default-image

৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত এবারের নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের স্মরণকালের সবচেয়ে কঠিন নির্বাচন হয়েছে। পূর্বাভাসে বাইডেনের সহজ জয়ের কথা জোরেশোরে বলা হয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি। বিগত চার বছর ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বের হয়ে আসা চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ, চীনের বিরুদ্ধে সামরিক জোট গঠন এবং ইসরায়েল তোষণ নীতির কারণে আন্তর্জাতিক মহলে দুর্বল করেছে বলে অনেকেই মনে করেন। ট্রাম্পের ইসরায়েল তোষণনীতি, অভিবাসনের বিরোধিতা এবং অন্যান্য কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তে এ নির্বাচন নিয়ে এত বেশি আগ্রহ।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের দৃষ্টিও এখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে নিবদ্ধ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার পালাবদল হলে নতুন প্রশাসনের তালিকায় এমন বিষয়গুলো থাকবে, যেগুলো ট্রাম্প আমলে গুরুত্ব পায়নি। বৈশ্বিক মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মতো বিষয়গুলো নতুন প্রশাসনে গুরুত্ব পেতে পারে। কাজেই বিশ্বের উন্নয়নশীল বহু দেশে যেখানে উদার গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ রয়েছে, সেসব দেশের বাইডেনের বিদেশনীতির বিভিন্ন দিক বুঝতে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

এই নভেম্বর মাসেই (আজ ৮ নভেম্বর) বিশ্বের অন্য প্রান্তে, আমাদের দেশের অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী মিয়ানমারে সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচন নিয়ে আমাদের গণমাধ্যমে তেমন আলোচনা নেই। কিন্তু আমার কাছে এই নির্বাচনের গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়। মিয়ানমারের আজকের নির্বাচনে পরোক্ষভাবে জড়িত রয়েছে বাংলাদেশে তিন বছর ধরে আশ্রয়প্রাপ্ত মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনের ১১ লাখ ভাগ্যাহত রোহিঙ্গার তাদের ভিটেমাটিতে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি। যদিও মিয়ানমারের নির্বাচনে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না, তথাপি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতির আশা করাই যায়। একই কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পালাবদলের কারণে এ অঞ্চলেও কিছু পরিবর্তন হতে পারে। দুটোর মধ্যেই কিছুটা যোগসূত্র রয়েছে।

মিয়ানমারে বর্তমান নির্বাচন কমিশন ২০১০ সালের আলাদা আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কথিত স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। প্রথমবারের মতো পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট এই কমিশন অং সান সু চি মনোনীত বেসামরিক প্রেসিডেন্ট কর্তৃক নিযুক্ত হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হা হেহিনকে মিয়ানমার ইউনিন ইলেক কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর এ নিয়োগ মিয়ানমারের প্রধান জনগোষ্ঠী বামার ছাড়া বাকি উপজাতিদের কাছে পক্ষপাতদুষ্ট চেয়ারম্যান হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরাও ইতিমধ্যে ইউইসির কিছু কিছু কর্মকাণ্ডকে পক্ষপাতদুষ্ট এবং সু চির পক্ষে পক্ষপাতিত্ব হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

এবারের সংসদের দুই কক্ষের নির্বাচনে প্রান্তিক দলসহ প্রায় ৯০টি দল বিভিন্ন পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বর্তমানের ক্ষমতাসীন বেসামরিক দল অং সান সু চির এনএলডি (ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি) এবং সেনাসমর্থিত থান হটিএর নেতৃত্বাধীন দল ইউএসডিপি (ইউনিয়ন অব সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি)।

এবারের নির্বাচনে স্টেট এবং কেন্দ্রীয় সরকারের দুই কক্ষ মিলে ১ হাজার ১১৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য বৈধতা পেয়েছেন। রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাননি। নাগরিকত্বের প্রশ্নে তা বাতিল করা হয়েছে। মূল দুটি দলই সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমান প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। ছোট কিছু দল বিভিন্ন প্রান্তে মোট ছয়জন মুসলমান প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে।

রাখাইনের অন্যতম জনপ্রিয় দল হচ্ছে আরাকান ন্যাশনাল পার্টি (এএনপি)। উত্তর রাখাইন ও সিতওয়ে অঞ্চলে তাদের প্রভাব রয়েছে এবং গত নির্বাচনে এনএলডিকে প্রাদেশিক পরিষদে পরাজিত করেছিল। নিরাপত্তার অজুহাতে এবার ওই সব অঞ্চলের ভোট বাতিল করা হয়েছে। এমনিতেই রাখাইন রাজ্যে যেসব রোহিঙ্গা এখনো বিভিন্ন ক্যাম্পে রয়েছে, তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে জাতীয় ও স্টেট মিলিয়ে ৬১টি আসনে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় ২৭টি আসনের নির্বাচন আপাতত বাতিল করা হয়েছে।

মিয়ানমারের নির্বাচনের আইনের ধারা মোতাবেক যেসব জায়গায় নির্বাচন আপাতত হচ্ছে না, সেসব জায়গায় কেন্দ্রে সরকার গঠনের এক বছর পর উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কাজেই রাখাইনের এসব অঞ্চলে সহসা ভোট হচ্ছে না। অপরদিকে আরাকান আর্মির সঙ্গে সরকারের কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ায় যুদ্ধবিরতি হচ্ছে না। কাজেই এ অঞ্চলে নির্বাচনের দিন সহিংসতা হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

মিয়ানমারের নিম্নকক্ষের মোট আসন ৪৪০টি এবং উচ্চকক্ষের ২২৪টি হলেও ২৫ শতাংশ সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত আসন। যে কারণে এবারও জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষের নির্বাচনের জন্য ৩৩০টি উন্মুক্ত রয়েছে। এ আসনগুলোর মধ্যে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ২২১টি আসন। ২০১৫ সালে এনএলডি নিম্নকক্ষে ২৫৫টি এবং উচ্চ কক্ষে ১৩৫টি আসন পেয়েছিল। অপরদিকে সেনাসমর্থিত দল ইউএসডিপি পেয়েছে যথাক্রমে ৩০ এবং ১১টি।

বিজ্ঞাপন

এবারের নির্বাচনে এই দুই দলের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। পুনরায় প্রধান দল হিসেবে আবির্ভূত হবে। তবে এনএলডি বিজয়ী হলেও কত আসন পাবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সেনাবাহিনীর সমর্থন ছাড়া বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। ইউএসডিপির পেছনে সেনাবাহিনী পরোক্ষভাবে সক্রিয় সমর্থন দিচ্ছে বলে বিভিন্ন দল অভিযোগ করছে। ফলে এবারের নির্বাচনে তারা গতবারের চেয়ে ভালো করতে পারে। এ বাস্তবতায় মিয়ানমারের সংবিধানে কোনো পরিবর্তন সম্ভব হবে না। তার জন্য প্রয়োজন ৭৫%-এর সমর্থন।

কাজেই মিয়ানমারের নির্বাচন কোনো গুণগত পরিবর্তন অথবা শাসকগোষ্ঠীর পূর্বতম অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। অন্তত রোহিঙ্গা বিষয়ে অং সান সু চি আইসিজেতে উপস্থিত হয়ে সামরিক জান্তাকে রক্ষা করার যে চেষ্টা চালিয়েছেন, তাতে এটা স্পষ্ট যে অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।

এরপরও মিয়ানমারের নির্বাচন রোহিঙ্গা প্রেক্ষাপটে আমাদের জন্য কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। অপরদিকে মার্কিন নতুন প্রশাসন মানবাধিকার ও উদার গণতন্ত্র ইস্যুর দিকে নজর দেবে বলে মনে করা হয়। মিয়ানমারের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রোহিঙ্গা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কঠোর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে এখন থেকেই আমাদের কূটনীতিই হবে একমাত্র ভরসা। আমাদের অন্যতম জাতীয় স্বার্থ যে রোহিঙ্গা বিষয়ে আশু সমাধান।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

hhintlbd@yahoo.com

মন্তব্য পড়ুন 0