default-image

মহাভারতের যুধিষ্ঠির নরক দর্শনে গিয়েছিলেন সজ্ঞানে, আর জিহাদের বাবার নরক-দর্শন ঘটে পুলিশের কাছে আটকাবস্থায়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাঁকে সন্তানের কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। হতভাগা মা-বাবা দুজনকে গলা ধরে একসঙ্গে কাঁদতেও দেওয়া হয়নি। বাবা মানুষটা সে সময় পুলিশ হেফাজতে হুমকি নির্যাতন ভোগ করছেন। তাঁদের বুকের মানিক তখনো আটকে ছিল অকাজের কাজি ওয়াসার পানির পাইপের সুড়ঙ্গের ভেতর। তখনো আশায় বুক বেঁধে দেশ-বিদেশের বাংলাদেশিরা এক পরিবার হয়ে উঠেছিল। সেই পরিবারের সন্তান হয়ে উঠেছিল শিশু জিহাদ। শাজাহানপুরের মাঠে কিংবা টিভির সামনে জমায়েত মানুষেরা হয়ে উঠেছিল জিহাদের মা-বাবা-ভাইবোন-স্বজন। জিহাদের মৃত্যু সর্বজনের সন্তানের মৃত্যু। জিহাদের মৃত্যু তেমনি রাষ্ট্রের অযোগ্যতা আর অবহেলার প্রতীক! 
মানুষ কিসে হয়? জিহাদকে উদ্ধার করা তরুণেরা সেটা দেখিয়েছেন। ক্ষোভে-উদ্বেগে-দুঃখে উত্তাল দেশবাসীও সেটা দেখিয়েছে। রাজনীতিতে যখন অমানুষের কারবার, বিভক্তি আর হিংসার শক্তি যখন আমাদের অবশ করে রেখেছিল, ঠিক সে সময় জিহাদের জন্য দেশবাসী এক হয়েছে, সপ্রাণ হয়েছে, সক্রিয় হয়েছে। তর্ক করেনি, কাজ করেছে। মায়ের বিলাপ আর বাবার আহাজারিকে সন্দেহ করেনি, সহায় হয়েছে। হাল ছাড়েনি, মরিয়া হয়েছে। কিন্তু কী করেছে রাষ্ট্র-সরকার-প্রশাসন? এত কান্নায়ও গলে না!
একের পর এক দুর্যোগ, একের পর এক গণবিধ্বংসী গাফিলতি, একের পর এক মিথ্যাচারের পর বলতে হচ্ছে: জনগণের কেবল জনগণই আছে। যখন অন্ধকার শীতল জলজ সেই নরক থেকে জিহাদকে উদ্ধারে ব্যর্থ হলো রাষ্ট্রযন্ত্র, যখন পদাধিকারীরা সত্যকে গুজব আর জিহাদকে ‘নিখোঁজ’ বলতে কসুর করলেন না, যখন পিতাকে ‘মিথ্যুক’ আর জনতাকে আপদ ভাবা হলো, তখনই উদয় ঘটল কাঙ্ক্ষিত নায়কদের। তারা বুঝ মানল না। তারা সত্য ও নিষ্পাপকে বাঁচাতে নিজেরাই ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমরাও তখন তাদের হাত ধরে যুধিষ্ঠিরের স্বর্গদর্শনে রওনা হলাম এবং আমরা একা ছিলাম না।
সেই হৃদয় মোচড়ানো সত্যপালায় বিভিন্ন ভূমিকায় কাজ করে যাচ্ছিলেন বহু মানুষ। কেউ গায়ে গতরে, কেউ বুদ্ধি দিয়ে, কেউ সরকার ও মিডিয়ার ওপর চাপ তৈরি করে; জিহাদকে বাঁচানোর লড়াইয়ে শামিল হচ্ছিলেন। জিহাদকে উদ্ধারের সেই নায়কেরা তঁাদেরই প্রতিনিধি। আমরা জানলাম, রাষ্ট্রযন্ত্র যা পারে না, সাধারণ মানুষ শূন্য হাতে তা করার তাকত রাখে। রানা প্লাজায় তারা এসেছিল, সুন্দরবন বাঁচাতে নেমেছিল, মুক্তিযুদ্ধেও তেমনি করে লড়েছিল। এই মানুষেরাই আমাদের জাতীয় পতাকার সত্যিকার বাহক। আমাদের নরকদর্শনের ২৩ ঘণ্টায় স্বর্গের ঠিকানাও আমরা যে জেনে ফেলি, সেটাই আমাদের একমাত্র আশার সঞ্জীবনী।
এবং আমরা জানলাম, মিডিয়া চাইলে সব পারে। তারা দেশকে এক করতে পারে, মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। যদি কেবল একটি নয়, দুটি চোখই তারা খোলা রাখে এবং এও জানলাম, জনগণ জাগলে সরকার বা মিডিয়া তৎপর হতে বাধ্য। একই সঙ্গে এটাও সত্য, আমাদের অনুভূতিগুলো মিডিয়ার প্রভাবের জমিন হয়ে উঠেছে। এই প্রভাবকে সুপথে সামলে চালানো না গেলে বিপদ আছে। এ কারণেই জিহাদের মৃত্যুর প্রকৃত ক্ষণটা জানা দরকার, ময়নাতদন্তের ঠিকঠাক বিবরণ প্রকাশ হওয়া দরকার।
জনগণের জন্য তাই কেবল জনগণই আছে। রানা প্লাজা থেকে সুন্দরবন হয়ে জিহাদের সুড়ঙ্গ; মানুষের জন্য মানুষই দাঁড়িয়েছে। নৈ-রাষ্ট্রের নৈ-নাগরিকেরাই মানুষ, আর সব ক্ষমতা-বিত্তের মলাশয়ে ভেসে ওঠা ভোঁদড়! দুর্দিনে নিকৃষ্টরা ভেসে ওঠে ঘোলা পানির ভেদা মাছের মতো। সংগ্রামের দিনে জনগণের নায়কেরা উঠে আসে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মতো।
তার পরও দমকল বাহিনীর সদস্যরা কম করেননি। কম করেননি পরিস্থিতির ডাকে সাড়া দেওয়া সরকারি-বেসরকারি কর্মীরা। কিন্তু নেতৃত্ব ভুল করলে তারা কী করতে পারে আর? রানা প্লাজায় উদ্ধারাভিযানের পথ দেখিয়েছে সাধারণ, মৃদু মানুষেরা। সুন্দরবনের তেল অপসারণে কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনী নড়েনি, তাই বলে বসে থাকেননি স্থানীয় বনজীবীরা। তেল অপসারণের কার্যকর যন্ত্রও উদ্ভাবন করেছে জনতার নিজস্ব প্রকৌশলীরা; কিন্তু কেউ তাদের ডেকে নেয়নি; নেতৃত্ব দেয়নি। বাংলাদেশের সমস্যা নেতৃত্বের যতটা, জনগণের ততটা নয়।
আমাদের পদাধিকারীরা তাজরীনের পরেও রানা প্লাজার ভয়াবহতা ঠেকাতে পারেননি। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে পারেননি সর্বাত্মক উদ্ধারে নামতে। জনতার জটলায় অনেকে বিরক্ত হন, কিন্তু জনতার সেই পাহারা ও প্রচেষ্টা ছিল বলেই অনেক গিয়েও কিছু বেঁচেছে! এই সজাগ পাহারা না থাকলে, জিহাদের লাশ উদ্ধারকারী ওরা এগারোজন (শফিকুল ইসলাম ফারুক, আবু বকর সিদ্দিক, আনোয়ার হোসেন, কবির মুরাদ, নূর মোহাম্মদ, আবদুল মজিদ, শাহজাহান আলী, ইমরান, রাকিব, মুন ও রাহুল দাশ) না থাকলে, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কথাই সত্য হতো, দমকল বাহিনীর প্রধানের দায়সারা বাণী শুনে কৃতার্থ থাকতে হতো! জিহাদও লাশ হয়ে ফিরে এসে তার মা-বাবাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে কয়েদখানায় আটক থাকা থেকে! আমরাও পেয়েছি একটি মাসুম বাচ্চার জন্য শোকের অধিকার! কিন্তু এখানেই সব শেষ???
সব পাবলিক প্রতিষ্ঠানের কাজে যে পরিমাণ বিশৃঙ্খলা, অবহেলা ও দুর্নীতি, তাতে ভয় হয়; পরের বিপদেও তাদের ওপর ভরসা করা যাবে কি না! হাইতির ভূমিকম্পের মতো, ভারতের পর্বতধসের মতো, সুনামির মতো, আইলা-সিডরের মতো বিপদে, তাজরীন-শাঁখারীবাজারের মতো আগুন মোকাবিলায় আসলেই কোনো প্রস্তুতি আছে আমাদের? মিগ বিমান, সাবমেরিন, স্যাটেলাইট দিয়ে কী হবে, যদি তা মানুষ না বাঁচায়?
সুন্দরবনের বেলায় ‘নৌডুবিমন্ত্রী’ বলেছিলেন, তেমন ক্ষতি হয়নি। রানা প্লাজার পরে সে সময়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন আলমগীরের ‘ঝাঁকিতত্ত্বে’ জাতির বিবেক-বুদ্ধি ঝাঁকি খেয়েছিল। লুৎফুজ্জামান বাবর থেকে সাহারা খাতুন; মুখ বদলায় ভাষা বদলায় না। এবার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল তাঁর পদের ঐতিহ্য বজায় রেখে ভুল বকতে শুরু করেছেন। ভুল করেও যাঁরা ঠিক কাজটি একবারও করতে পারেন না, তাদের কাছে কীভাবে গচ্ছিত থাকবে আমাদের জানমাল?
যদি উদ্ধারাভিযান পরিত্যক্ত ঘোষণা না করা হতো, যদি উদ্ধারের খাঁচা বানানো তরুণদের আরও আগেই কাজ করতে দেওয়া হতো, যদি জিহাদের বাবাকে ঘটনাস্থলে থাকতে দেওয়া হতো, যদি তাঁর দাবিকে বিশ্বাস করা হতো; তাহলে হয়তো জিহাদ বাঁচত। বাংলাদেশসহ বিশ্বের যাঁরাই এই মানবিক ট্র্যাজেডি দমবন্ধ করে দেখছিলেন, হয়তো তাঁদের আর শোকের ভার বইতে হতো না। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর বিশ্বাস ও আস্থাও তাহলে এমন ঝাঁকুনি খেত না। বাংলাদেশে যত ওপরে যাবেন, ততই বিষ, যত তলায় হাতড়াবেন, ততই মানুষ।
এটা সত্য, রাষ্ট্রযন্ত্র পরাজিত হয়েছে সাধারণ তরুণদের উদ্ধারযন্ত্রের কাছে। এই অযান্ত্রিক মানব-মানবীরাই মুক্তিযুদ্ধ
লড়ে যুগে যুগে। যতবারই চরম অমানবিকতার দম্ভ দেখেছি, ততবারই শিশুর উৎসাহ নিয়ে সভ্যতার তলার মানুষ মানবিকতাকে ফিরিয়ে এনেছে। রাষ্ট্র-রাজনীতি ধ্বংস হয়ে গেলেও সমাজ বাঁচবে, যদি জিহাদকে উদ্ধারের জন্য মরিয়া জনতা আর তাদের নায়কেরা ফিরে ফিরে আসে। গত দুদিন হৃদয়চেরা যন্ত্রণা পেয়েছি, ঘটনার শেষে নাটকের শেষে পেয়েছি এটুকু ছোট্ট কিন্তু তেজোদীপ্ত আত্মবিশ্বাস। এই জাতির হৃদয়ের জ্বালানি ফুরিয়ে যায়নি। সামাজিক সংহতি হঠাৎ হঠাৎ যে বিজলির মতো চমকানি দেয়, তা-ই প্রমাণ, আশার সমাধিতে নতুন জীবন আনা সম্ভব!
আমাদের শক্তি এই সামাজিক পুঁজি। কিন্তু ‘মৃত চিন্তা’ সরিয়ে দেওয়ার মতো বুদ্ধির দিশা কই? উদ্ধারকারী তরুণেরা বুদ্ধি দিয়ে পথ বের করেছেন। জনগণের রাজনীতিতে বুদ্ধির সেই দিশা কই, যা আমাদের এক করবে, আশা দেবে, ভরসা হবে? এবং আমাদের সুপ্ত শক্তিকে বের করে এনে মানুষ বাঁচাতে দেশ গড়তে নিয়োজিত করবে? আমাদের সামাজিক পুঁজির সমবায় ঘটিয়ে জিহাদদের গিলে ফেলার সুড়ঙ্গমুখে ঢাকনা লাগাবে?
জিহাদের মতো অন্ধকার সুড়ঙ্গে পড়ে আছে দেশ। তাকে উদ্ধারের আংটা বানাবে না আজকের ‘ওরা ১১ জন’?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন