শ্রদ্ধাঞ্জলি

তাজউদ্দীন বিস্মৃতির অতলে হারাবেন না

বিজ্ঞাপন
default-image

৩ নভেম্বর ১৯৭৫। অন্যায়ভাবে কারারুদ্ধ মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সুদক্ষ পরিচালক। কাকডাকা ভোরে মাত্রই অজু করেছেন। এমন সময় জেলখানাতে তাঁকে ও তাঁর তিন সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে প্রথমে গুলি করা হলো, তারপর বেয়নেটে ক্ষতবিক্ষত করা হলো। নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হলেন আমার নানা ও বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ।

স্বামীর মৃত্যুর সংবাদে নানি জোহরা তাজউদ্দীনের চোখ থেকে অশ্রুবিন্দু ঝরে পড়ল। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতির ভয়াবহতা যতই হোক না কেন, দেশের জন্য ক্ষতিটা ছিল অনেক বেশি।

আমাদের এই সময়ের বাস্তবতায় অন্যের ক্ষতির বিনিময়ে সম্পদ ও ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে মানুষ ছুটছে। তাজউদ্দীন ছিলেন এর বিপরীত মানসিকতার মানুষ। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বলেছিলেন, ‘চলো, এমনভাবে কাজ করি, যেন ইতিহাসের পাতায় আমাদের খুঁজেই পাওয়া না যায়।’

তাজউদ্দীন আহমদ জন্মেছিলেন গাজীপুরের কাপাসিয়ার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। এমন সচ্ছল পরিবারে জন্মেছিলেন যে তাঁর জীবনসংগ্রামে জড়িয়ে পড়া এবং পরিণত বয়সের বেশির ভাগ সময় কারাবরণ করার দরকার ছিল না। তিনি তাঁর বাবার সরাসরি তত্ত্বাবধানে পবিত্র কোরআনে হাফেজ হয়েছিলেন। নিজের নৈতিক চরিত্র ও দৃষ্টিভঙ্গি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। শৈশবেই শান্তিকর্মী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বাল্যবন্ধুরা বলেন, তিনি সব সময় দ্বন্দ্ব এড়িয়ে যেকোনো সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের চেষ্টা করতেন। কিশোর বয়সে তিনি একবার তাঁর মায়ের অনুমতি নিয়ে এমন কিছু কলেরায় আক্রান্ত রোগীর জন্য রান্নাবান্না ও সেবা-শুশ্রূষার কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন, যাদের নদীর তীরে তাদের স্বজনেরা ফেলে রেখে গিয়েছিল। যেখানে অন্য কেউ ওই রোগীদের কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি, সেখানে তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাদের পরিচর্যা করেছিলেন।

 ১৯৫৯ সালে আমার নানা তাজউদ্দীন আহমদ আমার নানু জোহরা তাজকে বিয়ে করার আগে শর্ত দিয়েছিলেন, তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রামকে অবলীলায় সইতে হবে। তাঁদের বিয়েতে অলংকার ছিল না। সাধারণ বেলি ফুলের মালাবদল করে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। নানু আমাকে বলেছিলেন, ভয়াবহ প্রতিকূলতা আর করুণ সব পরিণতি জেনেও আরও এক শ জীবন যদি তাজউদ্দীনের সঙ্গে কাটাতে হতো, তবে তিনি তা-ও করতেন।

তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর কর্মীদের যত্ন নিতেন এবং তাদের সঙ্গে অত্যন্ত নম্রভাবে কথা বলতেন। আবার তিনিই ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণের ক্ষেত্রে ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও অবিচল। তাঁর চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ বিপরীতে, একবার মুজিবনগর অফিসে তাঁকে দেখা যাচ্ছিল না। পরে দেখা গেল, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ নিজের অফিসের একজন জ্বরাক্রান্ত কর্মচারীর মাথায় পানি ঢালছেন। অর্থমন্ত্রী থাকাকালে তিনি শুধু যোগ্যতার ভিত্তিতে এমন এক ব্যক্তিকে পদোন্নতি দিয়েছিলেন, যিনি পাকিস্তানের সামরিক হামলার সময় তাজউদ্দীনের আশ্রয়হীন স্ত্রীকে আশ্রয় দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

নৈতিক বিশুদ্ধতা, বিচক্ষণ মানসিকতা এবং অর্জিত জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ছিল তাঁর চরিত্রের এমন কিছু মৌলিক উপাদান, যা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে শাণিত করেছিল। ৬ দফাবিষয়ক একটি গণবিতর্কের দিনক্ষণ নির্ধারিত থাকলেও তাজউদ্দীনের মেধা ও বুদ্ধিমত্তার কাছে হার মেনে গণবিতর্ক শুরুর আগেই ঢাকা থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে দেশের প্রথম সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে বিক্ষিপ্ত নেতাদের একটি ঐক্যবদ্ধ কর্ম উদ্যানে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। গড়ে তোলা হয় মুক্তিবাহিনী। একটি অনভিজ্ঞ জাতির প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সযত্নে বাছাই করেছিলেন এমন কিছু ব্যক্তিকে, যাঁদের ছিল সর্বোচ্চ ধীশক্তি ও চারিত্রিক গুণাবলি। এঁদের অন্যতম একজন ছিলেন ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম। বাংলাদেশের প্রতি আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গি ও সহযোগিতার ব্যাপারে আমীর-উল ইসলামের দৃঢ়চেতা বক্তব্য আমেরিকার জনগণের কাছে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।

‘সোভিয়েত-ভারত চুক্তি’কে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে বিরোধীশক্তিকে যাঁরা নাস্তানাবুদ করেছিলেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন মঈদুল হাসান। যুদ্ধের সময় তাজউদ্দীন আহমদের সহকর্মী ও উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছিল ড. আনিসুজ্জামান, রেহমান সোবহান, স্বদেশ বোস, আইনজীবী নুরুল কাদেরসহ সেই সময়ের কতিপয় বিচক্ষণ, সমমনা ও নিবেদিত ব্যক্তির সমন্বয়ে।

যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি ভারতে আশ্রয় নেওয়া এক কোটি শরণার্থীর আশ্রয় এবং খাদ্যের তত্ত্বাবধান করেছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। পরবর্তী সময়ে তিনি বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারার কাছ থেকেও সম্মাননা লাভ করেছিলেন, যিনি তাজউদ্দীনকে বিশ্বের সেরা অর্থমন্ত্রী বলে ডাকতেন। এরপরও তৎকালীন রাষ্ট্র পরিচালনার সার্বিক দিকনির্দেশনা ও গতিপথের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে এবং সম্ভাব্য বিপদের যথার্থ পূর্বাভাস দিয়ে তাজউদ্দীন নীরবে পদত্যাগ করেছিলেন।

তাজউদ্দীন ছিলেন একজন উৎসুক মালি, যিনি বন্দিজীবনের শেষ সময়ে জেল প্রাঙ্গণে শতাধিক ফুলের গাছ লাগিয়েছিলেন। তিনি চলে যাওয়ার বহুদিন পরও নিজ নিজ সৌন্দর্যে বিকশিত হচ্ছিল তাঁর স্বহস্তে লাগানো জবা।

ঐতিহাসিক দিনগুলোতে যখন আমরা তাজউদ্দীনের মতো অবহেলিত জাতীয় বীরদের নিয়ে শোক প্রকাশ করি, তখন আমরা যেন তাঁদের জীবনের প্রতি আমাদের সর্বোচ্চ ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটাই এবং আমাদের নিজ নিজ জীবনে তাঁদের অনুসরণ করি। অন্যথায় তাজউদ্দীনের দেহের পাশাপাশি তাঁর আদর্শকেও সমাধিস্থ করা হবে।

তাজ ইমান আহমদ ইবন মুনির: প্রয়াত তাজউদ্দীন আহমদের নাতি, মানব উন্নয়ন সংগঠন জাগরণের প্রতিষ্ঠাতা

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন