বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

দিনের পর দিন এসবের শিকার হচ্ছেন কেবল সংখ্যালঘু ধর্মের ক্রিকেটাররা। একই বা এর চেয়েও শোচনীয় অবস্থা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে। বিশ্বকাপে ১০ উইকেটে পাকিস্তানের কাছে হারার দায় সেখানে চাপানো হয়েছে শেষ (এবং খেলার তখনকার অবস্থা অনুসারে সবচেয়ে গুরুত্বহীন) ওভারে বেশি রান দিয়ে ফেলা মোহাম্মদ শামির ওপর। তাঁকে পাকিস্তানি, মুসলিম সন্ত্রাসবাদী, বিশ্বাসঘাতক আখ্যায়িত করা হচ্ছে। অন্যদিকে পাকিস্তান দলে সংখ্যালঘু ধর্মের ক্রিকেটারের দেখা পাওয়াই বিরল ঘটনা। ভারতের সঙ্গে বিশাল বিজয়ের পর দলটির সাবেক অধিনায়ক ওয়াকার ইউনিসের একটি বক্তব্যকে চরম সাম্প্রদায়িক হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।

ধর্মকেন্দ্রিক ঘৃণার এই চলন অতীতে ভারত কিংবা পাকিস্তানে থাকলেও বাংলাদেশে ছিল না। এ দেশে অলক কাপালি বা তাপস বৈশ্যরা অত্যন্ত জনপ্রিয় ক্রিকেটার ছিলেন, কখনো তাঁরা ব্যর্থ হলে সমালোচিত হয়েছেন, কিন্তু সংখ্যালঘু হিসেবে নয়।

তাহলে সৌম্য বা লিটনের ক্ষেত্রে কেন তা হচ্ছে এখন?

আমাদের দেশে বর্ণবাদ নেই, থাকার কারণ নেই বলে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা কতটা আছে, তা আমরা ভালো করেই জানি। এই সাম্প্রদায়িকতাকে রুখতে হবে। সেই দায়িত্ব আমাদের সবার। কোনো খেলোয়াড় খারাপ খেললে আমরা তার সমালোচনা করব তার ব্যর্থতা, পরিসংখ্যান, ফর্ম আর অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে তুলনা করে, তার ধর্মীয় পরিচয়কে টেনে এনে নয়।

২.

অলক বা তাপসের ক্ষেত্রে একটি বিষয় লক্ষণীয় ছিল যে তাঁরা কখনো বেশি সুযোগ পেয়েছেন (বা শ্রেয়তর ফর্মে থাকা খেলোয়াড়ের জায়গায় সুযোগ পেয়েছেন) এই অভিযোগ ওঠেনি। যেটা বেশ কিছুদিন ধরে সৌম্য আর লিটনের ক্ষেত্রে উচ্চারিত হচ্ছে। এনামুল হক বিজয়ের মতো সম্ভাবনাময় কেউ কেউ যথেষ্ট সুযোগ পাননি, ইমরুল কায়েস ভালো ফর্মে থাকা অবস্থায় বাতিল হয়েছেন, তাঁর জায়গায় তখন খারাপ ফর্মে থাকা সৌম্য বা লিটন সুযোগ পেয়েছেন, এমন ঘটনাও ঘটেছে। খারাপ খেলা সত্ত্বেও এতবার লিটনের সুযোগ পাওয়া নিয়ে এবার প্রশ্ন তুলেছেন ওয়াসিম আকরাম থেকে শুরু করে গাজী আশরাফ হোসেনও।

বাংলাদেশের ক্রিকেট দলে বেশি সুযোগ পাওয়া যায় কর্মকর্তাদের পছন্দনীয় দলে খেললে—এই অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সৌম্য, লিটন ও অতীতে শুভাগত হোমের ক্ষেত্রে কিছু মানুষের অভিযোগ, তাঁরা সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে সুযোগ পান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এই অভিযোগ গুরুতর। কারণ, এটি অন্যদের প্রতি বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই অভিযোগ যে ভিত্তিহীন বা সৌম্যদের অন্তর্ভুক্তির পেছনে যে যথেষ্ট ক্রিকেটীয় লজিক রয়েছে, তা প্রদর্শনের বা ব্যাখ্যা করার কোনো দায় বোধ করেনি ক্রিকেট বোর্ড। সৌম্যদের প্রতি একশ্রেণির মানুষের সাম্প্রদায়িক আক্রমণের দায় তাই তাদেরও।

এই দুজনকে বেশি সুযোগ দিয়ে হয়তো তাঁদের ক্রিকেট ক্যারিয়ার ধ্বংস করতেও ‘ভূমিকা’ রাখছেন ক্রিকেট বোর্ড আর তাদের অনুগত নির্বাচকমণ্ডলী। খারাপ খেলে বাদ পড়লে আরও ভালো খেলে ফিরে আসার তাড়না থাকে, মানুষের সমর্থনও থাকে তাঁদের প্রতি, আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায় তখন। কেন এটি বিবেচনায় নেওয়া হয় না, এর ব্যাখ্যাও পাওয়া যায়নি কখনো।

শুধু এই দুজন খেলোয়াড় নয়, অনেক খেলোয়াড়কে যথাযথ পরিচর্যার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে ঘাটতি রয়েছে। সৌম্যর মতো অমিত সম্ভাবনা নিয়ে বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় ‘আবির্ভূত’ হন গত এক দশকে। নাসির হোসেন, সাব্বির, আল আমিন, মোসাদ্দেক হোসেন এসব খেলোয়াড় থেমে যান পূর্ণরূপে বিকশিত হওয়ার আগেই। সত্যি কথা হচ্ছে, বাংলাদেশের ক্রিকেট পঞ্চপাণ্ডব নামে পরিচিত (মাশরাফি, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ ও তামিম) সিনিয়র খেলোয়াড়দের সমতুল্য আর একজন খেলোয়াড়ও বের হয়ে আসেনি গত এক দশকে। যে পাঁচজনের কথা বললাম, তাঁদের প্রত্যেকের সূচনা এর আগে থেকে। এত সুযোগ-সুবিধার পরও কেন এটি হয়নি, এখানে ক্রিকেট বোর্ড, নির্বাচক, ক্রিকেট ব্যবস্থাপনা, ঘরোয়া ক্রিকেট—কার দায় কতটুকু, তা কখনোই গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি।

দীর্ঘ মেয়াদে ভালো খেলার মতো কোনো খেলোয়াড় বের করে আনতে না পারলেও সিনিয়র খেলোয়াড়দের বিব্রত করার চেষ্টা ক্রিকেট কর্তারা করে গেছেন নিরন্তরভাবে। মাহমুদউল্লাহকে টেস্ট ক্রিকেট থেকে অপমানজনকভাবে বিদায় দিয়েছেন, তামিমকে ওয়ানডে টিম থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টাও হয়েছিল। দুজনেই সুযোগ পেয়ে তা কতটা ভুল ছিল, তা প্রমাণ করেছেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে ধারাবাহিক ব্যাটসম্যান মুমিনুল হককে বিস্ময়করভাবে টেস্ট ক্রিকেটারের তকমা লাগিয়ে দিয়ে বাদ রাখা হয়েছে অন্য সংস্করণের ক্রিকেট থেকে।

বাংলাদেশে অনেক কিছুর মতো ক্রিকেটও চলছে জবাবদিহিহীনতায়। বিতর্কিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় এক যুগ ধরে এখানে কয়েকজন মুখচেনা মানুষই আছেন সব দায়িত্বে। কোনো সাফল্য পেলে তাঁরা এর কৃতিত্ব নেন, ব্যর্থ হলে শুধু ক্রিকেটারদের দায়ী করেন। ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের ওয়েবসাইট, গাজী টিভিতে খেলার ফাঁকে বারবার মুখ দেখানো আর প্রকাশ্যে এখতিয়ারবিহীন খবরদারি করে তাঁরা যেন বোঝাতে চান সবকিছুর অধিপতি তাঁরা, ক্রিকেটাররা খেলার সুযোগ পায় স্রেফ তাঁদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায়! এই মনোভাবের প্রতিক্রিয়া সৌম্য-লিটনদের ওপর হয়নি, তা-ও আমরা বলি কীভাবে?

বাংলাদেশে অনেক কিছুর মতো ক্রিকেটও চলছে জবাবদিহিহীনতায়। বিতর্কিত এক নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় এক যুগ ধরে এখানে কয়েকজন মুখচেনা মানুষই আছেন সব দায়িত্বে। কোনো সাফল্য পেলে তাঁরা এর কৃতিত্ব নেন, ব্যর্থ হলে শুধু ক্রিকেটারদের দায়ী করেন।

৩.

খেলাধুলায় বর্ণবাদ আর সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ সারা বিশ্বের বহু জায়গার সমস্যা। বিশেষ করে বর্ণবাদ ভয়ংকর আকার ধারণ করেছে ইউরোপ, আমেরিকা আর অস্ট্রেলিয়ায় বিভিন্ন জনপ্রিয় খেলায়। ইএসপিএন অনলাইনে প্রকাশিত ‘হোয়েন দ্য বিউটিফুল গেম টার্নস আগলি’ শিরোনামের দীর্ঘ নিবন্ধে ইতালীয় ফুটবলে বর্ণবাদের যে হৃদয়বিদারক চিত্র ফুটে উঠেছে, তা অবিশ্বাস্য মনে হবে অনেকের কাছে। কালো খেলোয়াড়দের দেখে বানরের মতো মুখভঙ্গি আর শব্দ করা এবং কলা ছুড়ে দেওয়ার মতো ঘৃণ্য আচরণ এখনো হয় ইউরোপে—ভাবা যায় এটি?

আমাদের দেশে বর্ণবাদ নেই, থাকার কারণ নেই বলে। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা কতটা আছে, তা আমরা ভালো করেই জানি। এই সাম্প্রদায়িকতাকে রুখতে হবে। সেই দায়িত্ব আমাদের সবার। কোনো খেলোয়াড় খারাপ খেললে আমরা তার সমালোচনা করব তার ব্যর্থতা, পরিসংখ্যান, ফর্ম আর অন্য খেলোয়াড়দের সঙ্গে তুলনা করে, তার ধর্মীয় পরিচয়কে টেনে এনে নয়। সে যদি এমনকি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতেও কোনো সুযোগ পায়, তাহলেও এর দায় তার নয়, ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকর্তাদের আর নির্বাচকদের।

ক্রিকেট বোর্ডের প্রতি আমার বলার কিছু নেই। তবে কিছুটা জবাবদিহির চর্চা তারা করতে পারে। বিতর্কিত সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকতে পারে, নির্বাচকমণ্ডলীকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে পারে, ক্রিকেট অবকাঠামোয় (বিশেষ করে ঘরোয়া ক্রিকেটে) দুর্নীতি আর অনিয়ম রোধে আন্তরিক হতে পারে। ক্রিকেটে ক্রমবর্ধমান সাম্প্রদায়িক মনোভাব রোধে তাদের কী করণীয়, তা নির্মোহভাবে ভাবতে পারে।

আমাদের বুঝতে হবে, ক্রিকেটে পরাজয়ের চেয়ে সেখানে সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ আরও শোচনীয়।

­­

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন