default-image

দোহায় গত ১২ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত আন্ত-আফগানিস্তান আলোচনা শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে আফগান শান্তিপ্রক্রিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করেছিল। এতে তালেবান ও আফগান সরকারের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে একটি আলোচনা পর্ব শুরু করেছিলেন। কথা ছিল, এ দুই প্রতিনিধিদল প্রাথমিক আলোচনা করে মৌলিক বিষয়গুলোতে ঐকমত্যে পৌঁছালে উভয় পক্ষ পরবর্তী সময়ে আরও বড় আকারের প্রতিনিধিদল নিয়ে মূল সম্মেলনে মিলিত হবে।

কিন্তু দোহার ওই প্রাক্‌-সম্মেলন বৈঠকেই কিছু বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং সেসব বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় শান্তি আলোচনা থমকে গেছে। প্রধানত দুটি বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হতে পারেনি। একটি হলো আলোচনার মূল ধর্মীয় ভিত্তি হিসেবে হানাফি মাজহাবকে (ইমাম আবু হানিফার মতাদর্শ) গ্রহণ করার প্রস্তাব। তালেবানের দাবি ছিল, হানাফি মাজহাবকে আলোচনার ধর্মীয় ভিত্তি হিসেবে নিতে হবে। আফগান সরকার এ প্রস্তাবে সম্মত হতে পারেনি। আরেকটি হলো যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও তালেবানের মধ্যে আলোচনায় যে সিদ্ধান্তগুলো এসেছে, সেই সিদ্ধান্তগুলোকে আন্ত-আফগান আলোচনার ভিত্তি ধরা হবে কি না। আফগানিস্তানের বেশির ভাগ মানুষ সুন্নি মুসলমান এবং তারা হানাফি মাজহাবের অনুসারী। তালেবানের দাবি মেনে যদি মূল শান্তি আলোচনার ধর্মীয় ভিত্তি হিসেবে হানাফি মাজহাবকে গ্রহণ করা হয়, তাহলে দেশটির লাখ লাখ শিয়া মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুকে কার্যত আলোচনার কেন্দ্র থেকে বাদ রাখা হবে।

বিজ্ঞাপন

আফগান সরকার দেশটির সংবিধানের মৌলিক নীতির কথা উল্লেখ করে বলেছে, সরকার হানাফি মাজহাব অনুসরণ করে থাকে, তবে একই সঙ্গে শিয়া মুসলমান ও অন্যান্য সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতায় সরকার শ্রদ্ধাশীল। সরকার আলোচনার ক্ষেত্রে যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, তা দেশটির সংবিধানের ভিত্তিতেই অনুসৃত হয়েছে। কিন্তু তালেবান দেশটির বর্তমান সংবিধানকে অনৈসলামিক বলে খারিজ করে দিয়েছে।

তালেবানের এ প্রাথমিক আপত্তির বিষয়টি হতাশাজনক হলেও এর মাধ্যমে আফগানিস্তান নিয়ে তালেবানের প্রকৃত স্বপ্ন কী, তা প্রকাশ পেয়েছে। তালেবান আফগানিস্তানে সরকার গঠন করলে কীভাবে প্রশাসনব্যবস্থা চালাবে, নির্বাচন ও বিচারিক দর্শন থেকে শুরু করে বাক্‌স্বাধীনতা ও নারীর স্বাধীনতা ইস্যুতে তারা কীভাবে কাজ করবে, সেই প্রশ্ন দীর্ঘদিন ঝুলে আছে। এসব বিষয়ে তালেবানও আনুষ্ঠানিকভাবে তেমন কোনো আভাস দেয়নি। তবে ধীরে ধীরে তাদের অবস্থান পরিষ্কার হচ্ছে।

সরকারে তালেবানের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আফগানিস্তানের শিয়া ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে তালেবান স্বীকার না করায় তারা তাদের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে আতঙ্কে পড়ে গেছে। অন্য ধর্মের অনুসারীদের বিষয়ে তালেবানের দৃষ্টিভঙ্গি যে খুব একটা ভালো নয়, তা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৯৮ সালে তালেবান মাজার-ই-শরিফে হাজারা সম্প্রদায়ের কয়েক হাজার মানুষকে বেছে বেছে হত্যা করেছিল। হাজারা সম্প্রদায় প্রধানত শিয়া মুসলিম। ওই গণহত্যার সময় তালেবান হাজারাদের তিনটি বিকল্প পন্থার যেকোনো একটি বেছে নিতে বলেছিল। সেগুলো হলো: ‘হয় সুন্নি মুসলিম হও, নয়তো আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাও, নয়তো মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও।’ এ হাজারা সম্প্রদায় আফগানিস্তানে বহু বছর ধরে চরম বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়ে আসছে। এর বাইরে শিখ ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষও আছে। তালেবানের ঘাঁটি জোরালো হওয়ার কারণে এসব সম্প্রদায়ের অনেকেই এখন দেশ ছাড়া শুরু করেছে।

আফগানরা প্রায়ই শিয়া ও সুন্নির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা গর্বের সঙ্গে বলে থাকে। সীমান্ত এলাকার ধর্মীয় দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সঙ্গে তুলনা করলে এ কথা অনেকটা সত্য। মূলত যখন যেখানে তালেবান শক্তিশালী হয়েছে, সেখানেই এ দাঙ্গা বেড়েছে। গত কয়েক বছরে আফগানিস্তানে আইএসের বিস্তার ঘটেছে। আইএস এবং তালেবান পরস্পরকে শত্রু মনে করলেও এ দুই পক্ষই শিয়া এবং অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তাদের ‘কমন শত্রু’ মনে করে। কৌশলগত কারণে তালেবান ও আইএস একযোগে তাদের ওপর হামলা চালিয়ে থাকে।

নারীর শিক্ষালাভের অধিকার ও অফিস-আদালতে নারীর দায়িত্ব পালনকে তালেবান স্বীকার করে না। এ পর্যন্ত বহু বালিকা বিদ্যালয়ে তালেবানের হামলা চালানোর রেকর্ড আছে। সরকারে তাদের অংশীদারি প্রতিষ্ঠিত হলে সেটি নারীকে অনেক দূর পিছিয়ে নিয়ে যাবে। এ কারণে শেষ পর্যন্ত যদি তালেবানকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়, সে ক্ষেত্রে ক্ষমতার ভারসাম্য এমনভাবে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে না পারে। দোহা সম্মেলন আবার শুরু হলে অন্তত এ বিষয়টি আফগান সরকার যেন মাথায় রাখে।

সআল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ওসামা বিন জাভাইদ দোহাভিত্তিক সাংবাদিক ও লেখক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0