default-image

মনটা বিষণ্ন ও ভারাক্রান্ত। দেশ-বিদেশ থেকে কেবল ফোন পাচ্ছি হাসপাতালে বেড, আইসিইউ ব্যবস্থা করার জন্য। প্রথমে অর্থনীতি বিভাগের বন্ধু ও সরকারি চাকরিতে ব্যাচমেটের জন্য। চেনাজানা হাসপাতালমালিক, ডাক্তারকে ফোন করি। সবারই একই কথা বেড, রুম, আইসিইউ কোনোটাই খালি নেই। সহকর্মীর মেয়ে অবশ্য একটা ব্যবস্থা করতে সমর্থ হয় তার বাবার জন্য। এরই মধ্যে কানাডা থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক সহকর্মীর ফোন। তঁার ভাই, বাবা ও পরিবারের অনেকেই করোনায় আক্রান্ত। অনুরোধ একই, হাসপাতালের ব্যবস্থা করা যায় কি না।

করোনায় আক্রান্ত মুক্তিযোদ্ধার বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু

এর মধ্যেই বুকে শেল হয়ে বিঁধল বাংলাদেশ ব্যাংকে আমার সাবেক সহকর্মী, সাবেক নির্বাহী পরিচালক চৌধুরী মহিদুল হক ওরফে বাবুর করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটে কোথাও কোনো স্থান না পেয়ে প্রায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর সংবাদ। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও করোনায় আক্রান্ত, স্ত্রী হাসপাতালে। ভাবিকে নাকি স্বামীর মৃত্যুর সংবাদ এখনো দেওয়া হয়নি।

চৌধুরী মহিদুল হক ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। আমাদের এই ব্যাচের পাঁচজন ডেপুটি গভর্নর হয়েছিলেন। চৌধুরী মহিদুল হকও ডেপুটি গভর্নর হওয়ার জন্য চেষ্টা করেছিলেন, পরীক্ষাও দিয়েছিলেন, কিন্তু উত্তীর্ণ হননি। এস কে সুরদের তখন ডেপুটি গভর্নর করা হয়, যাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে লুটপাটের সুযোগ অবারিত হয়! স্পষ্ট বক্তা হিসেবে তাঁর কিছু বদনামও ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বলি হন তিনি।

কারেন্সি বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত নির্বাহী পরিচালক হিসেবে বঙ্গবন্ধু সিরিজের নোট করার উদ্যোগ তিনি প্রথম নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে নোটের সিরিজ করার ব্যাপারে তিনি টাঁকশালের এমডির সঙ্গে একান্তে মিটিং করে তৎকালীন গভর্নরের সঙ্গে দেখা করেন। চৌধুরী মহিদুল হকের নির্দেশনায় টাঁকশালে ডিজাইন, নোটের নকশা অর্থাৎ কোথায় কোন ছবি দিতে হবে, কীভাবে নকশা করতে হবে, তার কাজ শুরু হয়। তৎকালীন একজন ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে ডিজাইন অ্যাডভাইজারি কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটিতে দেশের প্রখ্যাত আর্টিস্টরা ছিলেন। সবশেষে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি নিয়ে ডিজাইন চূড়ান্ত করা হয়।

বিজ্ঞাপন

চৌধুরী মহিদুল হক বঙ্গবন্ধু সিরিজ নোটের উদ্যোক্তা হলেও এই নোটগুলোর উদ্বোধনের দিন তাঁকে ডাকা হয়নি। এ জন্য তাঁর ক্ষোভ ছিল। বলা যায়, আওয়ামী লীগের অন্ধ সমর্থক ছিলেন মহিদুল। এ জন্য আমরা তাঁকে খ্যাপাতাম। মহিদুলের সাফ জবাব ছিল, ‘তোমরা মাথা দিয়ে চিন্তা করো, যুক্তি, বুদ্ধি ইত্যাদি দিয়ে। আমি ভাবি আমার অন্তর দিয়ে, আমার আবেগ ও দেশাত্মবোধ দিয়ে।’ স্পষ্টভাষিতার জন্য আমরা তাঁর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেও তাঁকে শ্রদ্ধা করতাম।

ইতিমধ্যে জেনেছি, রাষ্ট্রীয় সম্মান জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত স্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। কিন্তু এর আগে কি কিছু করা যেত না? সিএমএইচ, সরকারি হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কিছু আসন কি সংরক্ষণ করা যেত না? এ যেন সে গানের মতো, ‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল’। যাহোক, চৌধুরী মহিদুল হক এখন আমাদের এসব বিবেচনার ঊর্ধ্বে। আমরা কেবল তাঁর দুর্ভাগ্যের জন্য আক্ষেপই করতে পারি। এটা তাঁর প্রাপ্য ছিল না। চাকরিজীবনের বঞ্চনা মৃত্যুকালেও তাঁর অনুষঙ্গী হলো, এটাই আমাদের দুঃখ। তাঁকে আমাদের অভিবাদন জানাই ও তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

‘লকডাউনের’ ঘোষণা

এদিকে করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। আজ সকালে অনলাইন ক্লাসে এক ছাত্রী জানাল, তার করোনা টেস্ট পজিটিভ। এর আগে একজন ছাত্র তার বাবার আক্রান্ত হওয়ার সংবাদ দিয়েছে। ফেসবুকের পাতায় কদাচিৎ ঢুকলেও সেখানে কেবল আক্রান্ত হওয়ার আর মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘতর হওয়ার দুঃসংবাদ। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘লকডাউনের’ ঘোষণা এসেছে।

কিছু মানুষ লকডাউনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন, এমনকি অনেকে অমান্য করছেন। আবার বিভিন্ন সরকারি সিদ্ধান্তের স্ববিরোধিতার কথাও বলছেন কেউ কেউ।

বিজ্ঞাপন

রাজনীতির বাম্পার ফলন

করোনার প্রাদুর্ভাবের পাশাপাশি রাজনীতিরও বাম্পার ফলন ঘটছে। বার্ষিকী, জয়ন্তী, উৎসব কিছুই বাদ যায়নি। শোনা যায়, এসব অনুষ্ঠানে সহস্রাধিক কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এসব অনুষ্ঠান কাটছাঁট করে তা করোনা মোকাবিলায় লাগানো যেত। এ ছাড়া মোদিবিরোধী মিছিল, প্রতিহতকারীদের মিছিল, সংঘর্ষ, সম্পত্তির ক্ষতি, গুলি, লাশ সবই পড়ছে। চলেছে একে অপরকে দোষারোপের অসুস্থ প্রতিযোগিতা।

শেষ বাঁশি বাজার আগেই করোনার বিরুদ্ধে জয়ের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে। প্রচার করা হচ্ছে কাল্পনিক সাফল্যের। অথচ করোনার জন্মবার্ষিকী শেষ হয়েছে বেশ আগেই। সময় ছিল হাসপাতাল, চিকিৎসা সরঞ্জাম জোগাড় করার। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার। বিশেষজ্ঞরা বারবারই হুঁশিয়ারি দিয়ে আসছেন, করোনা নিঃশেষ হয়ে যায়নি। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ঢেউ আসতে পারে। আমরা ব্যস্ত থেকেছি রাজনীতি, কূটনীতি এসব নিয়ে।

শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সবাই মেতে আছে রাজনীতি নিয়ে। মহাসমারোহে হয়ে গেল বিজিএমইএ নির্বাচন। অথচ এবারই প্রয়োজন ছিল সমঝোতা করে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের প্রার্থীদের নিয়ে কমিটি করার। তাতে যা খরচ ও সময় বাঁচত, তা দিয়ে হাসপাতালে বেশ কটি ভেন্টিলেটর সরবরাহ করা যেত, শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া যেত। কিন্তু বিজিএমইএ নির্বাচন এখন জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতিক্ষেত্র! গত দুবার সেখান থেকে ঢাকা উত্তরের মেয়র এসেছেন।

অথচ রাজনীতির লক্ষ্য হলো জনকল্যাণ। আগে ছাত্রাবস্থায় দেখেছি, দুর্যোগ এলেই ছাত্র, যুবক, রাজনৈতিক সংগঠন সবাই দুর্গতদের সাহায্যে নেমে পড়ত। এখন, ছাত্র, যুব ও দলীয় রাজনীতি টেন্ডার ও পারস্পরিক হানাহানিতে সীমিত হয়ে পড়েছে। সংসদ চলছে, পরদিনই সাংসদ মৃত্যুবরণ করছেন। ইসলামের হেফাজতকারীরা এখন পর্যটনকেন্দ্রে। করোনার সংক্রমণ কমাতে ‘লকডাউন’ দেওয়া হয়েছে ভালো কথা। কিন্তু যারা দিনে আয় দিনে খায়, তাদের পরিবারের কী হবে? তাদের সংসারের অন্য খরচই–বা কীভাবে চলবে?

সামনের করণীয়

পরিস্থিতি যখন এমন গুরুতর, অসাধারণ ব্যবস্থা নিতে হবে। দলীয় রাজনীতির ওপর ‘লকডাউন’ দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে কিছুদিনের জন্য। সংসদ, মিটিং, মিছিল, বিবৃতি সবকিছু বাদ দিয়ে আমাদের সর্বশক্তি নিয়োজিত হোক অতিমারি নিয়ন্ত্রণে—এটাই হোক আমাদের সব কাজের কেন্দ্রবিন্দু। আগে মানুষ বাঁচুক, তারপর রাজনীতি।

ক. দ্রুত লকডাউন তুলে নিতে হবে। ভবিষ্যতে যাতে লকডাউন দেওয়ার পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়, সে লক্ষ্যে কাজ করতে হবে।

খ. স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।

গ. হাসপাতালগুলোতে বেড ও আইসিইউর সংখ্যা বাড়াতে হবে। আরও ভেন্টিলেটর ও হাই ফ্লো অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে।

ঘ. অভাবগ্রস্তদের খাবার ও নগদ অর্থ পৌঁছে দিতে হবে।

ঙ. টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়া দ্রুততর করতে হবে। ‘গ্যাভির সহায়তায় অন্য টিকা যেমন জনসন, সিনোভ্যাক্স, স্পুতনিক সংগ্রহের উদ্যোগ নিতে হবে। টিকা প্রদানের গতি বাড়াতে হবে।

চ. সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দ্রুত খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের আর সময় নষ্ট না হয়।

এ সবকিছুই করতে হবে ভিন্নমত প্রকাশের সব পথ উন্মুক্ত ও দলন-নিপীড়ন বন্ধ রেখে। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি নাগরিক উদ্যোগ নিতে হবে। ছাত্রসংগঠন, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় দলগুলো, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে এ জন্য এগিয়ে আসতে হবে। এবং তা করলেই ছাত্রসংগঠনগুলো, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা তাঁদের হৃত ভাবমূর্তি ফেরত পেতে পারেন। কেবল তখনই রাজনীতির ওপর ‘লকডাউন’ তুলে নেওয়া যেতে পারে।

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন