default-image

জাতীয় প্রেসক্লাব মূলত সাংবাদিকদের যোগাযোগ রক্ষা, অবকাশ ও বিনোদনের জন্য প্রতিষ্ঠিত। তবে এ দেশে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন আন্দোলনেও প্রেসক্লাব অংশ নিয়েছে নিজস্ব পরিচয়ে। পরে সাংবাদিকদের ইউনিয়নগুলো দুই ভাগ হয়ে গেলে ঐক্যবদ্ধ একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রেসক্লাবের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

সাম্প্রতিক কালে দেশে উন্মুক্ত স্থানে সভা-সমাবেশের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পর প্রেসক্লাবের বিভিন্ন মিলনায়তন হয়ে দাঁড়ায় মুক্তবুদ্ধি চর্চার প্রাণকেন্দ্র। এগুলো কারা ব্যবহার করতে পারবে, তা প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটি (মূলত সম্পাদক ও সভাপতি) ঠিক করেন বলে এটিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

জাতীয় প্রেসক্লাবের ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচন শেষ হলো সম্প্রতি। চিরাচরিতভাবে এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত হলুদ প্যানেল এবং বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত গোলাপি প্যানেল। নির্বাচনে হলুদ প্যানেল সভাপতিসহ (ফরিদা ইয়াসমিন) ১১টি পদে এবং গোলাপি প্যানেল সাধারণ সম্পাদকসহ (ইলিয়াস খান) ৬টি আসন জয়লাভ করে।

বিজ্ঞাপন

গণমাধ্যমে এ নির্বাচনের ফলাফল বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়। কিছু সংবাদমাধ্যম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্যানেলের পরিচয় দেয় আওয়ামীপন্থী বা বিএনপিপন্থী হিসেবে। কিছু পত্রিকায় শুধু ফরিদা-ফারুক ও সবুজ-ইলিয়াস পরিষদ হিসেবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু গণমাধ্যমে হলুদ প্যানেলের পরিচয় দেওয়া হয় ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাংবাদিক ফোরাম’ হিসেবে, অন্য প্যানেলের পরিচয় দেওয়া হয় বিএনপি-জামায়াতপন্থী হিসেবে।

হলুদ প্যানেলের প্রচারপত্রে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ফোরাম বলা আছে বলে তাদের এ পরিচয় দেওয়া যেতে পারে হয়তো। তাহলে প্রশ্ন আসবে, অন্য প্যানেলের প্রচারপত্রে কি বলা হয়েছিল তারা বিএনপি বা জামায়াতপন্থী? না, বলা হয়নি (অন্য প্যানেলটি প্রচার–প্রচারণায় কখনো কখনো তাদের পরিচয় দেয় জাতীয়তাবাদী হিসেবে)। অর্থাৎ এখানে সংবাদ পরিবেশনায় একটি গ্রুপকে তাদের নিজস্ব প্রচারিত পরিচয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে, অন্য গ্রুপকে সাংবাদিকের নিজস্ব বিচার-বিবেচনায়।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন, প্রকৃত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে দেশ শাসন, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অসাম্প্রদায়িকতা। এগুলো আমার কথা না। এগুলো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে গণপরিষদ বিতর্ক হয়েছিল, তার মর্মবাণী।

এটি কোনো ক্ষুদ্র বিষয় নয়। কারণ, এর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রশ্ন জড়িত। দেশে এখন জাতীয় নির্বাচন থেকে ক্লাব পর্যায়ের নির্বাচনে এ পরিচয় ব্যবহার করে থাকে একটি পক্ষ। তাতে পরোক্ষভাবে হলেও এমন বার্তা দেওয়া হয় যে বাকিরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষ নয়। প্রেসক্লাবের নির্বাচনে এই চেতনার ব্যবহার শুরু হয়েছে অতি সম্প্রতি, ২০১৪ সালের বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের পর।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনার এই ব্যবহার যে কতটা বিভ্রান্তিকর, তার একটি বড় প্রমাণ ভোটের অঙ্ক। যেমন প্রেসক্লাবের নির্বাচনে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফোরামের’ ফরিদা ইয়াসমিন পেয়েছেন ৫৮১ ভোট। অথচ সাধারণ সম্পাদক পদে এ ফোরামেরই পরাজিত প্রার্থী পেয়েছেন তাঁর চেয়ে ১৮৭টি কম ভোট। অন্য ফোরামের প্রার্থীর কাছে তিনি পরাজিত হয়েছেন ১৭৩ ভোটে। অর্থাৎ শ দুয়েক ভোটার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফোরামের একজনকে ভোট দিয়েছেন, অন্যজনকে দেননি। অন্য কিছু পদেও এমন ঘটনা ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই যদি হয় প্যানেলে পরিচয়, তাহলে এই শ দুয়েক ভোটারের চেতনা কী? তাঁরা সভাপতিকে ভোট দেওয়ার সময় মুক্তিযুদ্ধের চেতনাপন্থী ছিলেন, সাধারণ সম্পাদককে ভোট দেওয়ার সময় চেতনাবিরোধী হয়ে গেলেন? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এতই ঠুনকো? স্বাধীন দেশে কাউকে ভোট দেওয়া বা না দেওয়াভিত্তিক?

বিজ্ঞাপন

২.

প্রেসক্লাব একটি ছোট উদাহরণ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে নির্বাচনের রাজনীতিতে টেনে আনার বড় প্রকাশ আমরা দেখি জাতীয় নির্বাচনগুলোয়।

এটা কতটা বিভ্রান্তিকর, তা নির্বাচনের হিসাবে বোঝা যাবে। এ দেশে যে চারটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে জাতীয় পর্যায়ে (১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮), তার দুটোতে বিএনপি বিজয়ী হয়েছে। তার মানে কি এ দেশে স্বাধীনতাবিরোধীদের সংখ্যা স্বাধীনতার পক্ষের সমান সমান! ২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনকালে সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনগুলোয় বিএনপির প্রার্থীরা প্রায় একচেটিয়াভাবে জয় পেয়েছিলেন। তার মানে তখন দেশে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী মানুষ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ! কী সাংঘাতিক কথা, লাখো শহীদের রক্ত দিয়ে অর্জিত একটি মহত্তম স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রতি কী ভয়াবহ অশ্রদ্ধা!

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা শব্দাবলির যথেচ্ছ ব্যবহারের আরও বহু নজির রয়েছে। পাকিস্তান ক্রিকেট টিমের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয়কে কখনো কখনো আখ্যায়িত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিজয় হিসেবে। তাহলে তার কাছে ক্রিকেটে হেরে যাওয়া কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরাজয়? এমন বালখিল্য অভিধার মানে কী? আমার নির্বাচনী এলাকায় (লালবাগ) সন্ত্রাসী, জমি দখলকারী, দুর্নীতিবাজদের পোস্টারে বড় বড় করে লেখা থাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তি তারা। আসলেই তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী?

এখন আমি যদি ভোট ডাকাতি করি, মানুষের সম্পদ লুণ্ঠন করি, অত্যাচার-নিপীড়ন করি আর নির্বাচনে দাঁড়িয়ে লিখে দিই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি, তাহলে আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী হয়ে গেলাম? আমি যদি এসবের সমর্থক হই, এসবের প্রতিবাদ না করি, তাহলেও কি আমি সেই চেতনাবাহী?

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা মানে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন, প্রকৃত জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে দেশ শাসন, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন, সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, অসাম্প্রদায়িকতা। এগুলো আমার কথা না। এগুলো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে যে গণপরিষদ বিতর্ক হয়েছিল, তার মর্মবাণী। এগুলো ১৯৭২ সালের সংবিধানের ছত্রে ছত্রে লেখা বিধান। এখন আমি যদি ভোট ডাকাতি করি, মানুষের সম্পদ লুণ্ঠন করি, অত্যাচার-নিপীড়ন করি আর নির্বাচনে দাঁড়িয়ে লিখে দিই মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ শক্তি, তাহলে আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহী হয়ে গেলাম? আমি যদি এসবের সমর্থক হই, এসবের প্রতিবাদ না করি, তাহলেও কি আমি সেই চেতনাবাহী? নির্বাচনের রাজনীতিতে চেতনার মনগড়া অপব্যবহার বিপজ্জনক বার্তা দেয় মানুষকে।

৩.

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বাগাড়ম্বর না করে বরং এটি ধারণ করার চেষ্টা আমাদের করা উচিত। যে কতটুকু চেতনা ধারণ করি, কাজেকর্মে তার প্রতিযোগিতা করা উচিত। এ প্রতিযোগিতা মানে গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, অসাম্প্রদায়িকতা প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা। এর একটিও বাদ দেওয়া নয়। আমি অসাম্প্রদায়িক কিন্তু ভোটচোর বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারী, তাহলে আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনেকাংশে ধারণ করতে পারিনি। আবার আমি গণতন্ত্রকামী কিন্তু দুর্নীতিবাজ বা সাম্প্রদায়িক, তাহলেও আমি এই চেতনা সঠিকভাবে ধারণ করতে পারিনি।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। এই চেতনা ধারণ করার প্রতিযোগিতা হোক কাজকর্মে। বিভেদে, বিভক্তিতে, বিভ্রান্তি সৃষ্টিতে বা বিষাক্ত চিন্তায় নয়।


আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন