বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এর পরের কারণগুলো ক্রিকেটীয়। সেসব সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা ভালো বলতে পারবেন। একটা সাধারণ অভিযোগ সবাই করছেন, বিশ্বকাপের আগে অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডের বাংলাদেশ সফরের সময় উইকেট বানানো হয়েছিল একেবারেই নন-স্পোর্টিং। তাতে খেলে বাংলাদেশ সিরিজ দুটো জিতেছে, কিন্তু তাদের স্পোর্টিং উইকেটে খেলার অনুশীলন আর হতে পারেনি। সেটাই তাদের ভুগিয়েছে ওমান-আরব আমিরাতে। বাংলাদেশ কেবল মূল প্রতিযোগিতায় খারাপ করেছে তা–ই নয়, অনুশীলন ম্যাচেও হেরেছে শ্রীলঙ্কা-আয়ারল্যান্ডের কাছে। বাংলাদেশ যদি অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের পিচে খেলত, তাতে সিরিজ হারলেও বিশ্বকাপে তার প্রস্তুতিটা ভালো হতো!

এরপর আছে বিতর্ক। আমরা দেখলাম স্কটল্যান্ডের সঙ্গে ম্যাচের পর ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের সামনে খেলোয়াড়দের স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কথা বললেন। খেলোয়াড়েরা আবার পরের দুই খেলার পরের সংবাদ সম্মেলনে গিয়ে সেই অভিযোগের জবাব দিলেন। এমনকি তাঁরা ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ সমর্থকদের সমালোচনার জবাবও দিতে লাগলেন। মাহমুদউল্লাহ জানালেন, তাঁরাও মানুষ। তাঁরা ফেসবুক না দেখলেও তাঁদের পরিবার-পরিজন তো দেখে। সমালোচনার কাঁটা তাঁদের তাই বিদ্ধ করে।

আপনি চারা লাগাবেন আমগাছের, আর আশা করবেন কাঁঠাল ফলবে—সেই আশা পূরণ হবে না। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে নষ্ট করেছে প্রধানত দুর্নীতি। ঘরোয়া ক্রিকেটের ফল আগে থেকে ঠিক করে রাখা, আম্পায়ারদের দিয়ে সেই ঠিক করে রাখা ফল বাস্তবায়নের চেষ্টা করা। সাকিব আল হাসান স্টাম্পে লাথি মেরে যে দুর্নীতিবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কথা বলার আগল খুলে দিয়েছিলেন। কিন্তু যা আসলে কায়েম হয়ে বসেই আছে।

আমরা বলব, বোর্ডের সভাপতির কথা বলার জায়গা সাংবাদিক-সমাবেশ নয়। তিনি খেলোয়াড়দের খেলার সমালোচনা, বিশেষ করে ব্যাটিং স্টাইলের সমালোচনা করে ঠিক কাজ করেননি। তিনি যদি নিজেকে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞ বলে মনে করে থাকেন, আর তাঁর সেই অতি মূল্যবান বিশেষজ্ঞ জ্ঞান দলকে না দেওয়া হলে দলের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাবে বলেই মনে করেন, তিনি গিয়ে কোচকে কথাগুলো বলতে পারতেন। আমরা বাইরে থেকে দেখতে পেলাম মাহমুদউল্লাহর মন খারাপ। মুশফিকুর রহিমের মন খারাপ। খেলার ফল খারাপ হচ্ছে বলে তো বটেই, তঁাদের মাঠের বাইরে মাইক্রোফোনে লড়াই করতে হচ্ছে বলে। এটা মোটেও কোনো ভালো টিমের লক্ষ্য নয়।

খেলার রণকৌশল কী হবে, এ নিয়ে কথা বলার কোনো যোগ্যতাই আমার নেই। তবে খেলা হয়ে যাওয়ার পর আমরা তো বিশ্লেষণ করে দেখতেই পারি। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে খেলার আগে সারা পৃথিবীর সবাই জানে, পরে ব্যাট নিতে হবে, আমরা টসে জিতে কেন বল নিলাম? বেটিং সাইটে গিয়ে দেখুন, লেখা ছিল, যে পরে ব্যাট করবে, সে জিতবে। আমরা আগে ব্যাট নিয়েছি, কারণ, আমরা রান তাড়া করতে ভয় পেয়েছি। তা যদি হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের জন্য ক্রিকেট নয়, অন্তত টি–টোয়েন্টি ক্রিকেট নয়। ক্রিকেট সাহসীদের খেলা। বোলার আর ব্যাটসম্যান একে অন্যের ওপরে চড়াও হওয়ার চেষ্টা করে। কে কাকে দমাতে পারে, তারই মল্লযুদ্ধ হয়। যার বুকের পাটা ছোট, সে হারে। পাওয়ারপ্লেতে হাত খুলে খেলতেই হবে। দুটো উইকেট পড়লেও।

আপনারা দেখবেন, আমাদের মধ্যে সাহস আছে সাকিব আল হাসানের। ব্যাট করতে নেমেই একটা চার মেরে বসেন। অন্তত একটা সিঙ্গেল তিনি নেবেন। সাকিব আল হাসান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাটিং করেন। কিন্তু এ নিয়ে কথা বলারই দরকার নেই। কারণ, এই করে করেই তিনি এত এত রান করেছেন। কলিজা ছোট হলে সাকিব আল হাসান সাকিব আল হাসান হতেনই না। ধরুন মাশরাফির কথা। মাশরাফি মোটরসাইকেলে চড়ে ঢাকা থেকে নড়াইল গিয়েছিলেন। আমরা আঁতকে উঠেছিলাম। এই ছেলে করেটা কী। তিনি ওই রকম বেপরোয়া বলেই তিনি ফাস্ট বোলার। ওই রকম বড় কলিজার বলেই তিনি ছিলেন ভালো অধিনায়ক! আমাদের দরকার সাহসী খেলোয়াড়। আফগানিস্তান, শ্রীলঙ্কার খেলা দেখেন। তারা হারতে পারে, কিন্তু মাঠে তাদের ‘কলিজা ছোট’ করে খেলার কোনো লক্ষণ নেই। তিনটি উইকেট পড়ে গেলেও পাওয়ারপ্লেতে এক ওভারে দুইটা ছয় মারেন ওদের খেলোয়াড়েরা।

আরেকটা কথা বলি, ভালো খেলোয়াড় মানেই ভালো ক‌্যাপ্টেন নন। নেতা আর ম্যানেজারও এক কথা নয়। নেতা মানে নেতা। তাঁকে যেমন খেলোয়াড়দের পাশে এসে দাঁড়াতে হবে, মায়ের মমতা দিয়ে খেলোয়াড়দের আগলে রাখতে হবে, আবার তাঁকে তেমনি আগ্রাসী হতে হবে। বিপদে মাথা ঠান্ডাও রাখতে হবে। মাহমুদউল্লাহ মুখস্থ ক্যাপ্টেন্সি করেছেন। তিনি মোস্তাফিজকে রেখে দিয়েছেন ১৮ নম্বর আর ২০ নম্বর ওভারের জন্য। তখন স্কটল্যান্ডের ছয় উইকেট পড়ে গেছে। ওই খেলা কেন কুড়ি ওভার পর্যন্ত নিয়ে যাবেন? আরেক খেলায় বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের সামনে বাঁহাতি স্পিনার নামাবেন না বলে সাকিবকে ব্যবহারও করা হলো না! মোস্তাফিজকেও না। কোনো মানে হয়!

জেতা খেলা আমরা জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছি। জয়ের মতো টনিক আর নেই। পরাজয়ের মতো ভাইরাসও আর নেই। জিতলে ওই খেলাগুলোতে মাহমুদউল্লাহর অধিনায়কত্বের আমরা প্রশংসাই করতাম। দল হেরেছে, আমরা এখন সমালোচনা করবই। লিটন দাস ভালো ব্যাটসম্যান, তাতে আমার নিজের কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাঁর উপর্যুপরি রান না পাওয়াটা তাঁর মনের ওপরে প্রভাব ফেলল। দুই–দুইটা ক্যাচ ফেলে দিলেন তিনি সম্ভবত সেই কারণেই। তা না হলে তিনি আমাদের সেরা ফিল্ডারদের একজন। লিটনকে ওই ম্যাচে না খেলালে ফল অন্য রকমও হতে পারত। তবে দুর্ভাগ্যও আমাদের তাড়া করেছে। সাকিব আল হাসান খেলতে নেমে ফিল্ডিংয়ের সময় আহত হলেন। ইনজুরি নিয়ে ব্যাট করতে নামতে হলো তাঁকে। এক–দুই নিতে পারবেন না বলে ছয় মারতে গিয়ে আউট হলেন। শেষ দুই ম্যাচে আর তিনি নেই।

আরেকটা কথা। আমরা সবাই জানি, লেগ স্পিনার বড় কার্যকর। আমাদের লেগ স্পিনার আমিনুলকে দেশে ফেরত পাঠানো হলো কেন? দেশে লেগ স্পিনার তৈরির প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে কি? আমাদের টেস্ট ক্রিকেটের অধিনায়ক মুমিনুল হক। ভালো খেলোয়াড় আর অধিনায়ক এক কথা নয়। শচীন ভালো খেলোয়াড়, আর সৌরভ গাঙ্গুলী ভালো অধিনায়ক। লর্ডসে টেস্ট ক্রিকেটে জিতে তিনি জার্সি খুলে মাথার ওপরে ঘুরিয়ে ক্রিকেটের কৌলীন্যে আঘাত করেছিলেন। কারণ, সেই স্পর্ধা তাঁর আছে, সে জন্যই তিনি ভালো অধিনায়ক। আমাদের অধিনায়কদের সেই দাপুটে আগ্রাসী মনোভাব আছে কি না, সেই প্রশ্ন অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে।

আসলে দুর্নীতিই আমাদের প্রধান সমস্যা। আসলে নীতিহীনতাই আমাদের প্রধান সমস্যা। এবং সেটা জাতীয় জীবনের সর্বত্র। দেশ চলবে নীতিহীনতা দিয়ে, আর ক্রিকেটাররা আমাদের বিজয় এনে দেবেন, এটা আকাশকুসুম কল্পনাই বটে!

আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন