তরুণ: অপেক্ষারত, অস্থির ও অশান্ত

বিজ্ঞাপন
default-image

আরব বসন্তের অনুপ্রেরণায় সাড়া-জাগানো অনেক আন্দোলন হয়েছে বিশ্বজুড়ে। কিন্তু আরব বসন্তের ফলাফল তেমন সন্তোষজনক হয়নি। সেখানে তরুণদের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন শেষমেশ ঘটেনি। সেটা অবশ্য পৃথিবীর কোথাও ঠিকভাবে ঘটেনি। তরুণেরা যে লক্ষ্য নিয়ে রাস্তায় নেমে এসেছিল, পৃথিবীর কোথাও সেই লক্ষ্য পূরণ হয়নি। শুধু নেতৃত্ব বদল অথবা বিদ্যমান ব্যবস্থার উনিশ-বিশের মাধ্যমে আপাত সমাধান এসেছে। কিন্তু পরিস্থিতি আবারও একই জায়গায় ঘুরপাক খেয়েছে। তবে আরব বসন্তের পর দ্বিতীয় দফায় বিশ্বব্যাপী চলমান তরুণদের আন্দোলনের চরিত্র ভিন্ন।

পৃথিবী কখনোই এতটা তারুণ্যনির্ভর ছিল না। পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি এখন তরুণ। ২০১২ সালের হিসাবে এই বিপুল জনগোষ্ঠীর বয়স ৩০ বছরের নিচে। বেশির ভাগই উন্নয়নশীল দেশের তরুণ। তবে বেশির ভাগ তরুণ আর্থসামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বঞ্চিত। এই চিত্র উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশনির্বিশেষে একই রকম।

বর্তমান দুনিয়ায় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হলো নব্য উদারনীতিবাদ। এই ব্যবস্থার ম্যাজিক হলো অর্থনৈতিক নীতির মাধ্যমে সমাজকে এমনভাবে বদলে ফেলা, যেখানে সবাই নিজ নিজ পেশাগত উন্নতির ব্যাপারে বুঁদ হয়ে থাকবে। ব্যক্তি আর সমষ্টির সঙ্গে একাত্মবোধ করবে না। ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিচ্ছিন্ন সমাজে প্রথাগত আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নেই। তাহলে কোন রোষে তরুণেরা বিশ্বব্যাপী ফুঁসে উঠছে?

তরুণদের রাস্তায় নামার পেছনে আর্থ-রাজনৈতিক কারণের সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণও আছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগের শিক্ষক আলসিন্দা হুনওয়ানা একটি ধারণার মাধ্যমে সেটি প্রকাশ করেছেন। আর তা হলো ‘ওয়েটহুড’। কী এই ওয়েটহুড?

ওয়েট শব্দের অর্থ অপেক্ষা। সেই অর্থে অপেক্ষারত সময়কেই ওয়েটহুড বলতে পারি আমরা। এককথায়, বয়হুড বা বাল্যকাল যখন দীর্ঘায়িত হয়, তাকে বলা যায় ওয়েটহুড। তরুণদের যে বয়সে সাবালক বলে ধরে নেওয়া হয়, যে বয়সে তাদের সামাজিক দায়িত্ব গ্রহণের বয়স হয়েছে বলে এত দিন ভাবা হতো, সেই বয়স আর আগের জায়গায় নেই। মানুষের ব্যক্তিজীবনে নব্য উদারনীতিবাদের যেসব প্রভাব রয়েছে, এই ওয়েটহুড তারই একটি।

অর্থনৈতিক শ্রেণিনির্বিশেষে বহু তরুণ দীর্ঘদিন বেকার থাকছে। পরিবার গঠন করতে পারছে না ঠিক সময়ে। এর ফলে সম্পূর্ণ স্বাধীন তারা হতে পারছে না। সে কারণেই সাবালক মানুষ হিসেবে সমাজে যেসব মর্যাদা পাওয়ার কথা, সেগুলো থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

শুধু তা-ই নয়, এই ওয়েটহুডের রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবও। এর ফলে তরুণেরা রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাচ্ছে। তাদের কণ্ঠস্বর আর আত্মমর্যাদার ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।

তবে এই সংকটের কারণ উন্নয়নশীল আর উন্নত বিশ্বে এক রকম নয়। উন্নয়নশীল দেশে এই সংকটের প্রধান কারণ হলো নব্য উদারনীতিবাদের গছিয়ে দেওয়া কাঠামোগত সংস্কার নীতি বা স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট পলিসির ব্যর্থতা, শাসনব্যবস্থার করুণ দশা, দুর্নীতি এবং অপর্যাপ্ত নাগরিক অধিকার। কিন্তু উন্নত বিশ্বেও ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে আকাশছোঁয়া। ফলাফল হয়েছে বুমেরাং প্রজন্ম। এই বুমেরাং প্রজন্ম যাদের বলা হচ্ছে, তারা পড়াশোনা শেষ করে চাকরি না পেয়ে ঘরে ফিরে আসছে। সামাজিক মানদণ্ড মেনে তরুণেরা তাদের জীবনযাপন করতে পারছে না। রাজনীতি থেকেও তারা রয়ে গেছে বিযুক্ত।

এটা ঠিক যে ওয়েটহুড একেবারে নতুন কোনো পরিস্থিতি নয়। কিন্তু বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবী অনেক বেশি আত্মনির্ভরশীল হওয়ায় এই সংকট আরও বেশি ঘনীভূত হয়েছে এবং এর অবনতি ঘটেছে। আর এর পেছনে মূল দায় হলো নব্য উদারনীতিবাদের ব্যর্থ অর্থনৈতিক নীতি।

উন্নত বিশ্বের তরুণদের সঙ্গে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর তরুণদের পার্থক্য অনেক। এই পার্থক্য একই সঙ্গে বস্তুগত, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির। কিন্তু ধনী-গরিব সব দেশেই তরুণেরা একই রকম রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক বঞ্চনার শিকার। ফলাফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। তারা রাস্তায় নেমেছে। নিজেদের কণ্ঠস্বর শোনাতে চায় তারা। নিজেদের রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক স্বতন্ত্র পরিমণ্ডলের দাবি জানাতেই এই প্রজন্মের রাজপথে আবির্ভাব।

একেক দেশে আন্দোলনগুলোর ধরন একেক রকম। কিন্তু আন্দোলনকারীরা সবাই ওয়েটহুডের শিকার। আর রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থান তাদের ঠেলে দিয়েছে রাজপথের আন্দোলনে। ২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্যে ঘটা আরব বসন্তে যেসব ভুলত্রুটি ছিল, সেগুলো থেকেও বর্তমান তরুণেরা শিক্ষা নিয়েছে বলে বোঝা যায়।

সমস্যার সমাধানে তরুণেরা আর রাষ্ট্রের ইচ্ছা ও সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করছে না। তারা নতুন ধরনের রাজনৈতিক বোঝাপড়া তৈরি করছে। আন্দোলনের ভিত্তি ব্যাপক, কোনো এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত নয়। সামাজিক ও রাজনৈতিক সমাবেশের ক্ষেত্রে তারা সম্মতিভিত্তিক ও অনুভূমিক পদ্ধতি বেছে নিয়েছে। অনুভূমিক এই অর্থে, একজন কোনো নেতার অধীনে আন্দোলনগুলো হচ্ছে না। সাধারণত স্বতঃস্ফূর্ত তৃণমূল আন্দোলনে যখনই কোনো নির্দিষ্ট নেতা তৈরি হয়ে যায়, তখনই রাষ্ট্র বা সরকার সেই নেতার সঙ্গে দেনদরবার করে আন্দোলনের ভিত নষ্ট করে দেওয়ার চেষ্টা করে।

শুধু রাস্তায় প্রতিবাদ করেই এই তরুণেরা ক্ষান্ত হচ্ছে না; জনপ্রিয়তাহীন নেতাদের হটিয়ে দেওয়াই শুধু তাদের লক্ষ্য নয়। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থার গভীরতর রূপান্তরই তাদের লক্ষ্য। অতীতে এসব আন্দোলনে বিদ্যমান শাসকের পতনের পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে মতভেদ দেখা দিয়েছে। তরুণদের নতুন রাজনৈতিক ভূমিকা কী হবে, সেটা নির্ধারণ করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে আবারও ক্ষমতায় এসেছে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠিত কোনো না কোনো রাজনৈতিক শক্তি। ২০১১ সালে তিউনিসিয়া ও মিসর, ২০১২ সালে সেনেগাল এবং ২০১৫ সালে বারকিনা ফাসোর ক্ষেত্রে এ রকম ঘটনা দেখা গেছে।

কিন্তু তরুণদের হংকং থেকে বলিভিয়া, ইরাক-ইরান-লেবানন হয়ে চিলিসহ দেশে দেশে আন্দোলনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তারা আরব বসন্তের ভুলগুলো থেকে শিক্ষা নিয়েছে। তারা শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন করেই দমে যেতে রাজি নয়। বিদ্যমান নেতৃত্বের পতনের পর আরেক দল দুর্নীতিবাজ নেতার আগমন ঠেকাতে তারা বদ্ধপরিকর।

সুদান, লেবানন, হংকং এবং জলবায়ু ন্যায্যতার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলোয় এই বৈশিষ্ট্য বেশি স্পষ্ট। এ ছাড়া ইরাক ও লাতিন আমেরিকার ক্ষেত্রেও দেখা গেছে তরুণদের হার না-মানা ক্ষিপ্রতা। এসব আন্দোলনের পেছনে বাইরের ইন্ধন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। যেমন বলিভিয়া ও হংকংয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু ওয়েটহুড যে তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে, সে কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই।

লেবাননের তরুণেরা গোত্রভিত্তিক রাজনীতির বিরুদ্ধে ফুসে উঠেছে। সেখানে স্লোগানের মাধ্যমে সব গোত্রের নেতাদেরই তারা ‘চোর, চোর, চোর’ বলে বিদায় নিতে বলেছে। আবার জলবায়ু ন্যায্যতার দাবিতে তরুণদের স্লোগান যেমন ‘লেগে থাকো’, ‘রাজপথে থাকো’, ‘লক্ষ্যে অনড় থাকো’, ‘দমে যেয়ো না’। এগুলোর সারমর্ম পরিষ্কার। আর তা হলো বিদ্যমান জেঁকে বসা শাসকদের কৌশলের কাছে হার না মানা।

এসব আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো এগুলো এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের নেতৃত্বের কাঠামো এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ গ্রহণ করছে না। প্রতিবাদ আন্দোলন যেন এখনই আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দলে পরিণত না হয়, সে ব্যাপারে তারা সজাগ।

গভীর আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে বর্তমান তরুণ প্রজন্মের এসব আন্দোলন কতটুকু প্রভাব রাখতে পারবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে এটা স্পষ্ট যে ওয়েটহুড প্রজন্ম বিদ্যমান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে। অনেকগুলো বিস্তৃত বিষয় নিয়ে তারা রাজপথে নেমেছে। সেসব বিষয়ের মধ্যে আর্থসামাজিক দুর্দশা যেমন আছে, তেমনি আছে রাজনৈতিক স্বাধীনতার দাবি। আবার নারী অধিকার, সমকামী ও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের অধিকারের পাশে জায়গা পাচ্ছে পরিবেশ ও জলবায়ু ন্যায্যতার দাবিও। এখান থেকে এটা বোঝা যায়, পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে এই প্রজন্ম নিজেদের চিনতে পেরেছে।

একটা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন অনেক সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। হয়তো একটা প্রজন্ম দিয়েও সম্ভব নয়। কিন্তু ওয়েটহুডের শিকার এই প্রজন্ম সেই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটা শুরু করেছে।

খলিলউল্লাহ্, প্রতিচিন্তার সহকারী সম্পাদক
khalil.ullah@prothomalo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন