বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকীর সাক্ষাৎকারে কোনো ‘সরকার বা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র’ আছে, এমনটি সম্ভবত খোদ সরকারও বলবে না। উনি একটি মত প্রকাশ করেছেন। মতটি সঠিক বলে বিবেচিত না হলে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা মন্ত্রণালয় একটি বিবৃতি দিতে পারে। প্রবাসী আয় বা অর্থনীতি দেখাশোনা করেন, এমন রাজনৈতিক দায়িত্বশীলদের কেউ একজন আরেকটি সাক্ষাৎকার, প্রতিবাদলিপি বা মন্তব্য প্রতিবেদন পাঠিয়েও ব্যাপারটি শেষ করতে পারেন। এসব কিছু না করে অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকীকে অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কর্তৃক রীতিমতো ‘ব্যাখ্যা’ দিতে ‘তলব’ করা এবং ‘দুঃখ প্রকাশ করানোর’ মতো অবস্থা তৈরি করাটা উদ্বেগজনক।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গবেষণা ও ভিন্নমতের জবাব অধিকতর গবেষণা এবং আরেকটি ভিন্নমত দিয়েই দিতে হয়। চাপ সৃষ্টি করে বা জোরজবরদস্তি করে নয়। অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকীর ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুস্পষ্টভাবে নিরুৎসাহিত করবে। সংসদীয় কমিটির এ পদক্ষেপ একজন সংসদ গবেষক হিসেবে আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবেও পীড়াদায়ক।

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ২০২(১) বিধিতে সংসদীয় কমিটিগুলোকে যেকোনো ব্যক্তি, বিশেষজ্ঞ, তথ্য বা দলিল চেয়ে নোটিশ বা সমন জারি করার এখতিয়ার দেওয়া আছে। ২৪৮ বিধিতে মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলোকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা এ–সম্পর্কিত যেকোনো বিষয়ে অনুসন্ধান করার এখতিয়ার দেওয়া আছে। সাধারণভাবে সংসদীয় কমিটির আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া নাগরিকের কর্তব্য। রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বশীল প্রতিষ্ঠান হিসেবে শাসনযন্ত্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করার গুরুদায়িত্ব সংসদের এবং সংসদীয় কমিটিগুলোর। এ ক্ষেত্রে সরকারি আমলাদের বা পদধারীদের প্রয়োজনে তলব করে হাজির করানোর ক্ষমতা সংসদের আছে বলেই ধরে নিতে হবে।

তবে কার্যপ্রণালি বিধির ২০৩ বিধি অনুসারে কোনো সমন বা তলবের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সেটির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার স্পিকারের। ২০৩ বিধিতে বলা হয়েছে, এ ধরনের প্রশ্ন স্পিকারের কাছে পাঠানো হবে। ধারণা করা যেতে পারে, কাজটি কমিটির সভাপতি বা সদস্য, অথবা সরকারের কোনো মন্ত্রণালয় বা কর্মকর্তাকে ডাকা হলে তাঁরা কেউ করবেন। সাধারণ নাগরিকদের কাউকে ডাকা হলে তাঁর পক্ষ থেকে স্পিকারের কাছে আপত্তি জানানোর সুযোগ নেই বলেই প্রতীয়মান হয়। কারণ, স্পিকার বিচারিক আদালত নন। সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বে জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত। সংবিধান অনুসারে কাউকে জোর করে বা চাপ দিয়ে জবানবন্দি নেওয়ার বা বক্তব্য আদায় করানোর সুযোগ নেই। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রতিষ্ঠিত জুরিসপ্রুডেন্স বলছে, সংসদীয় কমিটি বা এমনকি জাতীয় সংসদ নিজেও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার বাইরে নয়।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গবেষণা ও ভিন্নমতের জবাব অধিকতর গবেষণা এবং আরেকটি ভিন্নমত দিয়েই দিতে হয়। চাপ সৃষ্টি করে বা জোরজবরদস্তি করে নয়। অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকীর ঘটনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সুস্পষ্টভাবে নিরুৎসাহিত করবে। সংসদীয় কমিটির এ পদক্ষেপ একজন সংসদ গবেষক হিসেবে আমার জন্য ব্যক্তিগতভাবেও পীড়াদায়ক।

বাংলাদেশের মতো যুক্তরাষ্ট্রও একটি সাংবিধানিক সার্বভৌমত্বের দেশ। মার্কিন কংগ্রেসের বিভিন্ন কমিটি অহরহ বিভিন্ন অনুসন্ধান, তদন্ত করে। বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার বিশেষজ্ঞ, সাক্ষী বা এমনকি কোনো কোনো অভিযুক্তকেও কমিটির সামনে আসতে সমন দেওয়া হয়। মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট কাউকে সমন জারি করে কমিটির সামনে হাজির করানো অথবা কেউ সমন অবজ্ঞা করলে তাঁর ব্যাপারে সংসদ অবমাননার অভিযোগে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাকে কংগ্রেসের অন্তর্নিহিত এখতিয়ার বলে স্বীকার করেন। তবে ১৯৫৭ সালের ওয়াটকিনস বনাম যুক্তরাষ্ট্র, ১৯৬১ সালের উইলকিনসন বনাম যুক্তরাষ্ট্র, এবং ১৯৭৫ সালের ইস্টল্যান্ড বনাম যুক্তরাষ্ট্র মামলায় মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এটিও প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছেন যে কংগ্রেসের সমন জারি করার এখতিয়ার নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের বাইরে নয়। কংগ্রেসের সমনটি অবশ্যই এর এসেনশিয়াল লেজিসলেটিভ বিজনেসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

শুধু কংগ্রেসের সমালোচনা বা কংগ্রেসের রাজনৈতিক ব্যক্তিদের জন্য রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর কোনো কাজ, তথ্য প্রকাশ বা বক্তব্যের জন্য কোনো সাধারণ নাগরিককে তলব করে কৈফিয়ত দাবি করার এখতিয়ার কংগ্রেসের বা কংগ্রেসীয় কমিটির নেই। বাস্তবতা হচ্ছে মার্কিন কংগ্রেস গত কয়েক দশকের ইতিহাসে কোনো সমন অমান্যকারীকে সংসদ অবমাননার অভিযোগে অভিযুক্ত করে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টাও করেনি।

পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো সংসদ ব্রিটিশ পার্লামেন্টও একই চেতনা ধারণ করে। মার্কিন কংগ্রেস বা আমাদের জাতীয় সংসদের তুলনায় ব্রিটিশ পার্লামেন্ট অধিকতর শক্তিশালী। ওখানে সংবিধান নয়, সংসদীয় সার্বভৌমত্ব চলে। তারপরও ইতিহাস বলছে, হাউস অব কমন্স সর্বশেষ কাউকে সংসদ অবমাননার অভিযোগে শাস্তি দিয়েছে সেই ১৬৬৬ সালে। ২০১৩ সালে হাউস অব কমন্স ও হাউস অব লর্ডসের যৌথ উদ্যোগে গঠিত একটি সংসদীয় কমিটি (জয়েন্ট কমিটি অন পার্লামেন্টারি প্রিভিলেজ) সংসদ অবমাননাকে ফৌজদারি প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করার চেষ্টা থেকে বিরত থাকার কথা বলেন।

আসল কথা হলো, সংসদীয় কমিটির পক্ষ থেকে কোনো নাগরিককে তলব করার এবং কৈফিয়ত চাওয়ার ক্ষমতা অস্বীকার করা না হলেও এ ক্ষমতার সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা স্বীকৃত। এ ধরনের তলব করা ও কৈফিয়ত চাওয়ার সঙ্গে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা (সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ), জোরপূর্বক বক্তব্য বা স্বীকৃতি আদায় থেকে রক্ষা পাওয়ার স্বাধীনতা (সংবিধানের ৩৫ (৪) অনুচ্ছেদ), বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন, গবেষণা, চিন্তা ও মতপ্রকাশের একাডেমিক স্বাধীনতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে সাংবিধানিক আদালতের এখতিয়ারের প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত। তা ছাড়া কোনো সরকারি তথ্য ও পরিসংখ্যান নিয়ে কোনো নাগরিকের দ্বিমত থাকলে তাঁর কৈফিয়ত তলব করা সংসদীয় কমিটির কাজ কি না অথবা সেটি সংসদের এসেনশিয়াল লেজিসলেটিভ বিজনেস কি না, সে প্রশ্নও ব্যাপকভাবে আসতে পারে।

আলোচ্য সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকী সংসদ অবমাননা করেছেন বলে কোনো অভিযোগ নেই। গণতন্ত্রে সংসদ নামের প্রতিষ্ঠানটিই যেখানে মত, দ্বিমত ও ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ অবারিত রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত, সেখানে এ ধরনের ‘তলব’ খুব উদ্বেগজনক। কারণ, রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়সংক্রান্ত ইস্যুতে অধ্যাপক তাসনীম সিদ্দিকীর মন্তব্যে নির্বাহী বিভাগ বা মন্ত্রণালয় ক্ষুব্ধ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় যদি অধ্যাপক সিদ্দিকীর ওপর কোনো চাপ সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে ওই মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির দায়িত্ব হবে তাঁকে বরং সুরক্ষা দেওয়া। সংবিধানে সংসদ আছে নির্বাহী বিভাগের সমালোচনাকে উৎসাহিত করে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে। সংসদীয় কমিটিগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নির্বাহী বিভাগের সমালোচকদের চাপে রাখা নয়।

এম জসিম আলী চৌধুরী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ, লন্ডনের সংসদবিষয়ক পিএইচডি গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন