দ্বিতীয় উদাহরণটি কিছুটা গুরুতর এবং এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির প্রশ্ন জড়িত। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ১৯০টি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির যে পর্যালোচনা প্রকাশ করে, সেই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের যে মূল্যায়ন তুলে ধরা হয়েছে, তা সরকারের তরফ থেকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সরকারের এ অবস্থান জানাতে গিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, ‘গ্রামেগঞ্জে যাবেন, র‍্যাব ইজ আ ব্র্যান্ড নেম, ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য র‍্যাব ব্র্যান্ড নেম।’ ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য র‍্যাব যদি ব্র্যান্ড নেম হয়, তাহলে দেশের আদালত ও বিচারব্যবস্থার ভূমিকা কী? বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমের অভিযোগগুলোকে ‘ন্যায়বিচার’ অভিহিত করে উনি কি তাহলে সত্য স্বীকার করে নিলেন? নিজ দেশের বিচার বিভাগের কোন রূপ তিনি বহির্বিশ্বের কাছে তুলে ধরলেন? এতে কি দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হলো?

দেশে শক্তিশালী বিরোধী দল নেই বলে প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি আক্ষেপ করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। তাহলে মন্ত্রীরা ছায়া দেখেই কি ঘাবড়ে যাচ্ছেন? নির্বাচন তো এখনো অনেক দূরে। তবে আরও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছেন রাজনীতির বাইরে—একজন শীর্ষ আমলা। দেশের বিভিন্ন প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি ও নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগের শেষ নেই। জবাবদিহির প্রধান জায়গা সংসদকে মনোনীত বিরোধী দল কার্যকর ফোরামে পরিণত করবে—এমন আশা কেউই করে না। ভরসা যা, তা হচ্ছে হাতে গোনা কয়েকটি পত্রিকা, আর নাগরিক গোষ্ঠী বা বেসরকারি সংগঠন। তো সে রকম দুটি প্রতিষ্ঠান—ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিরুদ্ধে তোপ ঝেড়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, আমাদের অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আমরাই টিকা সবচেয়ে বেশি দামে কিনেছি। নেপাল যে টিকা প্রতি ডোজ কিনেছে বাংলাদেশি টাকার হিসাবে ৩৬২–তে, সেখানে আমরা কিনেছি তার প্রায় চার গুণ ১ হাজার ৫৫৯ টাকা দামে। টিআইবিসহ আমাদের সবার তাহলে উচিত ছিল দেশের পক্ষে দর-কষাকষির যোগ্যতা-দক্ষতার তারিফ করা!

রাজনৈতিক সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের জবাব সাধারণত রাজনীতিকেরাই দিয়ে থাকেন, অন্য কারও তা দেওয়ার কথা নয়। ব্যতিক্রম যে মাঝেমধ্যে ঘটে না, তা নয়। কিন্তু আহমদ কায়কাউসের ক্ষেত্রে বিস্ময় হচ্ছে তাঁর ভাষা। তিনি টিআইবির উদ্দেশে বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশকে চোর বলবেন, ফাজলামি নাকি?...টিআইবিতে সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন করে অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি বিএইচপি। পরিবেশদূষণের কারণে কোম্পানিটি বারবার জরিমানার মুখে পড়েছে। কেন তাদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন? আমাদের খালি চোর বলবেন; এটা তামাশা পেয়েছেন?’

করোনার টিকা কেনার স্বচ্ছতা নিয়ে টিআইবি প্রশ্ন তোলায় আহমদ কায়কাউস বলেন, ‘তারা বলেছে, করোনার টিকা ক্রয়ে গড়ে ৬৯ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। আমি টিকা ক্রয়ের ক্ষেত্রে দর-কষাকষির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমরা নাকি দুর্নীতি করেছি! আমরা তো টিকাগুলো এডিবি ও বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে কিনেছি।’ টিআইবি অবশ্য আহমদ কায়কাউসের কথার জবাব দিয়ে তাঁকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে তারা টিকা কেনায় ঘুষের কথা বলেনি, ঘুষের তথ্য উঠে এসেছে তাদের জরিপে টিকা গ্রহণকারীদের কাছ থেকে, যাঁরা টিকা নেওয়ার জন্য ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। আর টিকা কেনায় সরকারের দেওয়া খরচের হিসাবে যে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সে কথা তুলে ধরে তারা বলেছে, প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার গরমিল পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং হিসাবটা যেন প্রকাশ করা হয়। টিআইবি এবং তাদের মূল সংগঠন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কোথা থেকে কত টাকা পায়, তার হিসাব নিয়মিত তাদের আলাদা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে থাকে। তাতে অবশ্য অস্ট্রেলীয় কোম্পানি বিএইচপির কোনো উল্লেখ পাওয়া গেল না। আহমদ কায়কাউসের তথ্যের সূত্র কী, তিনি যদি এবার প্রকাশ করতেন, তাহলে আমরা নতুন কিছু জানতে পারতাম।

টিকা কেনায় হিসাবের গরমিল সামান্য কিছু টাকার নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী গত মার্চে জানিয়েছেন, করোনার টিকা কেনা ও টিকাদান কার্যক্রম মিলে সরকারের প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। আর স্বাস্থ্যসচিবের হিসাব অনুযায়ী শুধু টিকা কেনার জন্যই খরচ হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। টিআইবি বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখছে, টিকার প্রাক্কলিত ক্রয়মূল্য ও টিকা ব্যবস্থাপনার প্রাক্কলিত মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১২ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। বেশি হলে তা হতে পারে ১৬ হাজার ৭২১ কোটি। তাহলে টিআইবির ‘তামাশা’র জবাবে মুখ্য সচিব হিসাবটা প্রকাশ করলেন না কেন? তিনি তো বলছেন দর-কষাকষিতে তিনি ছিলেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, আমাদের অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আমরাই টিকা সবচেয়ে বেশি দামে কিনেছি। নেপাল যে টিকা প্রতি ডোজ কিনেছে বাংলাদেশি টাকার হিসাবে ৩৬২–তে, সেখানে আমরা কিনেছি তার প্রায় চার গুণ ১ হাজার ৫৫৯ টাকা দামে। টিআইবিসহ আমাদের সবার তাহলে উচিত ছিল দেশের পক্ষে দর-কষাকষির যোগ্যতা-দক্ষতার তারিফ করা! আর বিশ্বব্যাংকের প্রকাশ করা নথি বলছে, তারা মাত্র ১২ কোটি ডলার বা ১ হাজার কোটি টাকার মতো টিকা কেনায় সহায়তা করেছে, সেটাও ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট ও বেক্সিমকোর কাছ থেকে। কোভ্যাক্সের মাধ্যমে যে টিকা এসেছে, তার দাম তো সব দেশের বেলায় এক হওয়ার কথা, কেননা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তার দর নির্ধারণ করেছে। আমাদের নিজস্ব ক্রয় ৯ কোটি ডোজের কিছু বেশি। সেই ৯ কোটি ডোজের গড়েই আমাদের টিকার দাম প্রতিবেশীদের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। এখন তাহলে আমরা কি টিআইবিকে বলব যে তারা যেন সরকারকে বাহবা দেয়?

আহমদ কায়কাউস বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি সম্পর্কে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, ‘ওনারা (সিপিডি) বলেন, আমাদের বৃহৎ বৃহৎ প্রকল্পে দুর্নীতি হচ্ছে। আমাদের কোন প্রকল্পে দুর্নীতি হচ্ছে, বলেন?’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনারা (সিপিডি) সব সময় আমাদের দুর্নীতিবাজ বানিয়ে দিচ্ছেন। হোয়াট ইজ দিস (এটা কী)?...আমরা এই মাটির সন্তান। আমরা আমাদের কাজ করছি। সব সময় নেতিবাচক কথা বললে তো হবে না।’ সিপিডির ওয়েবসাইটে যে পরিচালনা কাঠামো দেওয়া আছে, তাতে এমন কাউকে পাওয়া গেল না, যিনি এই মাটির সন্তান নন। আর রাস্তা ও সেতু নির্মাণের মতো অবকাঠামো খাতে খরচের ক্ষেত্রে আমরা যে উন্নত দেশগুলোকে ছাড়িয়ে যাচ্ছি, সিপিডির বোধ হয় উচিত ছিল সে জন্য জাতির অংশ হিসেবে নিজেদের অভিনন্দিত করা!

কামাল আহমেদ সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন