বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২.

নাটোরে অবস্থিত উত্তরা গণভবনে সম্প্রতি সপরিবার ঘুরতে গিয়েছিলাম। পরিবারের ছোট–বড় সবাই টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করলাম। স্থাপনাটি আপাতদৃষ্টে বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বলেই মনে হলো। কিন্তু ধাক্কা খেলাম সংগ্রহশালায় ঢুকে। ধুলা–ময়লায় মাখামাখি হয়ে আছে অনেক অমূল্য নিদর্শন; যেন কতকাল এগুলোর ধুলাবালু পরিষ্কার করেনি কেউ। কিন্তু সবচেয়ে অবাক হলাম মূল ভবনে প্রবেশের সময়। লক্ষ করলাম, ভবনের প্রবেশমুখে শিকল দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে ও সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘নো এন্ট্রি’। শুনলাম, সেখানে নাকি এখন আর সাধারণ মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না।

মনে পড়ল, ২০ বছর আগে আমার শৈশবে একবার এই ভবনে প্রবেশ করেছিলাম। ভবনটির ভেতরের জৌলুশ আজও চোখে লেগে আছে। সেসবের সঙ্গে সন্তানদের পরিচিত করাতে না পারার হতাশা নিয়েই ফিরে আসতে হলো।

সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী সময় কথা হচ্ছিল আমার এক আত্মীয়ের সঙ্গে, যিনি একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা। তিনি শুনেই আমাকে বললেন, ‘গণভবনে থাকতেই আমাকে একবার জানালে না কেন? আমি একটা ফোন করে দিলেই তো ভেতরে ঢুকতে পারতে।’ বুঝলাম টিকিট কাটলেও সাধারণদের জন্য প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রিত। ‘অসাধারণ’ না হলে এন্ট্রি মেলে না সবখানে।

প্রতিদিন রাজপথে ভিআইপিদের চলাচলের পথকে মসৃণ করতে সিগন্যালে আটকে পড়া যে মানুষগুলো চাকরির ইন্টারভিউয়ে যোগ দিতে ব্যর্থ হয়, অ্যাম্বুলেন্সে থাকা যে রোগীটি বিনা চিকিৎসায় মারা যান, যে শিক্ষার্থী পরীক্ষা কেন্দ্রে ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারে না, তাদের নিয়ে ভাবে না কেউ। ভিআইপিদের কাছে তুচ্ছ, অথচ সাধারণদের কাছে জীবনরক্ষার সেই অ্যাজেন্ডাগুলো হার মানে ভিআইপিদের গাড়ির হুইসেল আর গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।

৩.

কয়েক দিন আগে অফিস থেকে ফেরার পথে গুলশান এলাকায় ভুল করে ইউটার্ন নেওয়ার জন্য আটকানো হলো আমার গাড়ি। ওই এলাকা আমার গাড়িচালকের জন্য খুব পরিচিত নয়। দায়িত্বে থাকা সার্জেন্টকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হলো। কিন্তু জরিমানা করার সিদ্ধান্তে অটল সার্জেন্ট। আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে আমরা যখন সার্জেন্টকে বোঝানোর চেষ্টায় রত, ঠিক সেই মুহূর্তে দ্রুতগতিতে আমাদের পাশ দিয়ে একটি পাজেরো ইউটার্ন নিয়ে চলে গেল। সেই গাড়ির প্রতি সার্জেন্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই তিনি আমাকে বললেন, ‘এইটা প্রশাসনের গাড়ি। এই গাড়ির সঙ্গে আপনি আপনার গাড়ির তুলনা করেন কেন?’

এভাবে রোজ হাজারো ঘটনার সাক্ষী হই আমরা, যা প্রতিক্ষণে আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নিয়ম মানাই প্রজার ধর্ম। কারণ, তারা প্রজা, তারা অধস্তন, তারা সাধারণ। আর যারা জনগণের সেবক, নিয়ম তাদের জন্য নয়। কারণ, তারা ঊর্ধ্বতন, তারা অসাধারণ। সত্যি কথা হলো, সেবক যখন প্রভুতে পরিণত হয়, তখন নিয়মের ব্যতিক্রমই হয়ে ওঠে প্রভুদের ধর্ম। ভাবতে অবাক লাগে, দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা ও উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা মানুষগুলো যখন ভিআইপি মর্যাদায় নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সড়কপথ, রেলপথ, নদীপথ কিংবা আকাশপথে ভ্রমণের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, তখন রূপার মতো কর্মজীবী নারীরা গণপরিবহনে ধর্ষণের শিকার হন। খেটে খাওয়া এই মানুষগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার কেউ নেই। দেশে প্রতিবছর কত শত মানুষ হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হন, কত নারী ধর্ষণের শিকার হন, অনেকে গুমও হয়ে যান।

উত্তরা গণভবন পরিদর্শনের জন্য রাষ্ট্রের নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও ভবনের প্রকৃত ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী হওয়া থেকে বঞ্চিত হয় আমাদের সন্তানেরা। তারা ভবনের নিরাপত্তা বিধানে কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতার ফল ভোগ করে। অথচ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনার মূল্যবান নিদর্শন একে একে গায়েব হয়ে গেলেও দায়িত্বরত ব্যক্তিদের ক্ষমতাচ্যুত, এমনকি অভিযুক্ত করতেও তেমন একটা দেখা যায় না। প্রতিদিন রাজপথে ভিআইপিদের চলাচলের পথকে মসৃণ করতে সিগন্যালে আটকে পড়া যে মানুষগুলো চাকরির ইন্টারভিউয়ে যোগ দিতে ব্যর্থ হয়, অ্যাম্বুলেন্সে থাকা যে রোগীটি বিনা চিকিৎসায় মারা যান, যে শিক্ষার্থী পরীক্ষা কেন্দ্রে ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পারে না, তাদের নিয়ে ভাবে না কেউ। ভিআইপিদের কাছে তুচ্ছ, অথচ সাধারণদের কাছে জীবনরক্ষার সেই অ্যাজেন্ডাগুলো হার মানে ভিআইপিদের গাড়ির হুইসেল আর গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।

তাই তো কেবলই প্রভু হওয়ার স্বপ্নে বিভোর আজকের তরুণ প্রজন্মের বড় একটা অংশ। ক্ষমতার এই আতশবাজি চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে তাদের। যেভাবেই হোক পাড়ি দিতে হবে বিসিএসের দরিয়া কিংবা হতে হবে বড় রাজনৈতিক নেতা। অসাধারণ হয়ে ওঠার এই যুদ্ধে দেশসেবা কিন্তু মুখ্য নয়; বরং মুখ্য হলো যেকোনো উপায়ে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো। ভিআইপি হয়ে ওঠা এবং ভিআইপি হতে চাওয়া এই মানুষগুলোর ক্ষমতার মোহের কাছে তাই দিন দিনই জিম্মি হয়ে পড়ছে সাধারণ মানুষ।

নিশাত সুলতানা উন্নয়নকর্মী। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন