টানা ২৩ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযান শেষে উদ্ধার হলো শিশু জিহাদ। তবে জীবিত নয়, মায়ের কাছে লাশ হয়ে ফিরল সে। এই ২৩ ঘণ্টার অভিযানপর্ব শেষে যাঁদের সহযোগিতায় উদ্ধার হলো, তাঁরা একদল তরুণ। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, তরুণের এই দল আগে থেকে কেউ কারও পরিচিত ছিলেন না। উদ্ধার অভিযানে এসেই পরিচিত হন এবং নিজস্ব পদ্ধতিতে জিহাদকে উদ্ধার করেন, যদিও দমকল বাহিনী অভিযানটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছিল। 
আলোচিত এ ঘটনা নিয়ে সারা দেশের সাধারণ মানুষের আগ্রহ ছিল প্রবল। উদ্ধার অভিযান, দায়িত্ব এড়ানো, নানা ধরনের মন্তব্য, দায়ী কারা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে নানা আলোচনাও চলছে।
আমাদের দেশের তরুণেরা যে কী করতে পারেন, তার একটি বড় প্রমাণ ছিল এ উদ্ধার কার্যক্রম। ১০-১৫ জন উদ্যমী তরুণ-যুবকের একটি দলই কিন্তু টেনে তুলে আনে জিহাদের দেহ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন শফিকুল ইসলাম ফারুক, আবু বকর সিদ্দিক, আনোয়ার হোসেন, কবির মুরাদ, নূর মোহাম্মদ, আবদুল মজিদ, শাহজাহান আলী, ইমরান, রাকিব, মুন ও রাহুল। আমাদের নানা ধরনের দক্ষ বাহিনী রয়েছে। তবে এ ধরনের ঘটনা প্রথম হওয়ায় অনেকেরই নানা ধরনের অভিজ্ঞতার ঘাটতির কথা শোনা গেছে, যা স্বীকারও করেছেন উদ্ধারকারী বাহিনীর সদস্যরা। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি অনেক ক্ষেত্রেই পুষিয়ে নেওয়া যেত যদি উদ্ধারকর্মীরা আন্তরিক হতেন, তাঁদের কাজে সমন্বয় থাকত।
প্রশ্ন হচ্ছে, এ ধরনের দুর্ঘটনা, দুর্যোগ কিংবা বড় কোনো বিপদে যখন উদ্ধারকারী বাহিনী অভিজ্ঞতা কিংবা সীমাবদ্ধতার কথা বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। সেটি কি যুক্তিযুক্ত? সারা বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এ ধরনের সংস্থাগুলো কাজ করে থাকে। সেখানে এটাও দাবি করা ঠিক হবে না যে আমাদের দেশেও একই ধরনের প্রযুক্তির সব জিনিস থাকতেই হবে! তবে আমরা যদি সেসব প্রযুক্তি নিতে না পারি, তাহলে আমাদের তরুণদের তো কাজে লাগতে পারি। কিন্তু তা আমরা লাগাচ্ছি কই?
৬ ডিসেম্বর দেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে সারা দেশের নির্বাচিত তরুণদের অংশগ্রহণে ‘জাতীয় হ্যাকাথন’। সাধারণত কারিগরি বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়ব্যাপী একসঙ্গে সমস্যা সমাধান এবং উদ্ভাবন নিয়ে পরিচালিত কার্যক্রমকে হ্যাকাথন বলা হয়। এতে মূলত কারিগরিভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের চেষ্টা চলে। এবারের হ্যাকাথনে প্রশ্নপত্র ফাঁস, যৌন হয়রানি, যানজট, সড়ক নিরাপত্তা, দুর্নীতি, প্রজননস্বাস্থ্য, স্যানিটেশন, সাইক্লোন সেন্টার ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি সরবরাহ ও নিরাপদ সড়ক—এই ১০টি ক্ষেত্রের সমস্যার মোবাইল প্রযুক্তির মাধ্যমে উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করতে যুক্ত হন তরুণেরা। ৩৬ ঘণ্টার এ হ্যাকাথনে দেশের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সমাধান কীভাবে প্রযুক্তিগতভাবে করা যায়, সেসব বিষয়ে নির্বাচিত সেরা প্রকল্পগুলোকে পুরস্কৃতও করা হয়। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে দারুণ। এর মাধ্যমে অনেকগুলো উদ্ভাবন কিংবা প্রযুক্তির সহায়তায় সমস্যা সমাধানের পথ বেরিয়ে এসেছে। সরকার এসব প্রকল্পকে আর্থিক সহায়তাও দিয়েছে।
আমাদের দেশে নানা সময়ে বড় ধরনের দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনা হলেই কেবল শুরু হয় নানা ধরনের আলোচনা। আর নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলেই সে আলোচনা কিংবা বিভিন্ন কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। জিহাদকে উদ্ধারের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে আমাদের কী করা উচিত। এ ধরনের ঘটনা কিংবা এর চেয়ে বড় দুর্ঘটনাও হতে পারে এবং সে জন্য প্রয়োজন প্রয়োজনীয় সতর্ক উদ্যোগ। বিশেষ করে প্রয়োজন তরুণদের উদ্ভাবন, সমস্যা সমাধানের উদ্যোগকে সহায়তা করা।
এ বিষয় অনেকটা জাতীয় হ্যাকাথনের মতোই হতে পারে; যেখানে জাতীয় যেসব সমস্যা সমাধানের বিষয় ছিল, একইভাবে দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনায় কী ধরনের উদ্ভাবন হতে পারে, সেগুলো নিয়ে কাজ করবেন তরুণেরা। আর উদ্ভাবন, প্রযুক্তি-সুবিধাগুলো আমাদের উদ্ধারকারী বাহিনীগুলোকে দিতে হবে, যাতে প্রয়োজনে সেগুলো ব্যবহার করতে পারেন বাহিনীর সদস্যরা।
মূল কথা হচ্ছে তরুণদের সুযোগ দেওয়া। তাঁদের সহায়তা করা, যাতে তাঁরা এ ধরনের কাজে সহযোগিতা করতে পারেন। তরুণেরা যে প্রস্তুত, তা সাম্প্রতিক ঘটনায়ই প্রমাণ পেয়েছি। এখন প্রয়োজন তাঁদের সুযোগ বাড়ানো।
এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। যৌথভাবে একাধিক মন্ত্রণালয়ও কাজটি করতে পারে। এতে সারা দেশ থেকে তরুণদের নানা ধরনের দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, ভূমিকম্প রোধে কিংবা ভূমিকম্পের সময় জরুরি প্রযুক্তি, ভবনধস উদ্ধার কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা নেওয়া যেতে পারে।
আবার সেগুলো বাস্তবায়নের জন্য তাঁদের যুক্তও করা যেতে পারে। যেকোনো ঘটনায় প্রস্তুত থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরি। তাহলে জিহাদের মতো আর কাউকে অসহায়ভাবে হারাতে হবে না। তরুণদের সুযোগটা দিয়েই দেখুন। ভবিষ্যতের দেশ নির্মাণে এ তরুণেরাই এগিয়ে নিতে পারবেন দেশকে। আমরা সেই উন্নত দেশের স্বপ্ন দেখি, যা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে আর তার পেছনে থাকবে একঝাঁক সম্ভাবনাময় তরুণের মুখ, যাঁরা পিলার হয়ে শক্ত করে ধরে রাখবেন আমাদের প্রিয় বাংলাদেশকে।
নুরুন্নবী চৌধুরী: সঞ্চালক, সোশ্যাল মিডিয়া ইন্টারঅ্যাকশন, প্রথম আলো।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন