default-image

নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধনীতে ধর্ষণের বিচারে মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে।

প্রথমত, ধারা ৩২–এ সংযোজন করা হয়েছে, ভিকটিমের পাশাপাশি অভিযুক্ত ব্যক্তিকেও মেডিকেল পরীক্ষা করাতে হবে। এ পরিবর্তন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ এবং গত কয়েক বছরে ধর্ষণের আইন পরিবর্তন করার ক্ষেত্রে যে কয়টি বিষয়ে জোর দেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে এটি অন্যতম।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় যে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন করা হয়েছে তা হলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ধারা ১১–এর গ-কে আপসযোগ্য করা হয়েছে। আপসযোগ্য অর্থ হলো মামলার যেকোনো পর্যায়ে মামলার বাদী ও বিবাদীর মধ্যে আপসের মাধ্যমে মামলার মীমাংসা হতে পারে, যদিও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের বাকি সব অপরাধই অ-আপসযোগ্য। এ ধারায় যৌতুকের দাবিতে সাধারণ জখমের শাস্তির বিধান রয়েছে। এ পরিবর্তনও অনেক বছর থেকেই আলোচনায় ছিল। এ ধারায় অনেকেরই আপত্তি থাকার একটি কারণ হলো, পারিবারিক নির্যাতনের মামলাগুলোতে যেখানে হত্যা বা মারাত্মক জখমের অভিযোগ থাকে না, সেগুলোও এ ধারায় করা হয় এবং মামলার একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আপস হয়ে যাওয়ার কারণে তাঁরা আর মামলা এগিয়ে নিতে চান না। শেষমেশ এ মামলাগুলো নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের তথাকথিত ‘মিথ্যা মামলার’ তকমাতেই মাত্রা যুক্ত করে। এ ধারার সংশোধন ‘মিথ্যা মামলার’ অপবাদ ঘোচাতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। তবে পারিবারিক নির্যাতনের শিকার যেসব নারী প্রতিকারের আশায় স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির অত্যাচারের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে বিচার চাইতে আসেন, তাঁদের ক্ষেত্রে আপস করে মামলা মিটিয়ে ফেলার চাপ বাড়তে পারে, এমন একটি শঙ্কা রয়েছে। সুতরাং এ ধারার পরিবর্তনের ফলে বিচারপ্রার্থী নারী কতটা সমস্যায় পড়বেন বা ট্রাইব্যুনালের মামলার জট লাঘবে তা কতটুকু কার্যকর হতে পারে, তা আইনটির সংশোধন-পরবর্তী প্রয়োগ পর্যবেক্ষণ করা ছাড়া বলা যাবে না।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হলো আইনটিতে একটি নতুন ধারা ৩২ক-এর সংযোজন করা হয়েছে; এ ধারায় ডিএনএ পরীক্ষা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে ঘটে যাওয়া সব অপরাধের ক্ষেত্রেই করতে হবে বলা হয়েছে। ধারাটিতে শব্দের প্রয়োগ যেভাবে রয়েছে, তাতে যেকোনো অপরাধের তদন্তেই পুলিশকে অপরাধের শিকার এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি উভয়েরই ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে করতে হবে, এমনটাই বোঝানো হচ্ছে বলে আপাতদৃষ্টিতে ধারণা করা যায়। ডিএনএ পরীক্ষা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণিত হতে পারে অপরাধী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে। তবে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষা আগেও প্রচলিত ছিল। এমনকি ডিএনএ পরীক্ষার আইনগত দিকগুলো আরও স্পষ্ট করার জন্য ২০১৪ সালে ‘ডিএনএ আইন’ও প্রণীত হয়েছে, যেখানে ডিএনএ-সংক্রান্ত প্রমাণ আদালতে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তা সত্ত্বেও ধারাটি আলাদাভাবে সংযোজন করার কারণে কিছু জটিলতার সৃষ্টি হতে পারে। যেসব মামলা তদন্তে ডিএনএ পরীক্ষার কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই, অন্যান্য প্রমাণই যথেষ্ট, সেসব মামলাতেও এখন ডিএনএ পরীক্ষার জন্য স্বাভাবিক চাপ থাকবে। তার ওপর আবার এ ধারা শুধু ধর্ষণ নয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অন্য সব অপরাধের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। ফলে তদন্তের গড় সময়ক্ষেপণের মাত্রা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আমার জানামতে, বর্তমানে ঢাকায় পুলিশের সিআইডি ছাড়া মাত্র একটি ডিএনএ পরীক্ষাগার আছে। যদি আইন অনুযায়ী সব ক্ষেত্রে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করতেই হয়, তাহলে এ পরীক্ষাগারে যে বিপুল পরিমাণ ডিএনএ নমুনা পাঠানো হতে পারে, তা সংরক্ষণ এবং পরীক্ষা করার মতো ধারণক্ষমতা এবং কার্যক্ষমতা আছে কি না, তা–ও খতিয়ে দেখতে হবে। প্রকাশিত তথ্যসূত্রগুলো বলছে, ডিএনএ পরীক্ষা করতে সবচেয়ে কম করে হলেও কয়েক মাস থেকে বছর পর্যন্ত লেগে যেতে পারে। এ সম্ভাব্য বিরাটসংখ্যক ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার বিষয়টি সরকারের জন্য ব্যয়বহুলও বটে।

ডিএনএ পরীক্ষা করতেই হবে বলে আইনে যে নতুন ধারা সৃষ্টি করা হলো, তাতে স্বাভাবিকভাবেই ডিএনএ পরীক্ষার প্রমাণের ওপর অনেক বেশি জোর দেওয়া হবে মামলার তদন্ত এবং বিচারের প্রক্রিয়ায়। ধর্ষণের মামলায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ডিএনএ নমুনা পাওয়া যায় না, কেননা মামলা হয়তো করা হয় অপরাধ ঘটার অনেক পরে বা আলামতগুলো হয়তো জানার ঘাটতির কারণে ভিকটিম নষ্ট করে ফেলে। আবার অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের সময় অপরাধী নিজেও ডিএনএ নমুনাগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করতে পারে বা আলামত নষ্ট করার জন্য ভিকটিমকে বাধ্য করতে পারে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ধর্ষণের অনেক মামলাতেই বিচার্য বিষয় হয় যৌনসঙ্গমের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী নারীর সম্মতি ছিল কি না, সেই প্রশ্নটি। যৌনসঙ্গম আদৌ হয়েছে কি না, তা প্রমাণ করতে ডিএনএ পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু ডিএনএ পরীক্ষা দিয়ে সম্মতি ছিল কি না তা কিন্তু প্রমাণ করা সম্ভব নয়। সম্মতি যে ছিল না বা ধর্ষণ যে হয়েছে, তা প্রমাণে এখনকার প্রচলিত পদ্ধতিতেই নারীকে অনেক কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়। তার ওপর যদি যুক্ত হয় ডিএনএ প্রমাণ উপস্থাপনের ব্যর্থতা, তাহলে অভিযোগকারীর অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে আরও বেগ পেতে হবে, এমন আশঙ্কাই স্বাভাবিক।

বিজ্ঞাপন

ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং সংরক্ষণ একটি জটিল বিষয়। সঠিকভাবে না করা গেলে ডিএনএ নমুনা দূষিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাতে ফলাফল সঠিক আসবে না। সে ক্ষেত্রে তদন্তকারী ব্যক্তির দক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্নটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। ভয়ের ব্যাপার হলো অনিয়ম হোক আর অদক্ষতাই হোক, ডিএনএ পরীক্ষার ফল যদি নির্ভুল না আসে, তাহলে তা যেমন একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসিয়ে দিতে পারে, তেমনই একজন অপরাধীকেও সহজেই সাজামুক্ত করতে পারে।

আরও একটি বিষয় হলো বলা হয়েছে ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করতেই হবে, তাতে ভিকটিম কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক। ডিএনএ-সংক্রান্ত তথ্যের ওপর যেকোনো ব্যক্তির গোপনীয়তার অধিকার রয়েছে এবং এ কারণেই ২০১৪ সালের ডিএনএ আইনে ভিকটিম ও অভিযুক্ত ব্যক্তি দুজনেরই সম্মতি নেওয়ার প্রক্রিয়া বলা হয়েছে। সম্মতি না থাকলে আদালতের কাছ থেকে অনুমতি আনলেও তাকে সম্মতি ধরা হবে। নতুন সংশোধনে সম্মতির বিষয়টিকে উপেক্ষা করা হলে ভিকটিমের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকারেও হস্তক্ষেপ হয়। ভিকটিম সম্মতি না-ও দিতে পারেন যখন তিনি জানবেন এ তথ্য বিবাদীপক্ষের কাছে যেতে পারে, উন্মুক্ত আদালতেও তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার হতে পারে, বিশেষ করে যেখানে ধর্ষণের মামলার বিচারকার্যে নারীর চরিত্র হননের প্রক্রিয়াটি এমনিতেই জোরদার থাকে।

সংশোধিত আইনের এ জটিলতাগুলো নিয়ে গভীর পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে যদি ধর্ষণের আইনে অর্থপূর্ণ পরিবর্তন আনতেই হয়, তবে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটিকে পরিবর্তনের জন্য বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচিত যে সুপারিশগুলো রয়েছে, সেগুলোকেও বিবেচনায় আনা প্রয়োজন।

তাসলিমা ইয়াসমীন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক

taslima47@yahoo.com

মন্তব্য পড়ুন 0