বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

উচ্চ আদালতে এসব নিয়োগের সঙ্গে জনস্বার্থের প্রশ্ন জড়িত। প্রধান বিচারপতি নিয়োগের সঙ্গে জড়িত আছে সমাজের প্রত্যেক ভুক্তভোগীর স্বার্থের প্রশ্ন। তাঁর সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত হয় উচ্চ আদালত। এই উচ্চ আদালত সরকারের অন্য দুটি বিভাগের (শাসন ও আইন বিভাগ) অন্যায্য কাজ থেকে শুধু নন; নিম্ন আদালতে মন্ত্রী, সাংসদ, আমলাসহ সমাজের ক্ষমতাশালী মানুষের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে মানুষের শেষ রক্ষাকবচ।

বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি। ভারতের মতো কিছু দেশে উচ্চ আদালতে কলেজিয়াম বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কারণে প্রধান বিচারপতির একক নেতৃত্বের সুযোগ কম। বাংলাদেশে এসব নেই বলে একক নেতৃত্বের সুযোগ বেশি। উচ্চ আদালতের বিধানাবলি (রুলস) ও সাম্প্রতিক কিছু রেওয়াজের কারণে এই ক্ষমতার পরিধি আরও বেড়েছে।

প্রধান বিচারপতি পদে শুধু যে সবচেয়ে সিনিয়র কেউ নিয়োগ পেলে এসব ক্ষমতাবলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যাবে, তা নয়। তাঁর পরের যে কেউ নিয়োগ পেলেও একই ভূমিকা রাখতে পারেন এবং এভাবে তাঁর নিয়োগের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।

প্রধান বিচারপতি নিয়োগ বাংলাদেশে একসময় আলোচিত বিষয় ছিল। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র কাউকে ডিঙিয়ে এই পদে নিয়োগ করা হলে অনেক সমালোচনাও হতো। তাতে অবশ্য এভাবে নিয়োগ থেমে থাকেনি। এস কে সিনহা বাদে সর্বশেষ চার প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এক বা একাধিক সিনিয়রকে বিবেচনায় না নিয়ে।

২.

বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে উচ্চ আদালতের বিচারকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করার বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রপতির রয়েছে। তিনি শক্তভাবে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করলে উচ্চ আদালতে যোগ্য, সৎ ও দায়িত্ববান বিচারক নিয়োগের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। সংবিধান (১০৭ অনুচ্ছেদ) ও সুপ্রিম কোর্ট অব বাংলাদেশের রুলস অনুসারে হাইকোর্টের বিচারকেরা কে কোন মামলা শুনবেন, তা প্রধান বিচারপতি এককভাবে ঠিক করতে পারেন। যেমন মৌলিক অধিকারের মামলা সরকারের জন্য সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়। প্রধান বিচারপতি এসব মামলা শোনার জন্য স্বাধীনচেতা ও যোগ্য বিচারকদের নিয়ে বেঞ্চ গঠন করলে সরকারের অনাচার ও নিপীড়ন কমে যায়। হাইকোর্টে কোন মামলা গৃহীত হবে, এ সিদ্ধান্ত নেন অন্য আরও কিছু মোশন বেঞ্চ, এখানেও সিনিয়র ও দক্ষ বিচারকের রাখলে তার সুফল পান ভুক্তভোগীরা।

প্রধান বিচারপতির আরেকটি বড় ক্ষমতা হচ্ছে আপিল বিভাগের একজন বিচারককে চেম্বার জজ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া। চেম্বার জজের মূল কাজ আপিল বিভাগকে প্রশাসনিক সহায়তা প্রদান করা হলেও তিনি অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বা আংশিক প্রতিকার দিতে পারেন। সাম্প্রতিক কালে অবশ্য রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর কিছু মামলায় চেম্বার জজ হাইকোর্টের দেওয়া প্রতিকার স্থগিত করে দিয়েছেন, এমন ঘটনাও ঘটেছে। চেম্বার জজরা এ কাজ যেভাবে পালন করেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অতীতে একজন সম্পাদক দণ্ডিত হয়েছেন। প্রধান বিচারপতি এ পদে আপিল বিভাগের যোগ্যতম ব্যক্তিকে নিয়োগ দিয়ে মানুষের অধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারেন।

উচ্চ আদালত প্রশাসন পরিচালনা ও নিম্ন আদালত প্রশাসন নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কমিটির প্রধানও হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। সাম্প্রতিক কালে র‌্যাবের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করার জন্য নিম্ন আদালতের একজন বিচারকের মামলা আমলে নেওয়ার ক্ষমতা রহিত করে তাঁকে বদলি করা হয়েছিল। আইন মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের অন্যায্য খবরদারি বিচারিক আদালতের স্বাধীনতার পথে বাধা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে এই স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার ক্ষেত্রেও প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে উচ্চ আদালত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন।

আগের রেওয়াজ অনুসারে বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হতে পারে। বাছাই কমিটির প্রধান হিসেবে আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন হতে পারে তাঁরই নেতৃত্বে। আগের প্রধান বিচারপতির (আপিল বিভাগের বিচারক হিসেবে) নেতৃত্বে বাছাই কমিটি যে দুটি কমিশন গঠন করেছিল, তাদের আমলে বাংলাদেশের নির্বাচনব্যবস্থা ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। আগামীর চ্যালেঞ্জের দিকে তাই চোখ থাকবে সবার।

বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি। ভারতের মতো কিছু দেশে উচ্চ আদালতে কলেজিয়াম বা এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কারণে প্রধান বিচারপতির একক নেতৃত্বের সুযোগ কম। বাংলাদেশে এসব নেই বলে একক নেতৃত্বের সুযোগ বেশি।

৩.

প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ পেয়ে বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী আমাদের আশার বাণী শুনিয়েছেন। বিশেষ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে তাঁর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তবে অতীতে দুর্নীতিকে সংকীর্ণ অর্থে গ্রহণ করে মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের যে দুর্নীতি (মানবাধিকার লঙ্ঘন) হয়, তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতকে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি কিছু ক্ষেত্রে। সাগর-রুনি হত্যা মামলার বিচার ঝুলে থাকা, গুম-ক্রসফায়ার, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের অপপ্রয়োগ, প্রকাশ্যে ভোটাধিকার হরণ, গায়েবি মামলাসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা ঘটেছে এ সময়ে। বিচ্ছিন্ন ও সীমিত কিছু প্রতিকার বাদে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতকে শক্ত ও কার্যকর ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। এমন ভূমিকা পালনে নেতৃত্ব প্রদান করার এখতিয়ার ও সুযোগ প্রধান বিচারপতির রয়েছে।

সদ্য বিদায়ী প্রধান বিচারপতি উচ্চ আদালতে দুর্নীতি রোধে একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগে তিনি হাইকোর্টের তিনজন বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা স্থগিত করেছিলেন। কিন্তু এরপর আর কোনো ভূমিকা তাঁকে পালন করতে দেখা যায়নি। ষোড়শ সংশোধনী উচ্চ আদালতে বাতিল হওয়ার পর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্তের জন্য সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তিনি গঠন করতে পারতেন। এই মামলার রায়ের রিভিউ আবেদন করে উচ্চ আদালতের বিচারকের চাকরিচ্যুতির নিয়ন্ত্রণ সংসদের হাতে নিতে চাইছে সরকার। নতুন প্রধান বিচারপতির জন্য এই চ্যালেঞ্জও থাকল।

৪.

বাংলাদেশের সংবিধান প্রধান বিচারপতিকে তিনভাবে সম্মানিত করেছে। সুপ্রিম কোর্ট বা বিচার বিভাগের নয়, তাঁকে সেখানে ‘বাংলাদেশের’ প্রধান বিচারপতি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের মধ্যে একমাত্র তাঁকেই ‘বিচারপতি’ হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। একমাত্র তাঁর নিয়োগের ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। প্রথম দুটি বিধান তাঁর কর্তৃত্ব ও মর্যাদা বোঝানোর জন্য। দ্বিতীয়টি রাজনৈতিক পক্ষপাতমুক্ত ও স্বাধীনভাবে তাঁর কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য।

উন্নত বিশ্বে আমরা রাজনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া বিচারকদেরও ন্যায়বিচারের স্বার্থে সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে দেখি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিয়োগ দেওয়া প্রধান বিচারপতি ওবামাকেয়ার মামলায় তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। ভারতেও এমন উদাহরণ আছে অনেক। বাংলাদেশে অষ্টম ও ষোড়শ সংশোধনী মামলায় প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সর্বোচ্চ আদালত তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও স্বাধীনতা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছেন। জনগণের অধিকার রক্ষা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়ও এমন আরও ভূমিকা রাখার এখতিয়ার তাঁদের রয়েছে।

নতুন প্রধান বিচারপতি সৎ ও দক্ষ প্রশাসক হিসেবে পরিচিত। বর্তমান এই সরকারব্যবস্থায় তিনি সঠিকভাবে কতটুকু কাজ করতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন