default-image

দেবীলাল বুরদক ও স্বরূপ রাম নামে দুই ব্যক্তি কৃষক আন্দোলন নিয়ে ‘ফেক ভিডিও’ সামাজিক মাধ্যমে ‘শেয়ার’ করেছিলেন—এ অভিযোগে পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ এনেছিল। দিল্লির অতিরিক্ত দায়রা জজ ধর্মেন্দ্র রানা সম্প্রতি তাঁদের জামিন দেওয়ার সময় বলেছেন, দেশদ্রোহ আইন অতীব শক্তিশালী এক হাতিয়ার। যত্রতত্র তার ব্যবহার ঠিক নয়।

বিচারকের মন্তব্য বিজেপিশাসিত পুলিশকে আদৌ সংযত করবে কি না, বলা কঠিন। কেননা, ইদানীং দেশদ্রোহের অভিযোগ দাখিল হচ্ছে মুড়ি–মুড়কির মতো। শুধু কৃষক আন্দোলন নিয়ে দেশদ্রোহের কত মামলাই না দায়ের হলো! ২৬ জানুয়ারি দিল্লির লাল কেল্লায় তুলকালাম ঘটার পর ২২ জন কৃষকনেতার বিরুদ্ধে দিল্লি পুলিশ দেশদ্রোহের অভিযোগ আনে। তারও আগে, দিল্লি সীমান্তে কৃষকদের ধরনায় যাওয়ার অপরাধে কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধেও ওই ধারা চাপানো হয়। কৃষক আন্দোলন নিয়ে টুইটে ‘টুলকিট’ (যার মাধ্যমে আন্দোলনের খবর গণমাধ্যমে ছড়ানো যায়) ব্যবহারের অপরাধে বেঙ্গালুরু থেকে ধৃত ২২ বছরের কলেজছাত্রী দিশা রবির বিরুদ্ধেও দেশদ্রোহের মামলা হয়েছে। দিশার সঙ্গে আরও দুই পরিবেশকর্মী নিকিতা জেকব ও শান্তনু মুলুককে ধরতে ওত পেতে আছে দিল্লি পুলিশ। বম্বে হাইকোর্টের কৃপায় আপাতত তাঁরা কিছুদিনের জন্য শ্বাস নিতে পারছেন। বিচারক ধর্মেন্দ্র রানার নির্দেশ এঁদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কারণ, এঁদের ‘অপরাধ’ আর যা–ই হোক, দেশদ্রোহের তুল্য হতে পারে না।

বিজ্ঞাপন
দিশার গ্রেপ্তার ভারতের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আরও এক পরীক্ষা

‘ফ্রি স্পিচ কালেকটিভ’–এর পক্ষে করা এক গবেষণার নির্যাস বলছে, ২০১০ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ভারতে ১৫৪ জন দেশি সাংবাদিককে বিভিন্ন কারণে শোকজ, আটক, জিজ্ঞাসাবাদ ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর বাইরে রয়েছেন ৯ জন বিদেশি সাংবাদিক, যাঁদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কেউ বিতাড়িত, কাউকে–বা পুলিশ জেরা করেছে। দেশদ্রোহের বাইরে রয়েছে বেআইনি কাজকর্ম রোধ আইন বা ‘ইউএপিএ’, যাতে ধরা হলে ছাড়া পেতে দেড়–দুই বছরের ধাক্কা। এই আইনে আটক রয়েছেন তিন সাংবাদিক, একজনের যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে ফৌজদারি মানহানি ও আদালত অবমাননার মামলা। কুনাল কামরা নামে এক কৌতুকশিল্পীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আদালত অবমাননার মামলা ঝুলছে। আরও কয়েকজন জামিনে মুক্ত। সংক্ষেপে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রীতিমতো প্রশ্নবিদ্ধ।

লক্ষণীয়, সাংবাদিকদের ওপর অভিযোগ ও মামলার এই খতিয়ানের ৪০ শতাংশ ঘটেছে শুধু ২০২০ সালে। হয়রান হয়েছেন ৬০ জনের বেশি সাংবাদিক। পরিসংখ্যান আরও বলছে, ২০১৪ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে ১৯৮টি। শুধু ২০১৯ সালেই ৩৬টি।

বিরুদ্ধবাদীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দমনের অভিযোগের পাশাপাশি দেশজুড়ে প্রবলভাবে আলোচিত সরকার–সমর্থক সাংবাদিকদের প্রতি সরকারি বদান্যতা ও দাক্ষিণ্যের অভিযোগ। সরকার–সমর্থক এক সর্বভারতীয় নিউজ চ্যানেলের মালিক, সম্পাদক ও সাংবাদিক বেশ কিছুদিন ধরে নিজেই খবরের শিরোনামে। তাঁর বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়া ও প্রভাব খাটিয়ে টেলিভিশন রেটিংয়ে কারচুপি ঘটিয়ে বিপুল বিজ্ঞাপন আদায়ের অভিযোগে দুটি মামলা চলছে। এক মামলায় অন্যরা জেলে থাকলেও ওই অনুগত মুক্ত। প্রহরায় সরকারি নিরাপত্তারক্ষী!

একই ধরনের দাক্ষিণ্য ও নিরাপত্তা পাচ্ছেন এক অভিনেত্রীও, যিনি সরকার–সমর্থক এবং বিরুদ্ধবাদীদের গালমন্দে সদা তৎপর। অনুগত সংবাদজীবীদের বিরোধীরা ইদানীং ‘গোদি মিডিয়া’ বলছেন। ‘গোদি’ শব্দের বঙ্গার্থ ‘কোল’। এই ভাগাভাগি দিন দিন শুধু প্রকটতরই হচ্ছে না, বেড়ে চলেছে তার পরিধি ও ব্যাপ্তি। যত বাড়ছে, তত ঘা পড়ছে বাক্‌স্বাধীনতার ওপর। দিশা রবির মতো ২২ বছর বয়সী পরিবেশ আন্দোলন কর্মীকে দেশদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে সম্ভবত এই বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, সরকার কাউকেই রেয়াত করবে না। নির্দয় ও নির্মম হতেও দ্বিধা করবে না।

দিশাদের মতো ইদানীং যাঁরা সরকারি বিড়ম্বনার কারণ, প্রধানমন্ত্রীর চোখে তাঁরা ‘আন্দোলনজীবী’। এই কয়েক বছরে আমরা ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ শুনেছি, ‘খান মার্কেট গ্যাং’ শুনেছি, ‘গুপকর গ্যাং’ শুনেছি, এবার শোনা গেল ‘আন্দোলনজীবী’। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, এঁরা ‘পরজীবী’। আন্দোলন আঁকড়ে বাঁচেন। দিশার বিরুদ্ধে নকশাল বা সন্ত্রাসীদের সরাসরি কোনো যোগাযোগ পাওয়া যায়নি। কিন্তু যেহেতু তিনি এমন একটা ‘টুলকিট’ ব্যবহার করেছেন, সম্পাদনাও, যার সঙ্গে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী ‘খলিস্তানিদের’ নাকি যোগসাজশ আছে, তাই তিনি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্রান্তের সঙ্গী! অতএব ‘দেশদ্রোহী’!

বিজ্ঞাপন

দিশার কপালে দেশদ্রোহের এই সিলমোহর মারার একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, লেখক ও নিখাদ ক্রিকেটপ্রেমী রামচন্দ্র গুহ। দিশা যে শহরে গ্রেপ্তার হন, রামচন্দ্র সেই বেঙ্গালুরুর বাসিন্দা। সরকার কী বার্তা দিতে চায়, ছয়টি ব্যাখ্যায় তা বুঝিয়ে তিনি বলতে চেয়েছেন, এটাই বর্তমান ভারতের নব অধ্যায়!

