দুর্বৃত্তায়ন: উপসর্গ নয়, রোগের চিকিৎসা করতে হবে

বিজ্ঞাপন
default-image

নানা অন্যায় ও অনৈতিক কাজে লিপ্ত হওয়ার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী গত ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীকে তাঁদের পদ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থিত ক্যাসিনো, বার, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ও বাসায় র‍্যাব ও পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে আইনবহির্ভূতভাবে জুয়া খেলার আয়োজন ও অন্যান্য অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জি কে শামীম, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, রফিকুল আলম ফিরোজ, লোকমান হোসেন ভূঁইয়া, সেলিম প্রধানসহ অসংখ্য লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁদের অনেকেই যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। বহু আলোচনা-সমালোচনার পর আটক হয়েছেন যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী ওরফে সম্রাট। গ্রেপ্তারকৃত অনেকের কাছ থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েক কোটি টাকা, বিদেশি মুদ্রা, জাল নোট, অস্ত্র ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে। এসব অপকর্মের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ অনেক রাঘববোয়াল জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে, যাঁরা এঁদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা পেতেন। কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাবও জব্দ করা হয়েছে।

অন্যায় ও অপকর্মের বিরুদ্ধে নিঃসন্দেহে এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ। প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। তবে এসব অভিযান ও ধরপাকড়ের মাধ্যমে চলমান অনৈতিকতা, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়ন, বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সম্পৃক্তদের অপকর্মের সমস্যার সমাধান হবে কি না, তা নিয়ে অনেকের মনেই সন্দেহ রয়েছে। কারণ, এ অভিযান ‘টু লিটল, টু লেট’ বলেই অনেকের আশঙ্কা। কারণ, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন এখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তৃত হয়ে পড়েছে এবং পুরো জাতিকে গ্রাস করে ফেলেছে। এ ছাড়া এ অভিযান রোগের পরিবর্তে রোগের উপসর্গের চিকিৎসার শামিল বলেই মনে হয়। কারণ, চলমান অভিযান এ পর্যন্ত শুধু জুয়া বা ক্যাসিনোসংক্রান্ত অপরাধেই সীমাবদ্ধ, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সমস্যা এখনো উপেক্ষিতই রয়ে গেছে।

স্মরণ করা যেতে পারে যে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ‘দিনবদলের’ অঙ্গীকার করে ক্ষমতায় এসেছিল। সুস্পষ্টভাবে এ অঙ্গীকারের অংশ ছিল দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন, দখলদারি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজিসহ সব অপকর্মের মূলোৎপাটন। একই সঙ্গে অঙ্গীকার করা হয়েছিল দলীয়করণের অবসানসহ রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। দিনবদলের সনদে আরও অঙ্গীকার করা হয়েছিল মন্ত্রী-এমপিসহ সব ক্ষমতাধরের বার্ষিকভাবে সম্পদের হিসাব প্রদান ও প্রকাশ।

আরও স্মরণ করা যেতে পারে যে মহাজোট সরকারের এসব অঙ্গীকার রক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিচারপতি হাবিবুর রহমান ২০১১ সালে একটি সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন যে দেশটা এখন ‘বাজিকরদের’ হাতে। ক্ষমতাসীনেরা প্রয়াত বিচারপতির এ সতর্কবাণীর প্রতি কোনোরূপ ভ্রুক্ষেপ তো করেনইনি, বরং তিনি তাঁদের নগ্ন আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন। তবে তখন থেকেই যদি সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হতো, তাহলে বাংলাদেশের ইতিহাস হয়তো ভিন্ন রকম হতো।

এটি সুস্পষ্ট যে শোভন-রাব্বানী-খালেদ-ফিরোজ-লোকমান প্রমুখের পদস্খলন রোগের উপসর্গমাত্র, রোগ আরও জটিল এবং এর শিকড়ও আরও গভীরে প্রোথিত। তাঁদের অপকর্ম আমাদের নীতি ও আদর্শবিবর্জিত নষ্ট রাজনীতির দুষ্ট প্রভাবেরই নগ্ন প্রতিফলন। আমাদের দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি এসব খলনায়কের সৃষ্টি করেছে, লালনপালন করেছে এবং পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। তাই দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির মূলোৎপাটন করতে না পারলে রোগের চিকিৎসার পরিবর্তে রোগের উপসর্গ নিয়েই আমরা ব্যতিব্যস্ত থাকব।

নষ্ট ও দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির একটি ভয়াবহ পরিণতি ভঙ্গুর শাসনকাঠামো, যার ফলাফল অপশাসন। আইন, বিধিবিধান, নিয়ম পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান শাসনকাঠামোর মূল নিয়ামক। অনেক সময়েই রাজনৈতিক বিবেচনায় আমাদের দেশে আইন প্রণীত, প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ হয়, কিংবা আইন মানা হয় না। ফলে অবিচার ও বিচারহীনতার এক ভয়াবহ সংস্কৃতি আমাদের সমাজে গড়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আমরা নিয়ম পদ্ধতি সব ভেঙেচুরে অকার্যকর করে ফেলেছি। উপরন্তু নগ্ন দলীয়করণের কারণে আমাদের প্রায় সব সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান আজ জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া ও পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কাঠামো নিজের থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে, এ জন্য নির্ভর করতে হয় ওপরের সবুজ সংকেতের ওপর। এ ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠান, বিশেষত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক স্বার্থে অন্যায় ও অপরাধমূলক কার্যক্রমে ব্যবহারের ফলে তারা নিজেরাই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে যেতে উৎসাহিত হয়ে পড়েছে, এমনকি অনেক সময় অপরাধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সিন্ডিকেটও গড়ে তুলেছে।

প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক দলের আইন না মানার একটি বড় উদাহরণ হলো আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও)-এর অনেক বিধানকে উপেক্ষা করা। যেমন আরপিওর ৯০ (খ) (ই) ধারা নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন থাকার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। একইভাবে ৯০ (গ) (ঙ) ধারা রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখাকে বেআইনি ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো এসব বিধিবিধানের প্রতি ভ্রুক্ষেপও করে না। ফলে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ সংগঠনের আবরণে তাদের লেজুড় হিসেবেই পরিচালিত হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতির নামে ছাত্রছাত্রীদের ব্যবহারের রাজনীতিই অব্যাহত রয়েছে এবং এ কাজে দুষ্টদেরই দায়িত্ব প্রদানের ঐতিহ্য অব্যাহত রয়েছে। আর লেজুড় ছাত্র ও শিক্ষকসংগঠনের কারণেই আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সন্ত্রাসের আখড়ায় পরিণত হয়েছে, যা আমাদের শিক্ষার মানে ধস নামার জন্য বহুলাংশে দায়ী। এ ছাড়া রাজনৈতিক দল আইনকানুন না মানলে তাদের লেজুড় সংগঠনগুলো তা মানবে কেন? প্রসঙ্গত, রাজনৈতিক দলগুলো আইপিও লঙ্ঘন সত্ত্বেও আমাদের নির্বাচন কমিশন এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্বাক।

আমাদের নষ্ট রাজনীতির আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো ফায়দা প্রদানের সংস্কৃতি। আমাদের রাজনীতি এখন বহুলাংশেই নীতি ও আদর্শবিবর্জিত হয়ে পড়েছে। মানুষ এখন রাজনীতিতে জড়ায় নগদ প্রাপ্তির আকর্ষণে। কারণ, রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হলে এখন নানা ধরনের অন্যায় সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়। বড় বড় প্রকল্পও গৃহীত হয় রাজনৈতিক সহচরদের ফায়দা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আকর্ষণেই চারদিকে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনে নীতিহীন লোকেরা ভিড় জমিয়েছেন এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অন্যায় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে ফুলেফেঁপে দুর্বৃত্তে পরিণত হয়েছেন। ব্যাংক ও শেয়ার মার্কেট লুটের সুযোগ এবং শাসনকাঠামোর অকার্যকারিতা তাঁদের অনেককে দানবে পরিণত করেছে। তাই ফায়দাতন্ত্রের অবসান না করলে, লুটপাটের সুযোগ বন্ধ না হলে, শাসনকাঠামো কার্যকর, তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে না এবং নীতি ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠিত না হলে আমাদের পক্ষে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব বলে মনে হয়।

রোগের উপসর্গ নিয়ে ব্যস্ত থাকলে যে সমস্যার সমাধান হয় না, তার প্রকৃষ্টতম উদাহরণ বিএনপির আমলে পরিচালিত অপারেশন ক্লিন হার্ট। সেই অভিযানের অংশ হিসেবে র‍্যাব সৃষ্টি করা হয়েছে এবং অনেক দুর্বৃত্তকে নির্মূল করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সমস্যার সাময়িক উপশম হলেও তার স্থায়ী সমাধান হয়নি। স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন দুষ্ট রাজনীতির মাধ্যমে দুর্বৃত্ত সৃষ্টির যে কারখানা আমরা সৃষ্টি করেছি, উন্নত ও পরিশীলিত রাজনীতি চর্চার মাধ্যমে সে কারখানার বিলুপ্তি ঘটানো। আর এর জন্য প্রয়োজন অজুহাত সৃষ্টির পরিবর্তে দূরদর্শিতা ও সাহসিকতা প্রদর্শন।

পরিশেষে আমরা মনে করি যে রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন আমাদের জাতীয় সমস্যা। সব দলেই, বিশেষত ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া দলগুলোতে দুর্বৃত্তদের উপস্থিতি রয়েছে। তাই এটি একটি জাতীয় সমস্যা, শুধু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নয়। ফলে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সমস্যার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান করতে হলে আমাদের একটি জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন হবে। আরও প্রয়োজন হবে অনেক সুদূরপ্রসারী সংস্কার। আশা করি আমাদের রাজনীতিবিদেরা প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা ও সাহসিকতার পরিচয় দেবেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবেন।

ড. বদিউল আলম মজুমদার: সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন