বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তিন মাস আগে কমলা জানতে পারেন, তাঁর শরীরে ভয়ংকর ঘাতক ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। তিনি জানতেন, খুব বেশি দিন আর তাঁর আয়ু নেই। কিন্তু আসন্ন শূন্যতা নিয়ে তিনি প্রায়ই কৌতুকে মেতে উঠতেন। হাসপাতালে, তাঁর শেষ দিনটাতে তিনি বেঁচে থাকার জন্য খুব শক্তভাবে লড়াই করেছিলেন। চুল পরিপাটি করে বেঁধে দিতে এবং পায়ের নখ নেলপলিশ দিয়ে রাঙিয়ে দেওয়ার আবদার করেছিলেন। এর পরের দিন তিনি হাসপাতাল ছেড়ে বাড়িতে ফিরলেন। ততক্ষণে তাঁর জীবনের স্পন্দন থেমে গেছে। কিন্তু মুখে সেই স্বভাবসিদ্ধ হাসির এতটুকু ম্লান হয়নি। হাসির আড়ালে চাপা পড়া দুষ্টুমিটুকুও যেন উঁকি দিচ্ছে।

৪০ বছর আগের কথা। দিল্লির নারীবাদী আন্দোলনের মঞ্চে কমলা ভাসিনের আবির্ভাব সে সময়েই। যৌতুকবিরোধী একটা প্রতিবাদে তাঁর স্বামী ও কন্যাকে নিয়ে একাই দাঁড়িয়েছিলেন। সেই শুরু, কিন্তু শিগগিরই আমাদের অভিযাত্রায় তিনি নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠলেন। পরবর্তীকালে ওম স্বাহা পথনাটকে তিনি সূত্রধরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। নেচে–গেয়ে ডমরু বাজিয়ে, হাসির ছড়া বলে নিষ্ক্রিয় দর্শক ও আশপাশের কৌতূহলী মানুষকে নাটকে টেনে নিয়ে আসতেন। কারও জামা, কারও দোপাট্টা নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত মন্তব্য ছুড়ে দিতেন। এতে তাঁরা যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, সেই অনুভূতিটা তাঁদের মধ্যে জাগিয়ে দিতেন। আমার কাছে মনে হয়, পরবর্তী জীবনে তিনি যে তৃণমূলের কর্মী এবং আন্তর্জাতিক স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমান গুরুত্ব ও সহজভাবে যোগাযোগে পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন, সেটার বীজ নাটকে তাঁর অভিনয়ের মধ্যেই প্রোথিত ছিল।

নারীবাদ সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান যে বিষয়টি আমাদের দিয়েছে, কমলার জীবন নিজেই সেটার একটা স্মারক। সেটা হলো নারীদের মধ্যকার বন্ধুত্বের শক্তি। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীতে একজন নারীবাদীর মৃত্যু মানে সমাজের ক্ষতি—এভাবে দেখার ঘটনা খুবই বিরল।

খাদ্য ও কৃষি সংস্থায় তিনি যখন কাজ করতেন, তাঁর কার্যালয় ছিল দিল্লির জাতিসংঘ ভবনে। একজন নারী, যিনি রাস্তা দাপিয়ে বেড়াতে অভ্যস্ত, তাঁর জন্য এ ধরনের পরিবেশে কাজ করা ভীষণ অস্বস্তিজনক। কিন্তু কমলার কাজের ক্ষেত্র ছিল পুরো দক্ষিণ এশিয়া। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তিনি স্থায়ী বন্ধুত্ব ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীবাদকে তিনি গতি দিতে পেরেছিলেন। সেটা তিনি করেছিলেন তাঁর দুর্দান্ত ও ভয়ংকর নারীবাদী সব ‘অস্ত্রশস্ত্র’ দিয়ে। হাসি, আনন্দ, বন্ধুত্ব, গান, স্লোগান, শিল্প, নাচ, বই কিংবা এ রকম আরও কিছু দিয়ে তিনি তা করেছিলেন। নৃত্যশিল্পী চন্দ্রলেখার সঙ্গে তিনি নারীবাদী পোস্টার তৈরির কয়েকটি কর্মশালা আয়োজন করেছিলেন। এ ধরনের একটি কর্মশালা থেকে নারীবাদী অঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠা ‘এক যোগ-এক সমান ১১’ পোস্টারটি সৃষ্টি হয়েছিল।

জাগরী নামে একটি সংস্থা এবং প্রচারাভিযান তিনি শুরু করেছিলেন। সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য সংঘাত নামে একটি নারীবাদী ধারণা শুরু করেছিলেন। ‘১০০ কোটি জাগরণ’ নামে তাঁর একটি প্রচারাভিযান ছিল। নারী আন্দোলনের প্রতি উৎসাহ ও অঙ্গীকার তাঁর কাছে নিজের গৃহ ও সন্তানের থেকে ভিন্ন কিছু ছিল না। ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি যেমন মেয়ের মৃত্যু কিংবা ছেলের সারা জীবনের অসুস্থতা—কোনো কিছুই তাঁকে এ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। প্রতিবারই মুখের হাসিটুকু অটুট রেখে তিনি ফিরে এসেছেন, যদিও তাঁর হৃদয় তখন ব্যথায় পূর্ণ। কমলা ভাসিনের জীবনের প্রিয় একটি উক্তি হচ্ছে, ‘কেউ ভালোবাসায় পড়ে না, ভালোবাসায় ওঠে’।

নারীবাদ সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান যে বিষয়টি আমাদের দিয়েছে, কমলার জীবন নিজেই সেটার একটা স্মারক। সেটা হলো নারীদের মধ্যকার বন্ধুত্বের শক্তি। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক পৃথিবীতে একজন নারীবাদীর মৃত্যু মানে সমাজের ক্ষতি—এভাবে দেখার ঘটনা খুবই বিরল। গত কয়েক মাসে বেশ কয়েকজন নারীবাদীকে আমরা হারিয়েছি। তাঁরা এমন একটি বিশ্ব, বিশেষ করে নারী আন্দোলন বিশ্ব ছেড়ে গেলেন, যেটা একই সঙ্গে সমৃদ্ধ ও দরিদ্র। তাঁরা তাঁদের জীবন ও জীবনের যা কিছু অর্জন, উদারভাবে বিলিয়ে দিয়ে নারীবাদী বিশ্বকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। আবার তাঁদের শূন্যতা সেই বিশ্বকে দারিদ্র্য করে দিয়ে গেল।


ইংরেজি থেকে অনূদিত, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে নেওয়া

উর্বশী বুতালিয়া ভারতীয় নারীবাদী লেখক, প্রকাশক ও আন্দোলনকর্মী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন