default-image

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও পুলিশ—দুটি প্রতিষ্ঠানের নানা কাজের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হচ্ছে ‘তদন্ত’। দুদক করে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত। এর ওপর ভিত্তি করে দুর্নীতিবাজেরা চিহ্নিত ও শাস্তির মুখোমুখি হয়। আবার কেউ দুর্নীতির অভিযোগের কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায়। আর পুলিশের কাজ সব ধরনের অপরাধের তদন্ত করা, প্রকৃত অপরাধীকে চিহ্নিত করা। কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হলো কি না, সেটাও নিশ্চিত করা। আদালত এর ওপর ভিত্তি করেই অপরাধীর শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করেন অথবা মুক্তি দেন।

তদন্তের কাজটি কঠিন। এই  কাজে সময় লাগে, মাথা খাটাতে হয়। এর একটি সহজ পথের সম্ভবত সন্ধান মিলেছে। আর সেটা হচ্ছে, সম্ভাব্য অপরাধী বা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ‘মনোজগৎ’ নিয়ে চর্চা করা। এতে তদন্তকারীর অহেতুক দৌড়-ঝাঁপের কষ্ট নেই। কাকে ধরা যাবে বা কাকে ধরা যাবে না, সেটা বিবেচনায় নিয়ে চোখ বন্ধ করে সন্দেহভাজন অপরাধীর মনের মধ্যে কী আছে, তা কল্পনা করুন এবং তা লিখে ফেলুন। ব্যস, তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি!

বিজ্ঞাপন

তদন্তের এই নতুন ধারার বিষয়টি সম্প্রতি আমরা জানতে পেরেছি দুদকের কল্যাণে। বনানীর এফ আর টাওয়ারে আগুন লাগা ও মৃত্যুর ঘটনার পর সেই ভবনের নকশা জালিয়াতির বিষয়টি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও হয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্ত করছিল দুদক এবং মামলায় চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে সম্প্রতি। সেই অভিযোগপত্র থেকে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাত কর্মকর্তা অব্যাহতি পেয়েছেন। নকশা অনুমোদনের সঙ্গে তাঁরা সবাই কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিলেন। এরপরও কেন তাঁরা সব ধরনের অভিযোগ থেকে মুক্তি পেলেন, তাঁর একটি ব্যাখ্যা রয়েছে চূড়ান্ত অভিযোগপত্রে। সেই ব্যাখ্যা সূত্রে আমরা জানতে পারলাম, দুদকের তদন্ত কর্মকর্তারা তাঁদের ‘মনোজগতে’ ঘুরে এসেছেন। সেখানে পরিভ্রমণ করে তাঁরা টের পেয়েছেন, নকশা অনুমোদনের সঙ্গে জড়িত থাকলেও তাঁদের কোনো ‘অপরাধী মন’ ছিল না। অথবা তাঁরা এই অনুমোদন দিয়েছেন ‘সরল বিশ্বাসে’।

দুদকের পর আমরা দেখলাম পুলিশও একই পথ ধরেছে। মার্শা বার্নিকাট একসময় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সেই ২০১৮ সালের ৪ আগস্ট মোহাম্মদপুরের ইকবাল রোডে তাঁর গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সেই রাতে তিনি সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের বাসায় নৈশভোজে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পর তাঁর গাড়িতে অস্ত্রধারীরা হামলা চালায়। সেই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং এর আড়াই বছর পর তদন্ত শেষে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ৯ নেতা-কর্মীকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। যে অভিযোগপত্র দেওয়া হলো তাতে তো এত সময় লাগার কথা নয়।

এই অভিযুক্তদের কাউকেই পুলিশ আটক করতে পারেনি, কিন্তু অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ‘সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র হচ্ছে’ এমন মনে করেই আসামিরা হামলা চালিয়েছেন। বোঝা যায়, এখানেও অভিযুক্তদের মনোজগতে পরিভ্রমণ করে এসেছেন পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তা। তবে সেটা তিনি করেছেন ‘সোর্সের’ মাধ্যমে। তদন্তকারী কর্মকর্তা তেজগাঁও অঞ্চলের পরিদর্শক আবদুর রউফের ‘সোর্স’ নিশ্চিত করেছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা মনে করেছিলেন, বদিউল আলম মজুমদারের বাসায় ‘সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্র’ হচ্ছে, তাই তাঁরা সেই বাসা থেকে বের হওয়ার পর তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাটের গাড়িতে হামলা চালিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সোর্সের মাধ্যমে আসামিদের মনের খবর জানতে হয়েছে। কিন্তু প্রথম আলোর প্রতিবেদক অবশ্য তাঁদের অনেককেই ফোনে পেয়েছেন এবং তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ছাত্রলীগ ও যুবলীগের এমন তিনজন নেতা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও তদন্ত কর্মকর্তার পরিচয় দিয়ে তাঁদের কাছে ফোন এসেছে অথবা বাসায় গেছে। একজন বলেছেন, ঘটনার বিষয়ে কেউ তাঁকে কিছু জিজ্ঞাসা করেননি। তাঁরা সবাই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।

সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে না? এফ আর টাওয়ার ভবনে নকশা জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু নকশা অনুমোদনকারীদের বিরুদ্ধে দুদকের কোনো অভিযোগ মেলে না। দুদক তাঁদের ‘মনে’ কী আছে, তা জেনে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়। রাজউকের বড় কর্তারা ছাড় পেয়ে যান। বার্নিকাটের গাড়িতে হামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা দাবি করে বসেন, সোর্সের মাধ্যমে তিনি আসামিদের মনের অভিপ্রায় জানতে পেরেছেন। আবার এক আসামি যখন বলেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা আবদুর রউফ তাঁকে ফোন করেছিলেন, তখন তিনি তা অস্বীকার করেন। তিনি আরও দাবি করে বসেন, আসামিদের তিনি ধরার চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারেননি। কিন্তু আমরা জানতে পারি, প্রথম আলোর প্রতিবেদক সহজেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পেয়ে যান, তাঁদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলা যায়। তাঁরা সবাই নিজের এলাকাতেই রয়েছেন, অথচ তাঁদের নাকি পুলিশ পায় না। কার কথা বা কোনটা পাঠকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে?

আসলে পাঠক বা জনগণ কী বিশ্বাস করল বা করল না, তাতে কারও কিছুই আসে-যায় না। কাকে বাঁচাতে হবে বা কাকে ধরতে হবে, এই হিসাব-নিকাশ মাথায় রেখে যখন তদন্ত হয়, তখন এমনই হওয়ার কথা। আমরা বুঝতে পারি, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান বা বড় কর্তাদের ধরা যায় না এবং সে জন্য তাঁদের অব্যাহতি দেওয়ার কোনো না কোনো পথ খুঁজে বের করতে হয়। আমরা বুঝতে পারি, ছাত্রলীগের নেতাদের ধরা কঠিন, এখানেও বিকল্প খুঁজতে হয়েছে। সাক্ষ্যপ্রমাণ বা যুক্তি-বুদ্ধির চেয়ে তাই তদন্তকারীদের অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মনোজগতের ওপর ভর করতে হয়েছে।

আমরা আরও বুঝতে পারি, মুখরক্ষার জন্য হলেও এমন একটি অভিযোগপত্র দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল। এসব ঘটনার পর দুই–আড়াই বছর চলে গেছে। এফ আর টাওয়ার দুর্ঘটনার বার্ষিকীতে মামলার অগ্রগতি নিয়ে পত্রপত্রিকাগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করে। মন্ত্রী-মিনিস্টাররা যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেলে বার্নিকাটের মামলার ভাগ্য নিয়ে তাঁদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, নানা কথা শুনতে হয়। একটি সৃজনশীল তদন্তপদ্ধতি বের করা ছাড়া দুদক বা পুলিশের তদন্তকারীদের আর কীই-বা করার ছিল!

এ কে এম জাকারিয়া প্রথম আলোর উপসম্পাদক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন