা যে আগামী নির্বাচন জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে এবং ইসি চ্যালেঞ্জগুলোকে দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করতে পারবে।

এম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, কলাম লেখক ও পিএইচডি গবেষক
hhintlbd@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0