রামচন্দ্র গুহর প্রথম ব্যাখ্যা, দেশে নেতৃত্বের ভাবনার বাইরে অন্য কোনো স্বতন্ত্র ভাবনার অস্তিত্ব থাকবে না। ভারতবাসীকে হতে হবে অনুগত ও বাধ্য, যা নেতৃত্বের কর্তৃত্ব দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করবে। ‘গোদি মিডিয়াকে’ রক্ষা ও ‘নিউজক্লিক’–এর মতো স্বাধীনচেতা মিডিয়াকে চাপে রাখা এরই অঙ্গ।

দ্বিতীয়ত, বর্তমান শাসককুল ২০–৩০ বছরের স্বাধীনচেতা যুবাদের দুমড়েমুচড়ে দিতে চায়। সাধারণত এরা বহুত্ববাদে বিশ্বাসী হয়। জাতপাত মানে না। গণতান্ত্রিক স্বচ্ছতার পক্ষে থাকে এবং পরিবেশসচেতন। শাসকের কাছে এই মহল ভয়াবহ। বিধায়ক–সাংসদদের মতো এদের প্রলোভন দেখিয়ে কেনা কঠিন।

তৃতীয়ত, কৃষক আন্দোলন থেকে নজর ঘোরাতে দিশাকে গ্রেপ্তার করা আবশ্যিক ছিল। কেননা, আন্দোলনের মোকাবিলা নিয়ে সরকার প্রবল সমালোচিত। আন্তর্জাতিক মহলও উদ্বিগ্ন। পরিত্রাণের জন্য প্রয়োজন ছিল এক ‘আন্তর্জাতিক চক্রান্তের’। দিশার ‘টুলকিট’ সেই হাতিয়ার।

চতুর্থত, দিশা রবি নামের এক ‘আদর্শ ভারতীয় নারী’, সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে কারও সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করার দরকার হলে যাঁর কিনা শাসককুলের বন্ধুদের বাছা উচিত ছিল, তিনি কেন সাদা চামড়ার খ্রিষ্টান (দিশাকে খ্রিষ্টান প্রতিপন্নেরও চেষ্টা হয়েছে, যদিও তাঁরা হিন্দু) পরিবেশকর্মীদের পছন্দ করবেন? এ যে আত্মনির্ভর স্বদেশিয়ানার বিপরীত বিজ্ঞাপন?

পঞ্চমত, এই বয়সী পড়ুয়াদের পরিবার ও স্কুল–কলেজকেও একটা বার্তা দেওয়া গেল, যাতে তারা ঠিক ও ভুলের সংজ্ঞা ঠিকমতো শেখাতে পারে। বলতে পারে, সামাজিক মাধ্যম বা বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে দূরে থাকো। রাষ্ট্র ও নেতৃত্বের প্রতি অনুগত হও।

রামচন্দ্র গুহর মতে, ষষ্ঠ কারণটি পুরোপুরিই দিশাকেন্দ্রিক। দিশাদের সংগঠন ‘ফ্রাইডেজ ফর দ্য ফিউচার’ (এফএফএফ) ভারতের ‘পরিবেশবিধি লঙ্ঘন’ নিয়ে সরব। ‘দ্য নিউজ মিনিট’–এর রিপোর্ট অনুযায়ী এফএফএফ ২০২০ সালের ‘এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট নোটিফিকেশন’ খসড়ার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে। ওই বিজ্ঞপ্তি প্রকল্প রূপায়ণের আগে নাগরিক আলোচনার বাধ্যবাধকতার গুরুত্ব কমিয়ে পরিবেশগত ছাড়পত্র পরে দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করেছে। মোদি সরকারের নীতির সঙ্গে ওই খসড়া সংগতিপূর্ণ।

দিশার গ্রেপ্তার ভারতের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকারের আরও এক পরীক্ষা।

সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন